বাড়িতে খবরটি গোপন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম। সম্ভব হয়নি। অসময়ে ইস্কুল থেকে হলুদ পাজামার ফেরা, সঙ্গে মেথরানি। বাড়ির বড়রা মুখ টিপে হাসে, ছোটরা গলা ফাটিয়ে। দাদার নিজের একার দুর্নাম ঘুচল এবার, সাত পাক নেচে বলে–
বিদ্যাময়ীর হাগড়া গাড়ি শাদা পাজামা হলুদ করল
অসময়ে ইস্কুল থেইকা রামরতিয়ায় নিয়া আইল।
পুরো মাস আমাকে গুয়ের চারি, রামরতিয়ার সই বলে ডাকা হল বাড়িতে। মা অবশ্য মাঝে মধ্যে ধমকে সরান দাদাকে, বলেন ওর পেটটা খারাপ আছিল।
মা’র আস্কারা পেয়ে আমি দাদাকে ভেংচি কেটে বলি–তুমিও তো ইস্কুলে হাগ্যা দিতা!
দাদা বলে–ইহিরি, তর মত বড় হইয়া হাগছি নাকি, আমি তহন ছোট্ট, ওয়ানে পড়ি মাত্র।
দাদাকে নিতে এক্সপেরিমেন্টাল ইস্কুলের রিক্সা আসত, বাচ্চারা যেন সিট থেকে পড়ে না যায় সামনে বেল্ট বাঁধা থাকত। প্রায়ই ইস্কুল ছুটির আগেই দাদাকে বাড়ি দিয়ে যেত রিক্সাঅলা। দু’আঙুলে ধরা থাকত দাদার গুয়ে মাখা হাফপ্যান্ট। একদিন রেগেমেগে রিক্সাঅলা বলল ছেলের পেট ভালা কইরা পরে ইস্কুলে পাঠাইয়েন।
মা বলেন–একবার এক কৌটার দুধ খাওয়ানোর পরে নোমানের পেট যে খারাপ হইল তো হইলই। আইজও ওর পেটটা ভালা না।
এটি হচ্ছে দাদার জন্মের দোষে নাকি কৌটোর দুধের দোষে, মা নিশ্চিত নন।
দাদার হেগে দেওয়া প্রসঙ্গ এলে আমি স্বস্তি বোধ করি। অন্তত আমি যে একা একটি বিশ্রি কান্ড ঘটাইনি, তা ভেবে। কিন্তু ইস্কুলে সে স্বস্তি জোটে না আমার।
ইস্কুলে কারও ফেভারিট হওয়ার সম্ভাবনা, আমি বুঝি, আমার আর নেই। লম্বা মেয়েটিকে দূর থেকে দেখেই উল্টো হাঁটি। যে কেউ আমার দিকে তাকালে মনে হয় সে বুঝি আমার পাজামা হলুদ করার ঘটনাটি জানে। লজ্জায় আমার কান নাক লাল হয়ে থাকে।
যুদ্ধ শেষ হলে যখন ইস্কুল খোলে, বার্ষিক পরীক্ষা ছাড়াই আমাদের ওপরের ক্লাসে তুলে দেওয়া হয়। পাক সর জমিনের বদলে ইস্কুলের এসেম্বলিতে নতুন পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে গাইতে হয় আমার সোনার বাংলা। মানুষের দৈর্ঘ প্রস্থ বদলে গেছে, ভাবনা ভাষা আরও সতেজ, দীপ্ত, আরও প্রাণময়। যেন বয়স ন’ মাসের বদলে বেড়ে গেছে ন’ বছর। যেন বালিকারা এখন আর বালিকা নয়, তরুণী। কারও বাড়ি পুড়েছে, কারও ভাই হারিয়েছে, কারও বাবা, কারও ধর্ষিতা বোনের জরায়ুতে ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছে অনাকাংখিত শিশু। এরকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সকলে আমরা হেঁটে এসেছি, লাশ দেখতে দেখতে, আর্ত চিৎকার শুনতে শুনতে।
তখন কোনও এক বালিকা-বেলায় শাদা পাজামা হলুদ করে বাড়ি ফিরেছিলাম এ নিতান্তই বিস্মৃত হওয়ার মত তুচ্ছ।
অপেনটো বায়োস্কোপ
নাইন টেন তেইসকোপ
সুলতানা বিবিয়ানা
সাহেব বাবুর বৈঠকখানা
বলে মেয়েদের গলায় মালা পরিয়ে নিজের দলে নিয়ে গোলাপ পদ্ম খেলতে, আমার আর কান গরম হয় না শরমে। খেলার ঘন্টা বাজলে জিমনেসিয়ামে দৌড়োনো, টিফিনের সময় দৌড়ে দাঁড়িয়াবান্ধার কোট দখল করায় আমি আর আড়ষ্ট হই না। বৈাচি খেলতে আর সবার মত আমিও নামি। অবশ্য বার্ষিক খেলা প্রতিযোগিতায় আমি যে লাড্ডু, সে লাড্ডুই থাকি। শাহানা আর তার চার বোন, হীরা, পান্না, মুক্তা, ঝর্ণা লেখাপড়ায় লাড্ডু হয়েও খরগোসের মত ছোট দৌড়, বড় দৌড়, বিস্কুট দৌড়, ব্যাঙ দৌড় এরকম একশ রকম দৌড়ে সবকটি পুরষস্কার জিতে নিয়ে যায়। শাহানার দিকে বিস্মিত মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকি আমি। ইস্কুলের সেই দুর্দান্ত মেয়ে শাহানার সঙ্গেও আমার বিষম ভাব হয়ে গেল একদিন।
এতসবের মধ্যেও, আমার কিন্তু বুক ধুপপুক করেছিল আরও একবার, চোখ নত হয়েছিল, লজ্জায় লাল হয়েছিল নাকের ডগা, আমার হাতখানা সে ছুঁয়েছিল বলে সারা গা কেঁপেছিল আমার, তাকে স্বপ্ন দেখে জেগে উঠতাম, সারাদিন তাকে মনে করে আমার ঠোঁটে খেলত মিষ্টি হাসি। ঘুমোতে গেলে চোখে ভাসত মেয়েটির মুখ, তার হাসি, তার কথা বলা, তার হেঁটে আসা, তার হাত নাড়া, তার পিঠের ওপর কোঁকড়া চুলের বেণি। আমার মনে হত জগতে আমি এত আশ্চর্য সুন্দর কাউকে দেখিনি। জগতে আর কারও চোখ এত সুন্দর নয়। মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে, আমি জগত ভুলে যাই। আমার সারা গায়ে অদ্ভুত, অদ্ভুত শিহরণ হয়।
ঘটনাটির শুরু এরকম, ইস্কুলে যাচ্ছি, ছোটদা আর তাঁর এক বন্ধু, মিলু, পথে আমাকে থামিয়ে একটি চিঠি দিলেন হাতে, রুনি নামের এক মেয়েকে, মেট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছে, হোস্টেলে থাকে, দিতে। চিঠিটি মিলুর লেখা। বলা হল, ব্যাপারটি যেন বাড়ির কেউ না জানে, ইস্কুলের কোনও মেয়েও। এ আর এমন কি, রুনিকে খুঁজে বের করে চিঠিটি দিই। চিঠিটি রুনি তখন পড়ে না, জামা সরিয়ে বুকের ভেতরে কোথাও রেখে দেয়। আমি অপলক তাকিয়ে ছিলাম রুনির চোখে। সেই আশ্চর্য সুন্দর দুটো চোখে। আমার ইচ্ছে করেছিল রুনি দাঁড়িয়ে থাকুক আমার সামনে আরও আরও, আমি তার চোখদুটোর দিকে আরও আরও তাকিয়ে থাকি। রুনি সেদিন চিঠি নিয়ে চলে যাওয়ার পর আমি দাঁড়িয়েই ছিলাম হোস্টেলের দেয়ালে পিঠ রেখে, ক্লাসের ঘন্টা আমাকে সচল করার আগ অবদি। সেই থেকে আমার তৃষ্ণার্ত চোখ খোঁজে তাকে হাজার মেয়ের ভিড়ে। ক্লাসঘরের জানালায় বসে তাকিয়ে থাকি বাইরের মাঠে, যদি তাকে হাঁটতে দেখি, যদি একপলক দেখা হয় আবার হঠাৎ কখনও।
দু’দিন পর ইস্কুল ছুটি হলে পদ্মপুকুর পাড় থেকে দৌড়ে এসে আমাকে একটি চিঠি দেয় রুনি, মিলুকে দিতে। চিঠিটি হাতে নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। রুনি মিষ্টি হেসে বলে–কিছু বলবে?
