মা একবার বলেছিলেন আবদুল কাদের জিলানি আল্লাহর আদেশ পেয়ে কবর থেকে জ্যান্ত হয়ে বেরিয়েছিলেন। আমার বিশ্বাস হয়, যাদুকর লোকটিও তা পারবেন। মা’কে আর সে কথা বলতে যাই না। এত গাল খাওয়ার ইচ্ছে হয় না আমার। তবে মাথার ভেতর আরেকটি প্রশ্ন খুব আঁকু পাঁকু করে, সেটি মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়–পীরবাড়ির মানুষদেরে এত জ্বিনে ধরে ক্যান? আমাদেরে ত জ্বিনে ধরে না! ওই বাড়িতে তুমি কইছ আল্লাহ নাইমা আসেন, তাইলে আল্লাহর এরিয়ায় জ্বিন আসার সাহস পায় ক্যান!
মা আমার পেটে কনুইএর গুঁতো দিয়ে বলেন–আর একটা কথা না। বাসাত গিয়া তওবা কইরা নামাজ পইড়া আল্লাহর কাছে মাপ চা। আল্লাহরে ডরাস না, ডরাস না দেইখাই ত শয়তানি চিন্তা মাথাত আয়ে।
আমার প্রশ্নের কোনও উত্তর জোটে না।
ইস্কুলের বিজ্ঞান বই সামনে নিয়ে মা’কে বলি–আল্লাহ ত আদম হাওয়া প্রথম সৃষ্টি করছে, ঠিক না?
— করছে না, করছেন। মা আমার বেয়াদবি শুধরে দেন।
— এই যে দেখ, বিজ্ঞান বইয়ে আদিম মানুষের ছবি দেখিয়ে বলি, এক কোষি প্রাণী থেকে বহুকোষী প্রাণী, তারপর বানর থেইকা বিবর্তন ঘইটা এইরকম আদিম মানুষ হইছে। তারা গুহায় থাকত, মারামারি করত, ফল মুল খাইত, কাচা মাংস খাইত। অনেক পরে পাথরে পাথর ঘইষা আগুন জ্বালাইতে শিইখা তারপরে তারা অনেক কিছু করতে শিখে। ধীরে ধীরে মানুষ সভ্য হইছে। আল্লাহর বানানো হযরত আদম আলায়েসসাল্লাম কি এরম লোমঅলা ল্যাংটা বান্দরের মত দেখতে ছিল নাকি, যারে আল্লাহ মাটি দিয়া বানাইয়া বেহেসতের বাগানে হাঁটতে দিছিলেন!
মা চোখ নাক কুঁচকে, যেন দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে বই থেকে, বলেন–সর, সর, সর। দূর হ সামনে থেইকা। এই বইএ যা লেহা সব মিছা কতা। আল্লাহ যা বলছেন, তাই একমাত্র সত্য। আল্লাহর উপরে আর কুনো সত্য নাই।
মা’র সামনে থেকে আমাকে সরে আসতে হয়। বাবার কাছে ব্যাপারটি তুলব, তা সম্ভব নয়। তাঁর সামনে দাঁড়ালে গলায় স্বর ফোটে না। আল্লাহ সত্য নাকি বিজ্ঞান সত্য– কে আমাকে উত্তর দেবে। আল্লাহ যা বলেছেন তার ভেতরে যুক্তি কম দেখি। যুক্তি শব্দটি নতুন শিখেছি আমি, বাবা তাঁর বাণীতে ইদানীং প্রায়ই বলছেন, যুক্তি ছাড়া কোনও কাজ করবি না, যা কিছুই করস নিজের বিবেকরে জিগাস করবি, বিবেকে যদি কয় কাজটা করতে তাইলেই করবি। সব মানুষেরই বিবেক বইলা একটা জিনিস থাকে। মানুষ হইল এনিমেল, কিন্তু র্যাশনাল অ্যানিমেল। যুক্তিবুদ্ধি না থাকলে মানুষ আর জন্তুতে কোনও তফাৎ নাই।
বাবা অবশ্য বাণীটি দিতে শুরু করেছেন উঠোনে রাখা খড়ির স্তুপে দেশলাই জ্বেলে খেলতে গিয়ে আগুন প্রায় ধরিয়ে দিয়েছিলাম বলে। আগুন যদি ছড়াতো, বাবার বিশ্বাস বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে যেত।
বিজ্ঞানের কথায় আমি যুক্তি দেখি বেশি। আল্লাহ আদম হাওয়াকে ধাম করে বেহেসত থেকে ফেলে দিলেন পৃথিবীতে, কেমন যেন গপ্প গপ্প মনে হয়। রূপকথার বইয়ের মত। মা’কে বললে মা বলেন আল্লাহ সম্পর্কে বাজে কথা কইলে তর জিব খইসা পড়ব। আমি জিভ খসে কি না দেখতে ঘরের দরজা বন্ধ করে আল্লাহ তুই পচা, আল্লাহ তুই শয়তান, আল্লাহ তুই একটা আস্তা বদমাইশ, আল্লাহ তুই শুয়োরের বাচ্চা বলেছিলাম। জিভের জায়গায় জিভ রইল, আমিও নিশ্চিত হলাম আল্লাহকে গালাগাল করলে আসলে জিভ খসে না, মা ভুল বলেন। আর আল্লাহর কাছে চাইলেই যে আল্লাহ কিছু দেন না, তারও প্রমাণ পেয়েছি। নামাজ সেরে আল্লাহর কাছে মোনাজাতের হাত তুলে পোড়াবাড়ির চমচম চেয়েছিলাম, শরাফ মামারা যেমন ঠান্ডার বাপের দোকানের লুচিবুন্দি নাস্তা খায়, তা চেয়েছিলাম, জোটেনি। একটা কাঠের ঘোড়া চেয়েছিলাম, রাজবাড়ি ইস্কুলে চমৎকার রঙিন একটি কাঠের ঘোড়া দেখে লোভ হয়েছিল, কেউ আমাকে কাঠের ঘোড়া দেয়নি, আরও কত কী চেয়েছিলাম—- আমান কাকা আর শরাফ মামা কুষ্ঠ হয়ে মারা যান চেয়েছিলাম, ওঁদের কুষ্ঠও হয়নি, ওঁরা মরেনও নি। মা প্রায়ই আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করেন বাবা যেন কুষ্ঠ হয়ে শিগরি মরে যান। অথচ বাবা দিব্যি সুস্থ, দিন দিন পেশীতে শক্তি বাড়ছে। জ্বরেও যে একদিন বিছানায় পড়বেন, তাও নয়। আমার প্রায়ই জ্বর হয়, সে কি খুশি হই জ্বর হলে, তখন আর লেখাপড়া করতে হয় না, বাবা তখন বেশ নরম গলায় কথা বলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। ওই একটি সময়, যখন বাবার আদর বড় সুলভ। থোকা থোকা আঙুর, কমলালেবু এনে শিয়রে রাখেন, শুয়ে শুয়ে ভাইবোনকে দেখিয়ে দেখিয়ে খাই। ওরা হাত পেতে প্যান প্যান করে চাইলে সামান্য দিই। মা আদা কেটে নুন মেখে দেন খেতে। কিন্তু ওষুধ খেতে গেলেই বিরক্তি ধরে, জ্বর হওয়ার আনন্দ সব উবে যায়। বড় বড় ট্যাবলেট গিলতে বললে মনে হয় অসুখ হওয়াটা বড় বাজে এক ব্যাপার। পাঁচ ছ’রকম ওষুধ ঘন্টায় ঘন্টায় গিলতে বলেন বাবা। খাচ্ছি খাব বলে টুপ করে জানালার বাইরে ওষুধ ফেলে দেওয়ার অভ্যেস আমার। জ্বর সাত আটদিনেও যখন ছাড়ে না, বাবার সন্দোহ হয়। তিনি নিজে আমার মুখের ভেতর পানি ঢেলে বলেন হা কর, হাঁ করলে ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল ঢুকিয়ে দেন মুখে। গলায় ওসব আটকে যায়, ওয়াক করে মেঝে ভাসিয়ে ফেলি। বাবা আবার বলেন হাঁ কর। এ ঠিক একবার না পারিলে দেখ শতবার এর মত। বাবা হাল ছাড়েন না যতক্ষণ না ওষুধ আমার পেটে ঢুকছে। বাবা ঘরে না থাকলে মা সুরা পড়ে ফুঁ দিয়ে দেন বুকে। ফুঁ দেওয়াতে ভালই লাগে। ফুঁ তো আর তেতো ওষুধ নয় যে গিলতে হয়। গ্লাস ভরে ময়লা পড়া পড়া পানি খাওয়ান। অসুখ সারলে মা বলেন মা’র ফুঁয়ে আর পীরের পড়া পানিতে অসুখ সেরেছে, বাবা বলেন ওষুধে সেরেছে।
