বড় মামা ঢাকা থেকে প্রতিমাসে অবকাশের ঠিকানায় উদয়ন নামে একটি পষিনকা পাঠান। এটি আমাদের কাজে লাগে বই খাতার মলাট বাঁধায়। উদয়ন এল, ছবি টবি দেখে ব্যস মলাট। বইখাতায় মলাট বাঁধা সেই লেখাপড়া শুরু করা অবদি শেখা। প্রথম প্রথম মলাট বেঁধে দিতেন মা, বিস্কুটের ঠোঙা, বাবা টোস্ট বিস্কুট কিনে আনতেন ভরে, কেটে। পরে সৌন্দর্যজ্ঞান বাড়লে নিজেই মলাট বাঁধি ক্যালেন্ডারের রঙিন পাতায়, গ্লাক্সোর ক্যালেন্ডারই বেশি, এরপর শুরু হল মাসিক উদয়নের পাতা ছিঁড়ে। উদয়ন পষিনকাটি সোভিয়েত ইওনিয়নের দূতাবাস থেকে বেরোয়, বড় মামা দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পষিনকাটির যুগ্ম সম্পাদকের চাকরি করেন। ময়মনসিংহে বেড়াতে এলে সঙ্গে করে বেশ বই আনেন, কিছু বই আবার রেখে যান আমাদের বাড়িতে। কী মনে করে কে জানে, সম্ভবত দাদারা যেন পড়েন। আদৌ ওসব বই খুলে দেখেন না দাদা কিংবা ছোটদা। আমি অলস বিকেলগুলোয় মাঝে মাঝে নেড়ে চেড়ে দেখি ছোটদের লেনিন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস, সমাজতন্ত্র কি ও কেন, ম্যাক্সিম গোর্কির মা, আমার ছেলেবেলা, পৃথিবীর পাঠশালা এসব।
বড়মামা বাড়ি এলে বেশ ভাল ভাল রেঁধে খাওয়ান মা, চলে গেলে বলেন–মেবাই কি যে হইয়া গেল, মাদ্রাসায় পড়া ছাত্র, হইল কি না কমুনিস্ট। ছি ছি। মা’র ছি ছি শব্দ আমাকে সজাগ করে। জিজ্ঞেস করি, কমুনিস্ট কি, মা?
— আর কী, আল্লাহ খোদা মানে না। মা মন-মরা স্বরে বলেন।
এই প্রথম বিস্ময় আমার, তাহলে আল্লাহ খোদা না মানা লোকও জগতে আছে! বড় মামা চাঁদে নীল আর্মস্ট্রং মুতে এসেছেন বলেন, আরবি ভাষাটি যে কোনও ভাষার মত একটি ভাষা, এ ভাষাতেও অশ্লীল কথা লেখা হয়, অবলীলায় বলেন, কিন্তু তিনি আল্লাহ খোদা মানেন না এ আমাকে আগে কেউ বলেননি। বড় মামা কেন তা মানেন না আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কোনও উপায় নেই জানার, বড় মামা থাকেন দূরের শহরে, যখন আসেন, তাঁর রাজকন্যাটিকে তিনি একটি ছোট খাট শিশুই ভাবেন, রাজকন্যা যে দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে, কতরকম প্রশ্ন জমছে মনে, তা তিনি মোটেও দেখতে পান না। বোকা সোকা লাজুক মেয়ের হাতে দু’টো লজেন্স তুলে দেয়াই ভাবেন যথেষ্ট। বড় মামার রেখে যাওয়া বইগুলো প্রথম নেড়ে চেড়ে এরপর পড়ে পড়ে আমার ধারণা জন্মেছে সেই ফ্রক পরা বয়সেই যে পৃথিবীটা কেবল ঝাড়ফুঁকের জগত নয়, এসবের বাইরে বড় একটি জগত আছে, যুক্তির জগত। নামাজ রোজা সবাই করে না, কোরান হাদিস সবাই পড়ে না। সবাই বারো মাসে তেরো পূজার আয়োজন করে না। মাটির মূর্তি বানিয়ে মাথা ঠোকে না। মিলাদ হয় না, কীর্তন হয় না। খ্রিস্টান মানেই মিশনারির কালো আলখাল্লা পরা নান আর ফাদার নয়। এর বাইরে অন্যরকম কিছু আছে। আমার সেই টলমল সময়ে বাড়িতে সাজ সাজ রব পড়ে যায় একদিন। বড় মামা খবর পাঠিয়েছেন তিনি এক বিদেশি লোক নিয়ে বাড়িতে আসবেন। বাড়ি ঝাড়া মোছা হল, মুছে মেঝে চকচক করা হল, বিছানাগুলোয় ধোয়া চাদর বিছানো হল, খাবার টেবিলের ওপর কাপড় বিছিয়ে দেওয়া হল। জানালা দরজায় নতুন পর্দা টাঙানো হল। দুপুরের আগেই আমাদের সবাইকে গোসল করে সবচেয়ে ভাল জামাটি পরে শান্ত হয়ে বসে থাকতে বলা হল বৈঠকঘরে। ভিক্তর ই পিরোইকো যখন বাড়ি ঢুকে সবার দিকে হাত বাড়িয়ে দেবেন, আমাদেরও হাত বাড়াতে হবে, আমাদের মুখস্ত করানো হল বলতে হাউ ডু ইউ ডু। ব্যস এটুকুই, এরপর আমাদের ঢুকে যেতে হবে ভেতরের ঘরে। ঠিক হল, দাদাই ঠিক করলেন, তিনি যেহেতু ইংরেজি বলতে জানেন, তিনিই খাবার টেবিলে বড় মামা আর ভিক্তরের সঙ্গে বসবেন খেতে। সব ঠিক। ভিক্তর এলেন, হাত মেলানো হল, কিন্তু হাউ ডু ইউ ডু, শেখানো বাক্যটি আমার মুখ থেকে কিছুতেই বেরোল না। বাক্যটিতে বড় হাডুডু হাডুডু গন্ধ আছে।
শেখানো জিনিসে, আজকাল এই হয়েছে আমার, মন সায় দেয় না। বাড়িতে প্রচুর খাবার রান্না হয়েছিল। খেয়ে দেয়ে ভিক্তর বাড়ি ঘুরে দেখতে বেরোলেন। উঠোনে আলম থাকত যে ঘরটিতে, সে ঘরের পেছনে জংলায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করলেন।
ওই প্রথম আমার কোনও শাদা লোক দেখা।
কী শাদা রে কী শাদা! জীবনে অনেক শাদা ইংরেজ দেখা মা’র চোখও বিস্ময়ে অভিভূত হল।
ভিক্তর চলে গেলে, যেন এ বাড়ি ভিক্তরের পদধুলোয় ধন্য হয়েছে, বিগলিত হেসে দাদা বারান্দার চেয়ারে বসে পা দোলাতে লাগলেন। তাঁর পরনে ইস্ত্রি করা শার্ট প্যান্ট, পালিশ করা জুতো।
মা পরদিন পীরবাড়ি থেকে ঘুরে আসার পর বললেন–শাদা হইলে কী হইব! দেখলাম ত খাড়োয়া পেশাব করছে বেডা। পেশাব কইরা পানিও লইছে না। শয়তানরা খাড়োয়া পেশাব করে। কম্যুনিস্ট ত, করত না! আল্লাহ রসুল বিশ্বাস করে না, আগে জানলে আমি রান্ধা বাড়া করতাম না।
শয়তানে, মা’র বিশ্বাস, জগত ভরে গেছে।
১০. ফেভারিট
বিদ্যাময়ী ইস্কুল শহরের নামকরা মেয়েদের ইস্কুল। বিদ্যাময়ী দেবী নামে শশিকান্ত নাকি সূর্যকান্ত মহারাজার বোন ইস্কুলটি বানিয়েছিলেন। দেয়াল ঘেরা বিশাল সবুজ মাঠের ওপর লাল দোতলা দালান। বট অশ্বত্থ গাছে ছাওয়া। মাঠের একপাশে পদ্মপুকুর। ইস্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় আমি টিকে গেলে, ঝুনুখালা, এ ইস্কুলে লেখাপড়া করেছেন যেহেতু, কোনটি কোন ক্লাসঘর, কোনটি মাস্টারদের বসার ঘর, কোনখানে এসেম্বলি হয় আমাকে চিনিয়ে বসিয়ে দেন চতুর্থ শ্রেণীকক্ষের প্রথম সারিতে। বসিয়ে, কানে কানে বলেন, মুচকি হেসে, তরে কিন্তু বড় ক্লাসের মেয়েরা আইসা একটা জিনিস কইতে পারে।
