বাবার সঙ্গে আমার হৃদ্যতা নেই মোটে, তিনি সামনে দাঁড়ালে মনে হয় এক দৈত্য এসে দাঁড়াল, প্রাণ যায় যায়, তবু বাবা যখন বলেন জ্বর হচ্ছে অসুখের উপসর্গ, শরীরে জীবাণু ঢুকে অসুখ তৈরি করে, ওষুধে জীবাণু নাশক জিনিস আছে, তা শরীরে গিয়ে জীবাণু ধ্বংস করলে তবেই অসুখ সারে–বাবার কথাকেই আমার যৌক্তিক মনে হয়। নানিবাড়ির পেছনের বস্তিগুলোয় কারও অসুখ হলে ফুঁ দেওয়ার চল ছিল। ক’দিন পর পরই সুরা টুরা পড়ে রোগে ভোগা গেঁতুকে ফুঁ দিয়ে যেত এক মৌলবি, পানিতে ফুঁ দিয়ে রেখে যেত, পড়া পানি খেলে নাকি অসুখ সারবে। ফুলে ঢোল হয়ে, শেষে গেঁতু, ছ’বছর বয়স মাত্র, মরেই গেল। ঝুনু খালার পাগলামি কমাতেও মৌলবি ফুঁ দিয়েছিলেন, কমেনি। বাবাকে ফুঁ দিতে গোপনে এক মৌলবি যোগাড় করেছিলেন মা, যেন রাজিয়া বেগমের কবল থেকে মুক্ত হন বাবা। বাবার গায়ে তো ফুঁ দেওয়া সম্ভব নয়, ফুঁ দিয়েছিলেন বাবা যে ঘরে ঘুমোতেন, সুতোয় গিঁট দিয়ে চার টুকরো সুতো পুঁতে রেখেছিলেন সে ঘরের চার কিনারে, গোপনে। মৌলবি বলে গিয়েছিলেন, এখন আপনের স্বামীর মন ফিরব। মা আর নানিকে ফিসফিস কথা বলতে শুনেছিলাম এ নিয়ে। বাবার মন তো ফেরেনি, মা’র চেয়ে বেশি আর এ কথা কে জানে! তবু ঝাড় ফুঁকে অন্ধ বিশ্বাস মা’র।
মা বলেন সব মিথ্যে যা লেখা ইস্কুলের বইয়ে। আমার বিশ্বাস হতে চায় না। পীরবাড়িতে যাওয়া শুরু করার আগে ইস্কুলের লেখাপড়াকে মা দোষ দেন নি, বরং তিনি নিজে আরও লেখাপড়া করতে পারেননি বলে দুঃখ করতেন। দুঃখ হঠাৎ হঠাৎ এখনও করেন, সে জ্ঞানার্জনের জন্য নয়, লেখাপড়া না করাতে তিনি কোনও চাকরি জুটিয়ে বাবার সংসারে ঝাড়ু মেরে মহানন্দো বিদায় নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছেন না বলে। চোখের সামনে কী ভীষণ পাল্টে গেলেন মা। মা কি ভূল পথে যাচ্ছেন, নাকি সত্য পথে। আমি ঠিক বুঝে পাই না, মা না হয় যুক্তি ছাড়া কথা বলেন কিন্তু লেখাপড়া জানা, রীতিমত বিএ এমএ পাশ করা লোকেরাও তো কখনও মানুষ বা জগতের উৎপত্তি বিষয়ে কোনও তর্কে মাতেন না, আল্লাহ যা বলেছেন তা দিব্যি মেনে নেন, নিশ্চয় মেনে নেন, মেনে না নিলে নামাজ রোজা করেন কেন! নানিবাড়ির পেছনে বস্তি, সামনে ছিল শিক্ষিত লোকদের বাড়ি। সেসব বাড়ির এত লোক যখন আল্লাহকে মানেন, আল্লাহ ব্যাপারটি নেহাত ফেলনা নয়। বাবা নিজেই রোজা করেন, রমজান এলে। ছোটবেলায় আমার শখ হত রোজা রাখতে, শেষ রাতে উঠে আমিও সবার সঙ্গে বসে প্রথম মাছ মাংস পরে দুধ কলা মেখে ভাত খেতাম। দুপুর বেলা বাবা বলতেন এখন তুমাকে কিছু খেতে হবে।
আমি মাথা নেড়ে বলতাম–আমি রোজা রাখছি।
— উহুঁ, ছোটদের রোজায় এখন খাইয়া পরে আবার ইফতারি করতে হয় সন্ধ্যার সময়। তাইলে রোজা হইব দুইটা। বাবা বলতেন।
আসলে দুটো রোজার মানেটি হচ্ছে আমাকে খেতে হবে, সারাদিন না খেয়ে থাকলে আমার কষ্ট হবে, আমি কষ্ট পাই বাবা চাইতেন না। শেষ রাতে সাইরেন বাজার সময় বেশির ভাগ দিনই আমাকে ডাকা হত না, কিন্তু ঘরে থাল বাসনের শব্দ পেয়ে লাফিয়ে উঠে শেষ রাতের খাবার খেতাম, রোজা রাখব। আল্লাহ বলেছেন উপোস করতে, তাই উপোস করতে চাইতাম তা নয়। ছোটরা রোজা রাখলে বাড়িতে বেশ আদর পাওয়া যায়, লক্ষ করেছি। আদর পাওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য, সম্ভবত। আদরের বাইরেও এ অনেকটা খেলার মত ছিল, উপোস উপোস খেলা, খেলা শেষে মুড়ি, ছোলা, ডালের বড়া, বেগুন বড়া, গরম গরম জিলিপির সামনে বসে থেকে সাইরেন বাজলে খাওয়া শুরু করা। সাইরেন সাইরেন, খাওয়া খাওয়া।
পুরো মাস রোজা রেখে বাবা ঈদের উৎসবও করেন জাঁক করে। ছেলেমেয়েদের জন্য জামা কেনেন, মা’র জন্য শাড়ি, বড় ঈদে কোরবানি দিতে গরু কেনেন, নয়ত খাসি। সারাবছরে বাবার এটুকুই ধর্ম পালন। অবশ্য মাঝে একবার ্এক মৌলবি রাখলেন প্রতি সকালে এসে যেন তাঁকে কায়দা পড়িয়ে যান। হঠাৎ এ শখ কেন হয়েছিল তাঁর, কাউকে বলেননি। তবে শখটি হওয়ার ক’দিন আগে তিনি, আমি মনে করতে পারি, রাতে বাড়ি ফিরে খাবার টেবিলে বসে মা’র কাছে বলেছিলেন যে এক রোগীর বাড়িতে অদ্ভুত এক লোক দেখেছেন তিনি, লম্বা চুলদাড়ি লোকটির, ছেঁড়া জামা জুতো, কাগজে আল্লাহ লিখলেন আরবিতে, আর সে লেখা থেকে স্পষ্ট আওয়াজ বেরোতে লাগল আল্লাহু আল্লাহু। কাগজটি হাতে নিয়ে বাবা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন কোনও চালাকি আছে কি না, নেই। জামার পকেটে কোনও যন্ত্র লুকোনো আছে কি না, নেই। লোকটি নিজে শব্দ করছে কি না মুখে, না। কাগজের অক্ষর এমন জিকির কী করে তোলে বাবা বুঝে পান না। মা আহা আহা করলেন বাবার গল্প শুনে। বাবা লাটিমের মত ঝিম ধরে বসে রইলেন। মুখে খাবার উঠল না। ভাত নেড়ে চেড়ে ক্ষিধে নেই বলে থাল সরিয়ে রাখলেন। রক্তচাপ বাড়লে বাবা সকাল সকাল ঘুমোতে চলে যান যেমন, সে রাতেও গেলেন। বাবা কখনও, কী করলেন তিনি বাড়ির বাইরে, কী রোগী দেখলেন, কোথায় কী ঘটল কিছু বলেন না কাউকে, আমাদের তো নয়ই, মা’কেও না। কিন্তু সেদিন বাবা অদ্ভুত ব্যবহার করলেন। তার সপ্তাহ খানিক পর সকাল বেলা রাতকানা মৌলবি, রাতে লোকটি পথ চেনেন না বলে লোকে ডাকে তাই, নতুন একটি কায়দা হাতে নিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন, বাবা খবর দিয়েছেন। অবশ্য বাবার এসব সয়নি বেশিদিন। দুদিন আলিফ জবর আ বে জবর বা পড়েই মৌলবি এলে বলতেন, মৌলবি সাব চা টা খান, আজ আর পড়তে ইচ্ছা করতাছে না। আগামী কাল পড়ব। চা নাস্তা দেওয়া হত মৌলবিকে বাইরের ঘরে, ও খেয়ে তিনি বিদেয় হতেন। আগামীকাল আসে, পরশু আসে, ছাত্রের টিকিটির আর দেখা পাওয়া যায় না। দিন পাঁচেক পর মৌলবিকে পুরো মাসের বেতন দিয়ে একেবারই বিদেয় করে দিলেন। এই হচ্ছে ধর্মের গ্রাস বাবার ওপর, কেবল দু’দিনের জন্যই ছিল তার থাবা। এরপরই বাবা আবার আগের বাবা, অহংকারি, নীতিবান, কর্মঠ, ব্যাকব্রাশ, প্যান্টের ভেতরে শার্ট, শার্টের ওপর টাই, টাইয়ের ওপর কোট। শীতকালে ওভারকোট। ছয় ঋতুতেই জুতোর মচমচ।
