মজলিশ শেষ হতেই এক এক করে লাইন ধরে পুরুষেরা কদমবুসি সেরে পীরের হাতে টাকা গুঁজে দেন। হাদিয়া যে কোনও অঙ্কের হতে পারে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে যে যা পারে তাই দেবেন হুজুর এ রকমই বলে দিয়েছেন।
আবু বকর পরম শ্রদ্ধায় হুজুরকে কদমবুসি সেরে বলেন–হুজুর বড় ভয় হয়, শেষ জমানা চইলা আসছে, কেয়ামত আইসা যাইতেছে। ব্যবসা বাণিজ্যে আর মন দিই না। খালি হাতেই তো দাড়াইতে হইব পরকালে। কী আছে কে জানে কপালে। সারাজীবন তো আমলই করা হয় নাই। দোয়া করুইন হুজুর, আপনের দোয়া ছাড়া কপালে দুর্গতি আছে। হুজুর কথা দেন, দোয়া তিনি করবেন।
পুরুষের হাদিয়া এবং কদমবুসি গ্রহণ করার পর অন্দরমহলে ঢোকেন হুজুর। বাইরে থেকে আসা মেয়ে মহিলা এখন এক এক করে কদমবুসি করে হাদিয়া দেবেন। এইপর্ব শেষ হলে হুজুর গা এলিয়ে দেবেন বিছানায়, তখন যুবতীরা ঝাঁপিয়ে পড়বেন গা টিপতে। আমি মা’র ওড়না টেনে নাকি সূরে বলি–ও মা। চল। বাসায় যাইতে হইব। বাবা বাসায় ফিইরা যদি দেখে আমি নাই, মারব ত!
এক ঝটকায় আমার মুঠো থেকে ওড়না ছাড়িয়ে মা বলেন–বিরক্ত করিস না।
আমি একা দাঁড়িয়ে থাকি উঠোনের অন্ধকারে, জবা গাছের তলায়। চুল খোলা থাকলে জ্বিনে ধরে শুনেছি। চুল ঢেকে রাখি ওড়নায়। ওড়না পাজামা পরার অভ্যেস নেই আমার, ওগুলো মেয়েরা আরও বড় হয়ে পরে। এখনও বাড়িতে ফ্রক পরি আমি। কিন্তু পীর বাড়িতে যে বয়সেরই হও না কেন, হুজুর অনুমোদিত পোশাক ছাড়া ফটকের ভেতরে ঢোকা যাবে না। দুনিয়ার ভেতরে এ এক আজব দুনিয়া।
রিক্সায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে মা’কে জিজ্ঞেস করি–এই যে লক্ষ লক্ষ বছর ধইরা আল্লাহ তায়ালা ইসরাফিলরে মুখে শিঙ্গা দিয়া বসাইয়া রাখছেন, এর দরকারটা কি ছিল? আল্লাহ ত জানেন কখন কেয়ামত হইব, তখনই তিনি ইসরাফিলরে কইতে পারতেন শিঙ্গা মুখে লইতে। বেচারা ইসরাফিল! কোনও নড়ন চড়ন নাই।
মা বোরখার তল থেকে বলেন–আল্লাহ ইহকাল পরকালের সৃষ্টিকর্তা। ইসরাফিল এক ফেরেসতা মাত্র। ইসরাফিলরে আল্লাহ যেভাবে বলছেন সেভাবেই আল্লাহর হুকুম মাইনা চলতে হয় তাঁর। সব ফেরেসতাদের চলতে হয়। আল্লাহর ইচ্ছা নিয়া প্রশ্ন করবি না। আল্লাহরে ভয় পাইতে হইব।
আমি বলি–তুমার হুজুর তো বলছেন আল্লাহর প্রেমে পড়তে হইব। ভয় পাইলে কি প্রেমে পড়ন যায় নাকি!
প্রেম শব্দটি উচ্চারণ করতে আমার বরাবরই জিভে জড়তা ছিল, শব্দটি উচ্চারণে এক অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আছে। সে নিষেধ নর নারীর প্রেমের বেলায় কেবল। কারণ এ রকমই শুনেছি প্রেমে পড়ে মন্দ লোকে, ঝুনু খালাকে দেখেছি লুকিয়ে প্রেম করতে। দাদাও লুকিয়ে কবিতা লিখতেন অনিতার জন্য। ঝুনু খালার সঙ্গে রাসু খালুর ইয়ে ছিল, দাদা বলেন। ইস্কুলে মেয়েরাও প্রেম শব্দটি উচ্চারণ করে না, বলে ওই মেয়ের সঙ্গে ওই ছেলেটির ইয়ে আছে। ইয়ে শব্দটির মানে বুঝতে প্রথম প্রথম আমার অসুবিধে হত। পরে বুঝে, নিজেও, ইয়ে বলতে অভ্যেস করেছি। এটিই, লক্ষ করেছি, বাড়ি এবং বাড়ির বাইরে, যেখানে আমার এবং আমার পরিচিতদের চলাচল, চলে। আল্লাহর সঙ্গে পীরসাবের ইয়ে আছে, এ ধরনের বাক্য আমি শুনিনি পীর বাড়িতে। আল্লাহর প্রসঙ্গে প্রেম শব্দটি অবাধে উচ্চারণ করা হয়। হুমায়রার সঙ্গে আতিক নামে ওর এক ফুফাতো ভাইয়ের প্রেম চলছে না বলে, শুনেছি বলা হয়, ইয়ে চলছে, তাও বলা হয় ফিসফিসিয়ে, কেউ যেন না শোনে, কিন্তু কারও কোনও অস্বস্তি হয় না বলতে যে হুমায়রা আল্লাহর প্রেমে মগ্ন, সেটি সজোরেই বলা হয়, যেন একশ লোকে শোনে।
মা বলেন–আল্লাহরে যায়।
— তুমি ত বলছ, আল্লাহ সব লিইখা রাখছেন খাতায়, প্রত্যেকটা মানুষের জন্ম মৃত্যু, কার সাথে কার কখন বিয়া হবে তাও। এমন কি কে বেহেসতে যাইব, কে দোযখে যাইব তাও লেখা আছে। তা যদি লেখাই থাকে, ধর আবু বকর, তার যদি বেহেসত আল্লাহ লিইখাই রাখেন, তাইলে কি সে গুনাহ করলেও বেহেস্তে যাইব! আর ধর আমিই, আমার জন্য যদি আল্লাহ আগে থেইকাই দোযখ লেইখা রাখেন, তাইলে আমারই বা কি লাভ আল্লাহরে ডাইকা! আল্লাহ কি পরে তাইলে নিজের লেখা সংশোধন করেন! এক দমে বলে আমি থামি।
— এমনে ত বোবা হইয়া থাকস মানষের সামনে। আমার সামনেই তর খই ফুডে মুহে। মা রুষ্ট-স্বরে বলেন।
— আল্লাহ ত সব পারেন করতে, ঠিক না! কণ্ঠে প্রচন্ড কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করি।
মা বলেন–হ। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, সবই হয়। আল্লাহ হও বললে হয়। আল্লাহ হও না বললে কারও শক্তি নাই কিছু হওয়াইতে। আল্লাহর আদেশ ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না।
মা’র সারা শরীর কালো বোরখায় ঢাকা, কপাল থেকে নেমে এসেছে পাতলা কালো কাপড়, যেন হাঁটতে গিয়ে সামনে কোনও গর্ত পড়লে পা ফেলার আগে অন্তত দেখেন। পাতলা আবরণটির দিকে, যার তলে মা’র চোখ থেকে হলকা বেরোচ্ছে আগুনের, তাকিয়ে বলি–ধর, কিছু নাই, খালি হাত, আল্লাহ কি কিছু নাই থাইকা ফুল বানাইতে পারেন!
— হ। মা বলেন।
— ধর, আল্লাহর হাতে একখান রুমাল। রুমালের মধ্য থেইকা আল্লাহ কি একটা কবুতর বানাইতে পারবেন! আবারও প্রশ্ন করি।
মা নিশ্চিত স্বরে বলেন–হ।
— আমগোর ইস্কুলে যাদু দেখাইতে আইছিল যে লোকটা, সেও পারে। সেও পারে বাতাসে আল্লাহর মত মিলাইয়া থাকতে। আমি ঠোঁট উল্টে বলি।
— কি কইলি তুই! তর ত ঈমান নষ্ট হইয়া গেছে। তুই আল্লাহর সাথে তুলনা করলি যাদুকররে! কত সাহস তর! পাজি ছেড়ি, পাজ্যামি করস। আমি কি আশায় লইয়া যাই তরে হুজুরের কথাবার্তা শুনতে! দিন দিন আস্তা শয়তান হইতাছস। এইসব তর বাপের কাছে শিখছস! তর ঠোঁট আমি সিলাই কইরা দিয়াম, আরেকবার এইসব কইলে। মা’র রুখে ওঠায় আমি দমে যাই।
