পড়া শেষ হলে মা পিঠের দাগের ওপর মলম লাগাতে লাগাতে বলেন–এইভাবে গরুর মত পিটাইয়া কুনো লাভ আছে? যার হয়, তার নয়ে হয়; যার হয় না, তার নব্বইয়েও হয় না। সারাদিন গপ্পের বই পড়লে কি কইরা পরীক্ষায় ভালা করব! বাপে বাড়িত থাকলে বেহেই পড়ার টেবিলে, না থাকলে বাড়িটা মাছের বাজার হইয়া যায়। আর এইডা হইল মিরমিরা শয়তান। নাটের গুরু। কারে কুন দিয়া খুচাইব, এই তালে থাকে। এহন ভাল হইছে না! মাইর খাইয়া উপুড় অইয়া পইরা থাহস!
প্রতি রাতে মার খেতে খেতে এমন হয় যে, ইস্কুলের পড়া বাদ দিয়ে ইংরেজি ব্যাকরণ মুখস্ত করি দিনরাত। ওদিকে হোমওয়ার্কে গোল্লা জোটে। অঙ্কের খিটখিটে শিক্ষক ক্লাসে নিল ডাউন করিয়ে রাখেন। বেঞ্চের ওপর দু’ কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বিজ্ঞান ক্লাসে, আবার কোনও কোনও শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে এনে ক্লাসের সবাই যেন দেখতে পায় বকের মত এক পায়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেন, ইস্কুলে গবেট ছাত্রী হিসেবে রাতারাতি আমার নাম উঠে আসে এক নম্বরে। এদিকে বাড়িতে মুখস্ত করা ব্যাকরণও সব গুলিয়ে যায় বাবার গর্জন শুনে, পিঠে বেতের সপাং সপাং চলতেই থাকে। দ্বিতীয় ষৈনমাসিক পরীক্ষায় ইংরেজিতে আমার নম্বর ওঠে বারো। নম্বর দেখে মা বাঁকা হেসে বলেন–ক্লাস সেভেনে যহন পড়তাম, ক্লাসের টিচার জিগাস করল মেয়েরা তুমরা কেউ গোবর ইংরাজি জান? কেউ জানে না, আমি ছাড়া। কইলাম, সারা ক্লাস শুনাইয়া, কাউ ডাং। পড়ালেখাডা চালাইয়া যাইতে পারলে আমি আইজ ইংরেজির মাস্টার হইতাম। নম্বর দেখে বাবার রক্তচাপ এমনই বাড়ে যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
বাবা হাসপাতালে, বাড়ি আবার মাছের বাজার। হই চই হুল্লোড়। পড়ার টেবিলে ধুলো জমতে থাকে। কে আর ছায়া মাড়ায় ওসবের! গল্পে, আড্ডায়, গানে মজে থাকি সারাদিন, নিষিদ্ধ ছাদে কাটে বিকেল, রাত কাটে গল্পের বইএ, লুকোছাপার দরকার হয় না, ঠ্যাংএর ওপর ঠ্যাং তুলে, প্রকাশ্যে। বই জোটে ইস্কুলের মমতা নামের এক মেয়ের কাছ থেকে। মমতাকে বলা হত বইয়ের পোকা। ওই পোকার সঙ্গে আমার আবার হঠাৎ খাতির হয়ে যায়। ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে সে মাস্টারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেবল বই পড়ত। ইস্কুল ছুটির পরও একদিন পড়ছিল ক্লাসঘরে, একা। দফতরি এসে দরজায় তালা দিয়ে যায় বাইরে থেকে। সে মেয়ে আটকা পড়ে যায় পরদিন সকাল হওয়াতক। খবরটি প্রথম জানতে পাই আমি, কারণ পরদিন আমিই সকালবেলা সবার আগে ক্লাসে ঢুকেছিলাম। মমতা ঘুমোচ্ছিল বেঞ্চে শুয়ে। কি ব্যাপার! বলল কাল বিকেলে ক্লাস থেকে বেরোতে গিয়ে দেখে দরজা বন্ধ। ডাকাডাকি করে কাউকে সে পায়নি, সারা ইস্কুল ফাঁকা। আমি আঁতকে উঠি। তারপর? তারপর আর কি করি, মমতা হেসে বলল, বইটা পড়া শেষ করে অনেক রাতে শুয়েছি। কী সে বই! মমতা দেখালো নীহাররঞ্জন গুপ্তেরর কিরীটি অমনিবাস। ও এতটুকু ভাবছিল না বাড়িতে ওর মা কি করছে ওর না ফেরায়। ও দিব্যি ক্ষিধে লেগেছে বলে বেরিয়ে গেল। বইটি রয়েই গেল আমার কাছে। মমতাকে এরপর দু’দিন ইস্কুলে আসতে দেয়নি ওর মা। বইটি পড়ে ওকে যেদিন ফেরত দিলাম, ও বিষম খুশি হল, ভেবেছিল ওর বই হারিয়ে গেছে। এরপর থেকে ও যে বইই পড়ত, আমাকে দিত। কেবল আমাকেই দিত।
যাই হোক, বাবা হাসপাতালে। প্রতি বিকেলে টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার ভরে নিয়ে হাসপাতালে যান মা। বাবা এক বিকেলে মা’কে বলে দিলেন তাঁর দু’মেয়েকে তিনি দেখতে চান। কেন দেখতে চান, দেখতে চাওয়ার হঠাৎ কি হল ইত্যাদি প্যাঁচালের পর ভাঙা গলায় বললাম আমার জ্বর জ্বর লাগতাছে, তাছাড়া আমার মাস্টার আইব। ইয়াসমিনরে নিয়া যাও। যে যুক্তিই দিই না কেন, খাটে না, মা আমাকে নিয়ে যাবেনই। আমাদের গিয়ে দাঁড়াতেই হয় হাসপাতালের কেবিনে, যেখানে বাবা ডেটলের গন্ধের সঙ্গে শুয়েছিলেন। বাবার মুখে দাড়ি গজিয়ে গেছে। দাড়ি গজানো বাবাকে কখনও দেখিনি আগে। বয়স মনে হল বছর কয়েক বেড়ে গেছে বাবার। আমাকে কাছে ডেকে, একেবারে নাগালের মধ্যে, মলিন কণ্ঠে বললেন–
এখন নিশ্চয় তুমারা বলতাছ
যম গেছে যমের বাড়ি
আমরা হইলাম স্বাধীন নারী।
বাবা তবে জেনে গেছেন তাঁর নাম দিয়েছি আমি যম। বাবাকে বাবা সম্বোধন করা বাদ দিয়েছি সে অনেক বছর, আর আড়ালে যে বাবা বলি, তাও বাদ দিয়েছি তিনি আমার মাস্টার হওয়ার পর। শ্রেফ যম। নামটি তোফা হয়েছে ছোটদা মন্তব্য করেছিলেন যেদিন তিনি জুতো কেনার টাকা চেয়েও বাবার কাছ থেকে পাননি। আমি আশংকা করছিলাম হাসপাতালের শাদা বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে এই বুঝি তিনি আমার হাড় গুঁড়ো করবেন, তাঁকে যম নাম দেওয়ার অপরাধের শাস্তি। তা না করে আমাকে অবাক করে তিনি বললেন–মা গো কি দিয়া খাইছ আজ?
বাবার কোমল স্বরে স্বস্তি পেয়ে বলি–ডিম দিয়া।
— আমি বাড়ি গিয়াই তোমাদের জন্য বড় বড় রুইমাছ নিয়া আসব, মুরগি নিয়া আসব। বাজারে ফজলি আম উঠছে, আম নিয়া আসব ঝুড়ি ভইরা।
আমি মাথা নেড়ে আচ্ছা বলে।
বাবার যে কোনও কথায় হুঁ হ্যাঁ আচ্ছা ঠিক আছে বলে যত শীঘ্র হাসপাতাল থেকে বিদেয় হওয়া যায়, ততই মঙ্গল। কিন্তু আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে বাবা তাঁর বুকের ওপর আমার মাথা টেনে এনে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন–চুলে তেল দেও নাই কেন? চুলে তেল দিয়া আচড়াইয়া ফিতা দিয়া বাইন্ধা রাখবা। তাইলে তো সুন্দর দেখা যায়।
