আমি মাথা নাড়ি। আমার আর কি বলার ছিল!
— তুমি খুব লাজুক মেয়ে। এত কম কথা বল। হোস্টেলে এসো, তোমার সঙ্গে গল্প করবখন। বলে রুনি আমার হাত ধরে কাছে টানে তার, রুনির শরীরে ফুলের গন্ধ। রুনি যেন রূপকথার দোলনচাপা, প্রাণ পেয়ে রাজকুমারি হয়েছে। আমার সারা শরীর কাঁপে ভাল লাগায়। বুক ধুকপুক করে। আমার ভেতরে কোথাও কোনও পুকুরে একশ পদ্ম ফোটে। মিলু আরও চিঠি দিক, রুনি তার উত্তর দিক প্রতিদিন, তাহলেই আমি রুনির আরও আরও কাছে যাব, রুনি আমার চিবুকে আঙুল রাখবে, চমৎকার ভাঙা কণ্ঠে কথা বলবে, কপালের চুলগুলো উড়বে হাওয়ায়। আমি তার বুকে মুখ রেখে দোলনচাপার গন্ধ নেব।
পড়ালেখায় মন বসে না, খাতায় শতবার করে নাম লিখি রুনির। অঙ্ক করতে করতে, কখন বুঝি না মার্জিনের বাঁপাশে রুনির কালো দুটো চোখ আঁকি। হোমওয়ার্কে গোল্লা পেতে থাকি দিনদিন। রুনি আমার জীবন জগত, জানি সে ক্ষুদ্র, গ্রাস করে নেয়। খেলার মাঠ আমাকে আর আগের মত টানে না, পুকুর ঘাটে একা বসে থেকে রুনিকে ভাবি, পুকুরের কালো জলে রুনির চোখ দেখি। যে বাহুতে আমার স্পর্শ করেছিল রুনি, সে বাহুতে হাত বুলিয়ে মনে মনে আবার তার স্পর্শ নিই। আমার পুতুল খেলা, গোল্লাছুট, অপেনটো বায়োস্কোপ তুচ্ছ করে উদাস বসে থাকি কদম গাছের তলে, রুনির স্পর্শ পাওয়ার তৃষ্ণায় গোপনে আকুল হই।
রুনির সঙ্গে আসলে দীর্ঘ দীর্ঘ ক্ষণ বসে কখনও আমার গল্প করা হয়নি। আমার সাধ না মেটা যেটুকু অল্প সময় রুনির জুটত, ও নিজে গল্প বলেছে, আমি মুগ্ধ হয়ে কেবল শুনেছিই, হোস্টেলের সিঁড়িতে বসে, ওর বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে। যেন রূপকথার বইএর ছবি থেকে নেমে আসা দোলনচাপা-রাজকুমারি এক নিবিড় বনে চুল খুলে গান গাইছে। ওকে কেবল ভীষণ রকম ভালবাসতে ইচ্ছে করত আমার, খুব গোপনে ভীষণ রকম। ওর চোখের দিকে একবার তাকালে আমার সারা জীবনের গল্প ওকে বলা হয়ে যায়। ওকে একবার স্পর্শ করলেই জগতের সব সুখ আমার হাতের মুঠোয় চলে আসে। রুনি আমার হাতে রেশমি চুড়ি পরিয়ে দেয়, গলায় মালা। রুনির শরীর ঘনিষ্ঠ হতে থাকে আমার শরীরের সঙ্গে, আর আমি গন্ধ পেতে থাকি দোলন চাঁপার। আমি ওকে আরও আরও ভালবাসতে থাকি। শরমে চোখের পাতা নুয়ে আসে আমার।
সেই চুড়ি মালা অবশ্য বাড়ি এসে খুলে রাখতে হয়। বাবা জামা জুতো ছাড়া শরীরে বাড়তি কোনও জিনিস পছন্দ করেন না। অলংকার পরাবেন আশায় আমার দু’কান ছিদ্র করেছিলেন মা, দেখে মা’কে যা তা গাল দিয়েছেন বাবা। কখনও চুড়ি মালা দুল পরতে দেননি, ইস্কুল থেকে ফেরার পথে ফুটপাতের চুড়িঅলার কাছ থেকে একবার এক হাত কাচের চুড়ি কিনে বাড়ি ফিরেছিলাম, দেখে ভেঙে টুকরো টুকরো করে সবকটা চুড়ি, গালে চড় কষিয়ে বাবা বলেছিলেন–ফের যদি দেখি এইসব পরছস, তর হাড় গুঁড়া কইরা দিব।
পায়ে একবার আলতা পরেছিলাম, বাবা খামচে ধরে বলেছিলেন–কি ব্যাপার, রক্ত কেন তর পায়ে, কাইটা গেছে নাকি!
মা প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বলেছিলেন–রক্ত হইব কেন, মেয়েরা লাগায়, শখ হইছে, লাগাইছে।
রুনির দেওয়া চুড়ি মালা আমার পরার দরকার হয় না, ওর ভালবাসা আমি অন্তরে অনুভব করি। রুনির সঙ্গে গভীর গোপন ভালবাসায় আমি যখন মগ্ন, সে সময় এক রাতে, আমার শরীর জেগে ওঠে শুভ্র বিছানায়। কে যেন আমাকে নিজের বিছানা থেকে নামিয়ে নিঃশব্দে হাঁটায়, হাঁটিয়ে মেঝেয় পাতা ছোটলোকের মলিন বিছানায়, অন্ধকারের কাঁথায় ঢেকে শরীর, শোয়ায়। মণি আবার ফেরত এসেছে এ বাড়িতে, এসেছে ডাঙর হয়ে। দুপুররাতে বাবার সঙ্গে হাতে নাতে ধরা পড়ার পর রেনুর মা’কে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন মা, এরপর আকুয়ার বস্তি থেকে এক এক করে অনেককেই এনে গতর খাটিয়েছেন, শেষে পুকুরপাড়ে একা বসে থাকা, না খাওয়া মণিকেই তুলে আনেন। মণির শরীর নিয়ে আমি খেলি, ওকে উলঙ্গ করে, ওর বুকে হঠাৎ কবে বড় হওয়া দুটো পেয়ারা দু’হাতের মুঠোয় নিয়ে। মণির জামার তলে লুকিয়ে এত সুন্দর স্তন কেউ ছোঁয়নি; আমি কেবল ছুঁই, আমি কেবল দু’হাতে, ঠোঁটে, নাকে ছুঁয়ে দিই, যেন কতকালের পুরোনো সইএর সঙ্গে নতুন করে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা। রথের মেলা থেকে কিনে আনা মণি আমার শখের পুতুল, আমার জ্যান্ত পুতুল। আমার বুকে তখন কেবল গোলাপ ফুটছে, কুঁড়ির ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া গোলাপের ঘুমঘুম চোখ শরমে বুজে আসে আলোয়। অন্ধকারে সেই চোখ চুমু খায় মণির পাকা পেয়ারায়।
মধ্যরাতের গোপন খেলা
খেলেই চলি সইয়ের সনে,
কেউ জানে না।
এ যেন বালিকার গোল্লাছুট। গোল্লা থেকে ছুটতে ছুটতে, ভুলে ধুলোকাদার ঘর, মিছিমিছির রান্নাবাড়ি, পুতুল বিয়ে, টগবগ করা জীবনের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দু’চোখে রাজ্যির বিস্ময় নিয়ে খুলে খুলে শরীর দেখি, শরীরের ভেতরে দেখি লুকোনো আরও এক গোপন শরীর।
বোকাচন্দ মেয়েটি গোপনে গোপনে এমন কান্ড ঘটিয়ে ফেলতে পারে! রুনিকে, মিলুর চিঠি আর সে দেয় না, এখন নিজেই সে ফুলপাখিপাতার আল্পনা আঁকা কাগজে চিঠি লেখে, দাদার ড্রয়ার থেকে চুরি করা কাগজে, বুকের বাগান থেকে একটি একটি করে শব্দের ফুল তুলে সে মালা গাঁথে। রুনি উত্তর লেখে। রুনির চিঠিতে সে দোলনচাঁপার ঘ্রাণ পায়। তার নিরাভরণ নিস্পন্দ জীবন দুলে ওঠে ফুলের দোলনায়। কে জানে বাড়ির! কেউ না। একই সঙ্গে দুটো জীবন যাপন করি আমি, বাবা মা’র গাল, চড় থাপড় খাওয়া বাইরের আমি, আর ভেতরের অন্য আমি, গোল্লা থেকে ছোটা আমি, প্রেমের জলের ডুবুরি।
