ছাত্রাণাম অধ্যয়নং তপঃ। ছাত্রদের তপস্যাই হওয়া উচিত অধ্যায়ন। জ্ঞানের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নাই। বড় বড় মনীষীরা বলে গেছেন। কী বলে গেছেন? আমার উত্তর দেবার দরকার হয় না, কারণ বাবাই বলবেন কি বলে গেছেন মনীষীরা। বলে গেছেন কষ্ট করিলে কেষ্ট মেলে। সুতরাং তুমাকে আদা জল খেয়ে লাগতে হবে। খেলাধুলা বাদ, আরাম আয়েশ বাদ। শুধু বিদ্যা অর্জন কর। বিদ্বান হও। তুমাকে দশটা লোকে সম্মান করবে, সমাজে মাথা উঁচু করে থাকতে পারবা। আমারে দেখাইয়া লেখাপড়া কইর না, নিজের জন্য কর। পাগলেও নিজের বুঝ বুঝে।আর যদি লেখাপড়া না কইরা ভাদাইম্যা হও, ভাব বাপের হোটেলে থাকি, গায়ে ফুঁ দিয়া বেড়াব, তাইলে কী হবে ভবিষ্যত? রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করতে হবে। সুতরাং জ্ঞানী হও। বিদ্যা অর্জন কর। মানুষের মত মানুষ হও। কষ্ট কর, তাইলেই কেষ্ট মিলবে। কষ্ট কইরা চাষাবাদ করার পর চাষীরা ফসল ঘরে তুলে। কষ্ট না কইরা তুমি খেলা নিয়া থাকলে, আড্ডা মারলে, তামাশা করলে কেষ্ট মিলবে না। কষ্ট কইরা রাইত দিন খাইটা লেখাপড়া কইরা মানুষ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়, জজ ব্যারিস্টার হয়। রাত দশটার আগে ঘুমানি চলবে না। টিউটর আসে ঠিকমত?
এই উত্তরটি বাবা দেবেন না, আমাকেই দিতে হবে, হ, আসে।
সামনের পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হইলে, বাবা চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন, পিঠের চামড়া তুইলা ফেলব, বইলা দিলাম।
জুতোর মচমচ শব্দ শুনে বুঝি বাবা এখন সরেছেন দরজা থেকে। দরজায় দাঁড়িয়ে এরকম বাণী বর্ষণ করা তাঁর প্রতিদিনের স্বভাব। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে যে করেই হোক মস্ত কিছু বানাবেন তিনি, এরকমই তাঁর পণ। মেট্রিকে খারাপ ফল করার পর দাদা বাড়ি ফেরেননি তিনদিন ভয়ে। বাবা সন্ধি বেত হাতে নিয়ে দাদার অপেক্ষায় বসেছিলেন, মাথায় লোটা লোটা ঠান্ডা পানি ঢেলেছিলেন। দাদার বন্ধুরা যারা একই রকম পাশ করেছিল, তাদের বাবারা মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরেছে, আত্মীয় স্বজনকে ছেলে-পাশের মিষ্টি খাইয়েছে। তিনদিন পর দাদাকে খুঁজে বার করে কান টেনে বাড়ি নিয়ে আসেন বাবা। সাফ সাফ বলে দেন, আইএসসিতে ভাল ফল না পেলে এ বাড়ি থেকে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। দাদার জন্য তিনটে মাস্টার রেখে দিলেন। পরীক্ষায় তারপরও দাদা দ্বিতীয় বিভাগ। দাদা নিজে অবশ্য বলেন হায়ার সেকেন্ড ডিভিশন। তাঁর ওই হায়ার দিয়ে কাজ হয় না। মেডিকেল কলেজে দু’দুবার ভর্তি পরীক্ষায় বসেও পাশের লিস্টিতে নাম পাওয়া যায় না তাঁর। দাদার এ অবস্থায় বাবার রক্তচাপ বাড়তে থাকে। মুড়ির মত ওষুধ ছুঁড়তে থাকেন মুখে। অক্ষমাযোগ্য অপরাধ করে দাদা লক্ষ করেন সংসারে তাঁর আদর কমছে, তিনি দিন দিন উদাস হতে থাকেন। খেতে বসে বাবা ছোটদার পাতে মাংসের ভাল টুকরোগুলো তুলে দেন, দাদা ঝোল মেখে ভাত ডলতে থাকেন, পাতে একখানা কেবল চোষা হাড়।
ছোটদার জন্য চারটে মাস্টার, অঙ্কের, পদার্থ বিদ্যার, রসায়নের, ইংরেজির। ছোটদা মাস্টারদের বাড়িতে পড়তে যান বিকেলে। আমার মাস্টার আসেন বাড়িতে। ইয়াসমিনের মাস্টারও। ইস্কুল থেকে ফিরে জিরোতে না জিরোতে মাস্টার আসেন। যত ওপরের ক্লাসে উঠছি, তত গৃহশিক্ষক বাড়ছে। দাদা আর ছোটদার জন্য সন্ধে থেকে রাত বারোটা অবদি পড়া, আমার জন্য দশ, ইয়াসমিনের জন্য রাত আট, বাবা এরকম নিয়ম করে দেন। দাদারা বড় বলে শব্দ করে না পড়লেও চলবে, কিনতু আমাদের, আমার আর ইয়াসমিনের শব্দ করে পড়তে হবে, বাবা যেন তাঁর ঘরে বসে শুনতে পান আমরা ঘুমোচ্ছি না, পড়ছি। এদিকে ঘড়ির কাঁটা আটের ঘরে এলে আমার চোখ ঢুলে আসে, বাবা পা পা করে এসে আমাকে হাতে নাতে ধরে বলেন যাও চোখ্যে সরিষার তেল দিয়া আসো, তাইলে ঘুম আসবে না। চোখের রোগীরা যেমন করে চোখে ওষুধ দেয়, আমাকে ঠিক ওরকম করে ঘাড় পিঠের দিকে ঝুলিয়ে শিশি থেকে ঢালতে হয় চোখে সর্ষের তেল, চোখ জ্বালা করে বিষম কিন্তু বাবা স্বস্তি পান ভেবে যে ঘুম এখন বাপ বাপ করে পালাবে। পড়তে বসে সন্ধে থেকে টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমোতে থাকেন ছোটদা। কালো ফটকের শব্দ শুনলে ধাক্কা দিয়ে ছোটদাকে জাগিয়ে দিই, উঠ উঠ বাবা আইছে। ছোটদা ধড়ফড়িয়ে মাথা তোলেন, মুখের লালায় বই ভেজা, লালার শাদাটে দাগ নেমে গেছে ঠোঁটের কিনার থেকে গালে, চোখদুটোয় শুকনো মরিচের লাল। পা নাড়তে নাড়তে তিনি পড়তে শুরু করেন। আসলে তিনি কিছু পড়েন না, গাঁগোঁগাঁগোঁ ধরনের শব্দ করেন। দূর থেকে বাবা সম্ভবত ভাবেন তাঁর পুত্রধন এবারও স্টার পেয়ে বাবার মান রক্ষা করবেন।
বাবা যতক্ষণ বাড়ি থাকেন, সকলে গলা নিচু করে কথা বলে। বাড়িতে কবরের স্তব্ধতা, যেন চারটে লক্ষ্মী ছেলেমেয়ে একেকজন বড় বড় দার্শনিক বা বিজ্ঞানী হতে যাচ্ছে। দাদার বেলা বাবার বাণী এরকম–এই গাধারে দিয়া কিচ্ছু অইল না। মেডিকেলে পড়াইতে চাইলাম। চান্স পায় নাই কোথাও। বি এস সি পরীক্ষা দিয়া এখন কেরানিগিরি ছাড়া তর ভাগ্যে আর কি জুটব! দেখ কুনো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইতে পারস কি না। তরই বন্ধু জাহাঙ্গীর ডাক্তারি পড়তাছে। ফয়সল পড়তাছে। তর কি মগজ কিছু কম ছিল ওদের চেয়ে! ওরা ভাত খাইছে, তুই খাস নাই? এত এত মাস্টার রাইখা পড়াইলাম, তাও পরীক্ষায় একটা ফার্স্ট ডিভিশন পাইলে না। লজ্জা করে না মুখ দেখাইতে। আমি হইলে কচুগাছে ফাঁসি নিয়া মরতাম।
