মেয়েদের মুখে আতঙ্ক, যেন আজ বাদে কালই কেয়ামত আসছে।
আমার ভেতরেও একটু একটু করে কেয়ামতের ভয় ঢোকে। তাহলে বাবা যে ইচ্ছে করছেন আমাকে লেখাপড়া করে বড় হতে! বড় হওয়ার আগেই তো কেয়ামত চলে আসবে! পৃথিবী ধ্বংস হয়ে ঢুকে যাবে পৃথিবীর পেটে। বিচার হবে হাশরের ময়দানে, যেখানে আল্লাহ নিজে বসবেন দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নেক মাপতে।
বুক ঢিপঢিপ করে। সামনে দাঁড়ালে নিশ্চয় আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, নিয়মিত নামাজ রোজা করেছি কি না, তসবিহ জপেছি কি না, কোরান পড়েছি কি না! আল্লাহর আদেশ মত চলেছি কি না। উত্তর কি দেব! যদি বলি হ্যাঁ সব করেছি, তাহলে নির্ঘাত ধরা পড়ে যাব। কারণ আল্লাহ তো লিখেই রেখেছেন সবার ভবিষ্যত। ভবিষ্যত যদি সব লেখাই থাকে, তবে ময়দানে আবার দুনিয়ায় কি করেছি না করেছি খামোকা জিজ্ঞেস করার কি মানে হয়! আমার কেন জানি না বিশ্বাস হয় হাশরের মাঠে, দুনিয়ার সব লোক জড়ো হবে যে মাঠে, যে মাঠের কথা ভাবলে কেবল ঢাকায় বড় মামার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে লালমাটিয়ার যে মাঠ দেখেছিলাম, সে মাঠের ছবি মনে ভাসে–সেটির পুলসেরাত, আমার বিশ্বাস, যাদুকর লোকটি হাওয়া হয়ে গিয়ে নির্বিঘ্নে পার হয়ে যেতে পারবেন। ইস্কুলে যাদু দেখাতে এসে যেমন করে কালো কাপড়ের মধ্য থেকে নেই হয়ে গিয়েছিলেন হঠাৎ!
আমি বিভোর ছিলাম যাদুকরের পুলসেরাত পার হওয়ার দৃশ্যতে। চোখের সামনে আর কিছু নেই, কেবল একটি সুতো। সুতোর ওপর হাঁটতে গিয়ে টলমল করছে আমার পা। কিন্তু দিব্যি হেঁটে যাচ্ছেন, এক চুল নড়ছে না যাদুকরের শরীর। যাদুকর লোকটি হিন্দু, নাম সমীর চন্দ্র। কোনও হিন্দু লোক যদি পুলসেরাত পার হতে পারে, তবে আল্লাহ তাকে পাঠাবেন কোথায়, যেহেতু সে হিন্দু, দোযখে, নাকি বেহেসতে যেহেতু সে পুলসেরাত পার হয়েছে! আমি বিচারক হলে, ভাবি, বেহেসতেই পাঠাতাম। কিন্তু শুনেছি কেউ যদি হিন্দু হয়, সে যা কিছুই পার হোক, নেকের বোঝা তার যত ভারি হোক না কেন, দোযখেই যেতে হবে তাকে, কারণ তার জন্য দোযখ লিখে রেখেছেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। আগে থেকেই লিখে রাখার ব্যাপারটি আমার মোটেও মনে ধরে না। লেখালেখির ব্যবস্থা থাকলে আর বিচারের আয়োজন করা কেন! হাশরের ময়দানে যা হবে, তা নেহাত নাটক ছাড়া আর কিছু নয়। আর সেই নাটকের শরিক হওয়ার জন্য সে কি ভীষণ উত্তেজিত মানুষ!
লক্ষ করি নি, কি কারণে এক এক করে মেয়েরা উত্তরের ঘর খালি করে হুজুরের ঘরের দিকে চলে গেল, হুমায়রাও। আমি একা বসে অপেক্ষা করতে থাকি মা’র জন্য। কখন মা’র এ বাড়ির কাজ ফুরোবে আমার পক্ষে সম্ভব নয় অনুমান করা। এর আগে যতবার এসেছি বিকেলে ফিরবেন বলে সন্ধে আর সন্ধেয় ফিরবেন বললে রীতিমত রাত করেছেন। কখনও আবার এমন হয়েছে যে ফিরতে দেরি হবে বললেন, কিন্তু কি রহস্যজনক কারণে বোরখা পরে নিয়ে তাড়া লাগিয়েছেন চল শিগরি চল। আমি উত্তরের ঘরে একা বসে আছি, মা’র সেদিকে মন নেই। তিনি ছুটে ছুটে এর ওর সঙ্গে কানাকানি করছেন। কানাকানি কথা, সে যারই হোক, বড় শুনতে ইচ্ছে করে। কানাকানি শেষ হলে আমি অনুমান করি তিনি হুজুরকে বাতাস করবেন, হুজুরের পা টিপবেন, শরবত বানিয়ে দেবেন, পান সেজে দেবেন, চিলুমচি ধরবেন মুখের সামনে। চিলমচি থেকে তুলে হুজুরের কফ থুতু খেয়ে বা মুখে মাথায় ডলে মা’র এ বাড়ির কাজ আপাতত ফুরোবে।
মা যার সঙ্গে কানে কানে কথা বলছিলেন তার মুখ খানা আমি চেষ্টা করছিলাম দেখতে, কলসির তলার মত দেখতে এক নিতম্ব ছাড়া আর কিছু সম্ভব হচ্ছিল না দেখা । হঠাৎ, আমার গায়ের ওপর দিয়ে ঝড়ো বাতাসের মত দৌড়ে গেল দুটো মেয়ে জানালার দিকে। তারা, আমার মনে হয় না খেয়াল করেছে যে আমি, একটি প্রাণী বসে আছি ঘরে। এ দুটো আগের সাতজনে ছিল না। আনকোরা, অন্তত আমার চোখে। গায়ের পোশাক আগের সাতজনের মতই। মাথা থেকে পা অবদি ঢাকা। জানালায় দাঁড়িয়ে দুটো মেয়ের কে বলছে আমি ধরতে পারি না, যে, দেখ দেখ ওই হইল মহাম্মদ, ফাতেমা আপার ছেলে।
আরেকটি কণ্ঠ, আমি এও অনুমান করতে পারি না, ডান বা বামের জনের, এই যে ঘাড়ে হাত দিল, সে হাজেরাখালার ছেলে, মহাম্মদ।
দুূ’টো মেয়ের পশ্চাতদেশ ছাড়া আর কিছু নেই চোখের সামনে।
আমাকে ডিঙিয়ে আরও ক’টি মেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল জানালায়। আরও পশ্চাতদেশ। জানালা থেকে দেখা যাচ্ছে বাহিরবাড়ির আঙিনা। আঙিনায় পুরুষেরা যারা মজলিশে শরিক হবে, পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। অন্দরমহলে কেবল মেয়েরা ছাড়া আছে হাতে গোণা কিছু ছেলের প্রবেশাধিকার আছে। হাতে গোনাদের মধ্যে বেশির ভাগই হুজুরের আত্মীয়। আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকারা হাতে গোণা নয়।
— আর ওই যে মহাম্মদ, নুরুননবী ভায়ের ছেলে। নতুন একটি কণ্ঠস্বর।
মেয়েরা হাসছে। হাসতে হাসতে, মুখে ওড়না চেপে কারও ঘাড়ের ওপর দিয়ে, বগলের তল দিয়ে, দু’মাথার ষিনকোণ দিয়ে, গলার ফাঁক দিয়ে, দেখছে। সামনের মেয়েরা পেছনের মেয়েদের জন্য জায়গা ছাড়ছে না, পেছনের মেয়েগুলো মাছের মত পিছলে সামনে যেতে চাইছে। পেছনের পেছনের মেয়েরা বলছে, এইবার সর, দেখলা তো! আমাদেরে দেখতে দেও। আমি পেছনের পেছনের পেছনে দাঁড়িয়ে এক পলক দেখি, কিছু যুবক শাদা পাজামা পাঞ্জাবি আর টুপি মাথায় দাঁড়িয়ে আছে, কারও কোমরে হাত, কারও ঘাড়ে, কেউ পাছা চুলকোচ্ছে, কেউ হাই তুলছে, কেউ অযু করছে, কেউ মশা তাড়াচ্ছে গা থেকে। এত দেখার কি আছে এসব, আমি ঠিক বুঝে পাই না।
