ছোটদার বেলায়–দুনিয়া ভুইলা যাও কামাল। এখনই তুমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। তুমি মেট্রিকে স্টার পাওয়া ছাত্র। তোমার ভবিষ্যত এখন ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্টের ওপর নির্ভর করতাছে। এই রেজাল্ট আরও ভাল না করলে কমপিটিশনে টিকতে পারবা না বাবা। ডাক্তারি পড়তে হইব। ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার হইতে হবে। বন্ধুদের নিয়া আড্ডা বাদ। খাইটা পইড়া মেডিকেলে ভর্তি হও। আমার খুব আশা ছিল বড় ছেলে ডাক্তার হইব। পারল না। এখন তুমিই আমার ভরসা। পড়ায় মন দাও বাবা। দিনে আঠারো ঘন্টা কইরা পড়। ভাল রেজাল্ট কইরা বাপের মুখ রাখো। আমি চাষীর ছেলে ডাক্তার হইছি। তুমি আমার চেয়ে বড় ডাক্তার হইয়া দেখাইয়া দেও।
সকাল বেলা ঘরে ঘরে বাণী বিতরণ করে বাবা বাড়ি থেকে বেরোন। তখনই এক সঙ্গে চারটে চেয়ার সরার শব্দ হয়, সরিয়ে কেউ মাঠে যায় দৌড়ে, কেউ রেডিওর নব ঘোরায়, কেউ গলা ছেড়ে গান গায়, এক লাফে বিছানায় শোয়। কালো ফটকটি আমাদের একধরনের জীবন বাঁচায়, খটাস করে শব্দ হয়ে সংকেত দেয় বাবার আসার, অথবা যাওয়ার। বাবার শব্দটির একটি আলাদা ধরন আছে, বাবা ফটক খুললে যে ধরনের শব্দ হয়, তা বাবা খুললেই হয়। চোখ বুজে আমরা বলে দিতে পারি এ বাবা নাকি বাবা নয়। বাবা অবশ্য রূপকথার দৈত্যদের মত নানারকম চালাকি করেন। রাতে বাড়ি ফিরবেন বলে বেরিয়ে দুপুরে ফেরেন, দুপুরে ফিরছেন বলেন, ফেরেন রাত করে। বাবার বলাকথায় আমাদের খুব একটা আস্থা নেই। চব্বিশ ঘন্টা আমরা সতর্ক থাকার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে ফটকও বেশ নিঃশব্দে খোলার চেষ্টা করেন তিনি যেন হাতে নাতে সবাইকে ধরতে পারেন। কখনও সখনও যে তিনি আচমকা পেছনে এসে দাঁড়াননি আমাদের সতর্ক হবার আগে, তা নয়। আমাকে রান্নাঘরের বারান্দায় বসে সজনে বাছতে দেখে সেই সজনে দিয়ে পেটাতে পেটাতে পড়ার টেবিলে এনে বসিয়েছিলেন, পাড়ার মেয়েদের নিয়ে মাঠে খেলতে দেখে চড়িয়ে ভেতরে এনেছেন, সব ক’টি মেয়েকে ধমকে বাড়ির বার করেছেন। বাবার হাতে মার খেয়ে মনে মনে কত যে বাবার মৃত্যু কামনা করেছি, যেন বাবা আজই ভীষণ অসুখ হয়ে মরে যান। বাবা এমন শক্ত শরীরের মানুষ, সামান্য জ্বরজারিও হত না কখনও। এদিকে আমাকে জ্বরে ধরত বেশ, জ্বর হয় হোক, কিন্তু ওষুধ নৈব নৈব চ। আর টিকার নাম শুনলে তো গায়ে জ্বর চলে আসে। ইস্কুলে গুটিবসন্তের টিকা দেওয়ার লোক যখনই আসত, পায়খানায় লুকোতাম। বাড়িতেও লোক আসত, ব্যস, বাড়ি থেকে সারাদিনের জন্য হাওয়া। শুকনো মুখে রাস্তায় ঘুরঘুর করতাম যতক্ষণ না দেখছি ওরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। টিকা নিইনি, বাবার কাছে ধরা পড়ে গিয়ে এমন কান্ড হয়েছিল যে বাবা নিজেই আমার হাতে জন্মের যন্ত্রণা দিয়ে টিকা দিলেন। আর যার হাত থেকেই বাঁচি, বাবার হাত থেকে বাঁচার আমার কোনও সাধ্য ছিল না।
বছরে এক ক্লাসে তিনবার পরীক্ষা হয়, প্রথম ষৈনমাসিক, দ্বিতীয় ষৈনমাসিক, তৃতীয়টি হচ্ছে বার্ষিক, বার্ষিকে উতরে গেলে ওপরের ক্লাসে বসতে হয়। প্রথম ষৈনমাসিক পরীক্ষায় ইংরেজিতে তেত্রিশ পেয়ে ঘরে ফিরেছি। তেত্রিশ হচ্ছে পাশ নম্বর, এর নিচে পেলে আর কালো কালিতে নম্বর লেখা হয় না, হয় লাল কালিতে। মানে সব্বনাশ। তেত্রিশ পেয়ে সেদিন আমার সারাদিন মন খারাপ। ভয়ে জিভ শুকিয়ে আসছে। বারবার জল খাচ্ছি। মা’র শরীর ঘেঁসে বসে থাকি যেন মা আমার সহায় হন। মা’কে বলিও যে মা ঠিকই বলেন দুনিয়াদারির লেখাপড়ার মত বাজে ব্যাপার আর নেই। বাবাকে দেখাতেই হবে প্রগেস রিপোর্ট, এটি দেখলে পিঠে কি রকম বেত পড়বে, তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। মা বলেন মোটা জামা পইরা ল, পিঠে লাগব কম। গায়ে মোটা জামা পরে গরমে সেদ্ধ হতে থাকি কিন্তু বাবা ফিরে আমাকে মারধোর না করে শান্ত গলায় বলেন আজ থেইকা আমি তরে ইংরেজি পড়াব। এর চেয়ে যদি পিটিয়ে আমার পিঠের চামড়া তুলতেন, খুশি হতাম। এ যেন বাঘমামা আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলছেন আজ থেকে প্রতিদিন আমি তোকে খাব। বাবা যা বলেছেন তাই, হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না। রাত আটটায় রোগী দেখে বাড়ি ফিরে শার্ট প্যান্ট খুলে পেটের ওপর লুঙ্গির গিঁট দিয়ে, চোখে চশমা পরে, তোষকের তলে রাখা সন্ধি বেতটি নিয়ে আমার পড়ার টেবিলে এসে বসেন নতুন কানাই মাস্টার। আমার এক চোখ থাকে সন্ধি বেতে, আরেক চোখ বইয়ে। ইংরেজি গ্রামার শেখান বাবা আমাকে। পড়তে পড়তে হাই উঠলে ঘুমের, সপাং করে বেত পড়ে পিঠে, গা কেঁপে ওঠে আমার। পাস্ট, প্রেজেন্ট, ফিউচার টেন্স, নানারকম তার শাখা প্রশাখা, বাবা আমার মগজ খুলে মগজে নিজ হাতে ঢুকিয়ে দেন, ঢুকিয়ে বেত মেরে খুলি জোড়া দেন, যেন জীবনে কখনও আর এগুলো বেরিয়ে না আসে। জীবনের কথা দূরে থাক, পরদিনই ভুল করি, প্রতিদিনকার মত এক চোখ টেবিলের চকচকে বেতে, আরেক চোখ বইয়ে, টান টান করা পিঠ, বাবা বলেছেন সোজা হয়ে বসতে, বাঁকা হয়ে বসে অলস লোকেরা। ভুল যখনই হল, সপাং সপাং। যত সপাং সপাং তত ভুল। চোখে জল আসে। চোখে জল আসলে সপাং সপাং। যত সপাং সপাং তত জল। চোখে জল নিয়ে বলেছিলাম পানি খাইয়াম, বাবা বলে দিলেন পানি খাওন লাগব না। বাবা পড়াতে বসলে আমার পেশাব পায়খানা পাওয়া নিষেধ, তেষ্টা পাওয়া, ক্ষিধে পাওয়া নিষেধ। বাবা বলেন ওসব পাওয়া নাকি পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার কায়দা।
