আমার মগ্নতা ভাঙে হুমায়রার গুঁতোয়–দেখ এদের বাবা এদেরকে, সাতজনকে থুতনি তুলে দেখিয়ে বলে সে, আল্লাহর পথে দিয়ে গেছে। এরা এইখানেই থাকে। কোরান হাদিস শেখে।
হুমায়রা আবারও অতি দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে–খালুকে নছিহত করলে তিনি নিশ্চয় আল্লাহর পথে আসতেন। ছেলেমেয়েদেরও আল্লাহর পথে দিতেন।
বাবাকে করলে কাজ হত কি না আমার সংশয় আছে, তবে জজ সাহেবকে নছিহত করে কাজ হয়েছিল। জজ তাঁর ষোল বছরের মেয়ে মুনাজ্জেবাকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে গেছেন, লম্বা মেয়েটি, হুমায়রা বলে, মুনাজ্জেবা, জজের মেয়ে। কোথাকার জজ? ঢাকার। ঢাকা শব্দটি এমন স্বরে হুমায়রা উচ্চারণ করে যে ঢাকার জজ মানে বুঝতে হবে বড় জজ। ঘটনাটি এরকম ছিল, ষোল বছরের মেয়ে লেখাপড়ায় ভাল হলেও গোল্লায় যেতে শুরু করে, বখাটে এক ছেলের সঙ্গে প্রেম করে। জজ সাহেবের মেয়েকে নাকি পাড়ার মাঠে বখাটেটির সঙ্গে অন্ধকারে শুয়ে থাকতে দেখেছে কারা। পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে গেল। মেয়েকে ইস্কুল বন্ধ করে বাড়িতে বসিয়ে রাখলেন জজ সাহেব। তখন কেউ একজন তাঁকে বললেন আমিরুল্লাহ পীরের নাম, তিনি মেয়েদের বাড়িতে রেখে কোরান হাদিস শেখান, মেয়েরা নামাজি হয়, ঈমানদার হয়, অন্দরমহলের বাইরে পা দেওয়া নিষেধ তাদের, কঠোর পর্দার মধ্যে তাদের জীবন যাপন করতে হয়। শুনে ঢাকার জজ একবার মজলিশ শুনতে আসেন পীরের বাড়ি। পীরের ব্যাবহারে তাঁর মন গলে। তিনি তাঁর উচ্ছন্নে যাওয়া মেয়েকে হুজুরের হাতে সঁপে দিয়ে যান ক’দিন পরেই। রুবিনা পাল্টে পীরসাব মেয়ের নাম দিয়েছেন মুনাজ্জেবা। মুনাজ্জেবা লম্বা লম্বা জামা গায়ে মাথায় ওড়না জড়িয়ে পর্দা পুশিদা মত অন্দরমহলে থাকে, কোরান হাদিস পড়ে, মজলিশে হুজুরের দোযখের বর্ণনা শুনে কেঁদে বুক ভাসায়, হুজুরের গা হাত পা টেপে। সেই থেকে শুরু এ বাড়িতে বড় বড় ঘরের মেয়ে আসার, পুলিশের মেয়ে, উকিলের মেয়ে, সরকারি কর্তাদের মেয়ে। হযরত ইব্রাহিম আল্লাহর হুকুম মত নিজের ছেলেকে কোরবানি দিয়েছিলেন, আর আজকালকার বাবারা কেন পারবেন না নিজের মেয়েকে আল্লাহর পথে দিতে! হুমায়রা ভাবে। এ বাড়িতে মেয়েদের আল্লাহর প্রেমে দিওয়ানা হতে বলা হয়, মেয়েরা হয়। নিরাকার আল্লাহর সঙ্গে মেয়েদের প্রেম ভীষণ জমে ওঠে এ বাড়িতে আসা মাত্র। পীর আমিরুল্লাহ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন দেখে, তাঁর মনে হয় এরা মুনাজ্জেবা নাজিয়া নাসিমা নয়, এরা শ্রেফ বেহেসতের বাগানের ফুল।
আমিরুল্লাহ পীর জঙ্গল সাফ করা আঙিনায় ঘর তুলে দেন মেয়েদের। কারও ঘরে টিনের চাল, কারও ঘরে সিমেন্টের। ঘরগুলোয় জানালা নেই, গরমে হাঁসফাঁস করে মেয়েরা। পীরসাব বলেছেন–আরবে এইরকম ঘর ছিল, যে ঘরে আমাদের নবী জীবন যাপন করতেন। এরকম ঘরে থাকলে সওয়াব হয়। নবীজি যে কষ্ট করেছেন, সে কষ্ট যদি তোমরা করতে পার, তবে নবীজি নিজে তোমাদের জন্য হাশরের ময়দানে সাক্ষী দেবেন।
মেয়েরা আবেগমথিত কণ্ঠে বলে আহা আহা। তাদের জানালার দরকার নেই। দরজাও, যদি এমন হত যে নবীজির ঘর ছিল না, তবে সেটিও ত্যাগ করতে সম্ভবত ওরা আপত্তি করত না।
দু’তিন বছর পার হলে বাবারা ফেরত নিতে আসেন ঈমানদার মেয়েদের। মেয়েরা ঘাড় শক্ত করে বলেন–যাব না। মুনাজ্জেবার বাবা শয্যাশায়ী বলে তার মা এসেছিলেন নিতে। মুনাজ্জেবা যায়নি। কলুষিত দুনিয়ায় তার আর ফেরার ইচ্ছে নেই। এ বাড়ির আঙিনা থেকে বেরোলেই তার বিশ্বাস গায়ে তার পাপের ফোসকা পড়বে।
কেবল মুনাজ্জেবা নয়, অন্যরাও, বিয়ের বয়স হলে বাবারা পাত্র ঠিক ক’রে যখন নিতে আসেন, ওরা যেতে রাজি হয় না। সাফ সাফ জানিয়ে দেয়, ওরা আল্লাহর পথে থাকবে। এই শেষ জমানায় বিয়ে করা উচিত নয়, হুজুর বলেছেন। ওরা তাই অনুচিত কোনও কাজে আকৃষ্ট হয় না। বাবাদের ফিরে যেতে হয় মেয়েরা পীরবাড়ির পবিত্র মাটি কামড়ে রাখে বলে।
বিয়ে করা উচিত নয় কেন, প্রশ্ন জাগে মনে। উত্তর ওদের জিভের ডগায়, হুজুর মোরাকাবায় বসে কথা বলেছেন আল্লাহতায়ালার সঙ্গে। বেহেসতের বাগানে হাঁটতে হাঁটতে দু’জনের কথা হয়। মুনাজ্জেবা চোখ বুজে বেহেসতের বাগানে পাখি হয়ে ওড়েন। আল্লাহ নিজমুখে হুজুরকে বলেছেন–শেষ জমানা শুরু হয়ে গেছে। ইসরাফিলের শিঙ্গা ফুকার সময় হয়ে গেছে। কেয়ামত খুব সামনে। শেষ জমানায় সমাজ সংসার সব বাদ দাও, সময় নেই, তাড়াতাড়ি আখেরাতের সম্বল কর।
মেয়েদের বিশ্বাস, হুজুর নিজে ওদের পুলসেরাত পার করে দেবেন। হুজুর বলেছেন তিনি তাঁর প্রিয় মুরিদদের হাত ধরে বেহেসতে যাবেন, তাদের না নিয়ে তিনি বেহেসতের দরজায় ঢুকবেন না। মেয়েরা তাই শেষ জমানায় আর হুজুরের চোখের আড়াল হতে চায় না। হুজুর বলেছেন, মুরিদদের নিয়ে শীঘ্র তিনি মক্কা চলে যাবেন, কেয়ামতের আগ অবদি নবীজির দেশেই থাকার ইচ্ছে তাঁর।
মুনাজ্জেবা বলে, আল্লাহতায়ালা বাহন পাঠাবেন মক্কা যাওয়ার।
বাহন কি রকম, সাত জনের সঙ্গে হুমায়রা গভীর মগ্ন অনুমান করতে, সম্ভবত বোররাখ। আল্লাহতায়ালার বাহনটি সম্পর্কে তাদের এখনও স্পষ্ট ধারণা নেই। কিন্তু যে কোনওদিন যে বাহনটি এসে পৌঁছবে এ বাড়িতে, এ সম্পর্কে কারও কোনও দ্বিধা নেই। লিস্টিও তৈরি হয়ে গেছে কে কোন ব্যাচে যাবে। মুনাজ্জেবার নাম প্রথম ব্যাচে, খোঁজ নিয়ে জেনেছে সে। লিস্টি পীরসাবের বালিশের নিচে।
