আরও কিছু মেয়ে হুড়মুড়িয়ে জানালায় ভিড় করে, এরা সাতজনের অংশ। সবাই মহাম্মদদের দেখে। এত ছেলের নাম মহাম্মদ কেন, মনে প্রশ্ন জাগে। প্রশ্নটি তেঁতুলের কালো বিচির মত গলায় আটকে থাকে। একটিই কেবল জানালা এ ঘরে, তাও পুরোনো ঘর বলে এটি। নতুন ঘরগুলোয় জানালা হবার নিয়ম নেই। নতুন ঘর থেকে মেয়েদের কোনও মহাম্মদকে দেখার সুযোগ নেই।
ফজলিখালার এক ছেলের নামও মহাম্মদ, এটিই প্রথম ছেলে, মহাম্মদের আগে জন্মেছে হুমায়রা, সুফায়রা, মুবাশ্বেরা। তিন মেয়ে হওয়ার পর ফজলিখালাকে ঘন ঘন জ্বিনে ধরত। মুবাশ্বেরার পর মহাম্মদ জন্মানোর পর জিনে ধরা কমেছিল। মহাম্মদের পর এক এক করে আরও তিনটে মেয়ে জন্মেছে, জিনে ধরা বেড়ে গেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। হুমায়রাকে শুনেছি ক’দিন আগে জিনে ধরেছে। তিনদিন তিনরাত পর জিন ছেড়েছে ওকে। এ বাড়িতে এমনই, আজ এ মেয়েকে, কাল ও মেয়েকে জিনে ধরছে, আর ঘর অন্ধকার করে, দরজা জানালা বন্ধ করে পীরসাব নিজে জিন তাড়ান। আমি নিজে দেখেছিলাম যূথির জিন তাড়ানো। যূথি আমার এক ক্লাস ওপরে পড়ত। মেয়েটি চমৎকার দেখতে ছিল। ইস্কুলের বট গাছের নিচে একা একা বসে ও গান গাইছিল একদিন, ঘন্টা পড়লে মেয়েরা ক্লাসে চলে গেল সব, যূথি গানই গাইছিল, পরের ক্লাসের ঘন্টাও পড়ল, যূথি তখনও গান গাইছে একা একা, চুল হাওয়ায় উড়ছে। খবর পেয়ে এক মৌলভি ছিলেন, উর্দু পরাতেন আমাদের, আমরা উর্দু স্যার বলে ডাকতাম, যূথিকে বটতলা থেকে টেনে এনে মাস্টারদের জানালেন যে ওকে জিনে ধরেছে। যূথি গলা ছেড়ে চিল্লাচ্ছিষ আমারে ছাইড়া দেন ছাইড়া দেন বলে। ওকে শক্ত মুঠোয় ধরে উর্দু স্যার জিন তাড়ানোর আয়োজন করলেন। পাক পানিতে আল হামদু সুরা, আয়াতুল কুরসি, আর সুরা জিনের প্রথম পাঁচ আয়াত পড়ে পানি ছিটোলেন যূথির মুখে, আর মুখের সামনে আগুন ধরে নিমের ডাল দিয়ে পেটালেন। পেটালেন যূথি মুখ থুবড়ে পড়া অবদি। যূথির জিন তাড়ানো দেখেছিলাম দু’চোখে জগতের সকল বিস্ময় নিয়ে, ইস্কুলের আর সব মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে। ওর জন্য বড় মায়া হচ্ছিল আমার।
উত্তরের ঘরে বসে আমার অস্থির লাগে, গা ছমছম করে। এ বাড়িতে, ভয় হয় আবার আমাকেও না জ্বিনে ধরে। আমাকেও না অন্ধকার ঘরে জিন তাড়াতে হাতে ছড়ি নিয়ে ঢোকেন পীর আমিরুল্লাহ।
আমি যখন কুঁকড়ে আছি ভয়ে, মেয়েরা ততক্ষণে জানালা থেকে সরে গেছে, মা এসে দ্রুত বলে যান, মজলিশ শেষ করে তিনি বাড়ি ফিরবেন। মজলিশের অভিজ্ঞতা আমার কিঞ্চিত আছে, এটি আমাকে মোটেও উৎফুল্ল করে না। মজলিশ বসে বড় এক ঘরে, অন্দরমহল থেকে মেয়েরা সরাসরি ঢুকে যেতে পারে মেয়েদের জন্য পর্দা ঢাকা জায়গায়। মেঝেয় ফরাস পাতা, ওতেই হাঁটু মুড়ে বসতে হয় সবাইকে। সামনে উচু চৌকিতে গদি পাতা, ওখানে বসেন পীরসাব। লোবানের গন্ধঅলা মজলিশ-ঘরে যখন ঢোকেন তিনি, ডানহাতখানা উঁচু করে, গম্ভীর মুখে। সকলে দাঁড়িয়ে বলেন আসসালামু আলায়কুম ইয়া রহমতুল্লাহ। শব্দে গমগম করে ঘর। পীর সাব ভারি গলায়–ওয়ালায়কুম আসসালাম বলে হাত নেড়ে বান্দাদের বসতে ইঙ্গিত করেন। মেয়েদের গা থেকে পাউডারের গন্ধ বেরোতে থাকে, চোখে সুরমা পরা মেয়েরা, পর্দা ফাঁক করে হুজুরকে দেখেন, আড়চোখে দেখেন বাকি পুরুষদের।
হুজুর দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন বুঝলেন কি না আবু বকর, এই দুনিয়া মিছে দুনিয়া। এই দুনিয়ায় টাকা কড়ি করে কী লাভ, কেউ কি সঙ্গে নিয়ে যাবে কিছু! বলুন, কেউ সঙ্গে নেবে কিছু কবরে!
আবু বকর, কালো মুখে কালো দাঁড়ি বেটে এক লোক, সামনের সারিতে বসা, উত্তর দেন–জী না হুজুর।
— তো আল্লাহর প্রেমে নিজেকে সমপ্পন কব্বেন নাকি ধন দৌলতের প্রেমে! হুজুর প্রশ্নটি আবু বকরকে করেন, কিন্তু দৃষ্টি ছুঁড়ে দেন মজলিশের শাদা মাথাগুলোয়।
— আল্লাহর প্রেমে হুজুর। ঘোর লাগা গলায় বলেন আবু বকর।
মেয়েরা পর্দার আড়াল থেকে আবু বকর লোকটিকে পলকহীন দেখে। সে দিনের জন্য আবু বকরের নাম মুখে মুখে ফিরবে। ্হুজুর যেচে কথা বলেছেন তাঁর সঙ্গে। এ কম সম্মান নয় আবু বকরের! কেউ কেউ এও মন্তব্য করবে আবু বকরের ভাগ্য ভাল, হুজুর তাঁর বেহেসত নসীবের জন্য আল্লাহর কাছে তদবির করবেন।
মজলিশের সময় ঘড়ি ধরে এক ঘন্টা। আজকের ঘন্টা তিনি পার করেছেন নবীজির দারিদ্রের বর্ণনায়, ছেঁড়া একটি কম্বল সম্বল ছিল তাঁর। নবীজির দুঃখে মজলিশের লোকেরা হাউমাউ করে কেঁদেছেন। যে যত কাঁদতে পারে, তার সুনাম বাড়ে এ বাড়িতে। সুনাম অবশ্য স্বপ্ন দেখলেও বাড়ে। ফজলিখালা স্বপ্ন দেখেছেন তিনি নবীজির সঙ্গে এক চমৎকার ফোয়ারার ধারে বসে কথা বলছেন, শাদা শাদা পাখি উড়ছে, বাতাস বইছে ঝিরিঝিরি, কী কথা বলছেন তা খেয়াল করতে যদিও পারেননি, হুজুর বলেছেন ফজলিখালার বেহেসত নিশ্চিত। পীরবাড়িতে ফজলিখালার মূল্য অনেকখানি বেড়ে গেছে এরপর, অনেকে আলাদা করে জানতে চেয়েছে ফোয়ারার পাশে বসা নবীজিকে ঠিক কেমন দেখতে লাগছিল, কেমন তাঁর চেহারা। মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে স্বপ্নের বর্ণনাটি যখন তিনি দেন, কী যে নূর তাঁর মুখে, কী যে অপূর্ব সুন্দর তিনি, কী যে আশ্চর্য সুন্দর কোমল তাঁর হাত! ফজলিখালা যখন বলেন চোখ ধীরে ধীরে মুদে আসে যেন তিনি এখনও সে হাতের স্পর্শ পাচ্ছেন। হাত ধরে দু’জন ফোয়ারার দিকে গিয়েছেন গোসল করতে, গোসল করছেন, ঘুম ভেঙে গেল। ফজলিখালার এই স্বপ্নের কথা শোনার পর এ বাড়ির অনেকেই নবীজিকে স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। তাঁদেরও সুনাম হল। মা বড় আক্ষেপ করেন কখনও তিনি নবীজিকে স্বপ্ন দেখেননি বলে। ঘুমোনোর আগে খুব করে নবীজিকে ভেবে ঘুমোন, যেন স্বপ্নে তাঁর সাক্ষাৎ পান। পাননি। নিজেকে বড় গুনাহগার মনে হয় মা’র।
