চুলের মুঠি ধরে টিউবয়েলের হাতলের ওপর মণির কপাল ঠোকেন মা। কেটে রক্ত ঝরে কপাল থেকে। হাতলের গায়ে লেগে থাকে রক্ত। মণি ফ্যাকাসে চোখে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। সে দিনই মণিকে বিদেয় করে দেওয়া হয়। দুটো ছেঁড়া জামা আর ঈদের সেন্ডেল পুঁটলিতে বেঁধে চোখের জল মুছতে মুছতে মণি মা’কে বলে–আমার বেতনের টেহাটি দেইন খালা।
মা বলেন–কত বড় সাহস তর বেতনের টেহা দাবি করস! তুই আমার বাসন কিইনা দে, ভাঙছস যেইডি। তর বেতনের জমা টেহা দিয়া আমার বাসন কিনতে অইব। দূর অ। দূর অ আমার চোক্কের সামনেথে।
মণি দূর হয় পুঁটলি বগলে করে। দু’বছরে এ বাড়ি থেকে তার অর্জন দুটো ছেঁড়া জামা আর একজোড়া কাল ফিতের সেন্ডেল। মণি তার মায়ের কাছে যাবে, মা তাকে অন্য কোনও বাড়িতে কাজে দেবে আবার পাঁচ টাকা মাসে। মণি আবার স্বপ্ন দেখবে। আমি বারান্দার থামে হেলান দিয়ে মণির চলে যাওয়া দেখি। ও মিলিয়ে যেতে থাকে অন্ধকারে। ওকে পেছন ফিরতে দেখি না। ফুলবাহারিও এরকম চলে গিয়েছিল একদিন খোঁড়াতে খোঁড়াতে, পেছন ফেরেনি। সন্ধে থেকে ঝিঁঝিঁ ডাকছে। কুয়াশায় ভিজে যেতে থাকে ঘাস মাটি, ভিজতে থাকি আমি। চোখের পাপড়িগুলোয় শিশির জমে আমার। প্রফুল্লদের বাড়ি থেকে শিউলি ফুলের গন্ধ এসে আমাদের আঙিনা ভরে যায়।
মা দুনিয়া দারি ছেড়ে দিতে চান, কিন্তু হাঁড়ে মজ্জার দুনিয়াদারি তাঁকে ছেড়ে কোথাও যায় না। চিনেমাটির থাল বাটি আর কাচের গ্লাসের জন্য মা এমনই কাতর হন যে মাগরেবের নামাজেও তিনি মন বসাতে পারেন না।
বারান্দায় বসে কুঁ কুঁ করে কাঁদতে থাকে রকেট। মা জায়নামাজে বসে চেঁচান– কুত্তাডারে দূর কর। কুত্তা থাকলে বাড়িত ফেরেসতা আয়ে না।
মিশনারির এক পাদ্রী যুদ্ধের পর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার দিন তাঁর কুকুরটিকে দিয়ে গেছেন ছোটদাকে, ছোটদা গিটার শিখতে যেতেন মিশনারির কাছে এক বাড়িতে, যাওয়ার পথে প্রায়ই দেখতেন বিশাল এক কুকুর পাদ্রীর পেছন পেছন হাঁটছে, ছোটদা কুকরটির দিকে বিস্ময়- চোখে তাকিয়ে থাকতেন। কুকুর বল মুখে নিয়ে দৌড়োত, পাদ্রী হাত বাড়িয়ে দিলে সেও ডান পা তুলে দিয়ে হ্যান্ডশেক করত। সেই কুকুর আমাদের বাড়ি আসার পর হৈ চৈ পড়ে গেল। রকেট বলে ডাকলেই কুকুর রকেটের মত দৌড়ে আসে। হাত বাড়ালে কুকুরও হাত বাড়ায়। বাবা বললেন–বাড়িতে কুকুর একটা দরকার আছে। কুকুর চোর খেদাইব। বাবা কসাইখানা থেকে সস্তায় হাড়গোড়অলা একধরনের মাংস কিনে আনেন রকেটের জন্য, জলে সেদ্ধ করে ওগুলো ওকে দেওয়া হয় খেতে। রকেটের আবার বাজে অভ্যেস, ফাঁক পেলেই ঘরের সোফায় গিয়ে শোয়। বিছানায় কাদা পায়ে ওঠে। নানিবাড়িতেও কুকুর দেখেছি, ঠিকানাহীন কুকুর, রাস্তায় ঘুরত, ক্ষিধে পেলে আজ এ বাড়ি কাল ও বাড়ি গিয়ে বিরস মুখে বসে থাকত, ফেলে দেওয়া এঁটোকাঁটা লেজ নেড়ে নেড়ে খেয়ে গাছের ছায়ায় ঘুমোত। ওসব কুকুর লোকের লাথি খেত, ঢিল খেত, গাল খেত। আর রকেট দেখি মানুষের মত আরাম চায়। গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে লেজ নাড়ে খুশিতে। কিন্তু মা বলে দেন–কুকুর হইল নাপাক জিনিস, নাপাক জিনিসরে দূরে রাখ। ব্যস রকেটের ঘরে আসা বন্ধ, বারান্দায় ঘুমোবে দিনে, রাতে শেকল ছেঁড়ে দেওয়া হবে, চোর তাড়াবে। রকেট চোখের আড়ালে থাকে দিনের বেলা, টিনের ঘরের বারান্দায়, কে যায় ওদিকে! হাবিজাবি জিনিসপত্র থাকে ও ঘরে। সারাদিন এমন হয় রকেটের ফুটো টিনের থালা খালি পড়ে থাকে। মা ভুলে যান রকেটকে খাবার দিতে। রাতে কুঁ কুঁ শব্দে কাঁদে রকেট।
ইস্কুল থেকে ফিরে আমি প্রায়ই জিজ্ঞেস করি–রকেটরে খাওয়া দিছ?
মা বলেন–দিছি।
— কহন দিছ? মনে হয় ক্ষিদা লাগছে রকেটের, আবার দেও।
আমার নাপতানিতে মা রাগেন।–তর এত খোঁজ লওয়া লাগব না কহন দিছি। কুত্তা কহন কি খাইব না খাইব তা আমি বুঝবাম।
রকেটের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মন বলে রকেট খায়নি। আধপেট খেয়ে আমার থালের খাবার মা’কে লুকিয়ে রকেটের ফুটো টিনের থালে ঢেলে দিই, রকেট লেজ নেড়ে মুখ ডুবিয়ে খায়। মুহূর্তে খেয়ে শেষ করে আরও খাওয়ার আশায় লেজ নাড়তে থাকে।
বাবাও হঠাৎ হঠাৎ বলেন–কুকুরটা শুকাইয়া যাইতাছে। ওরে খাওয়া দেও না নাকি! মা বাবার ওপরও রাগেন। দাঁতে দাঁত ঘসে বলেন–খাওয়া আমি দিতাছি। খাওয়ার উপরে খাইলে কুত্তার শইলের লুম পইড়া যাইব। অত দরদ থাকলে নিজে রাইন্দা খাওয়াইও।
রকেট শুকিয়ে যেতে থাকে। পেট মিশে যেতে থাকে পিঠের সঙ্গে। রকেট আবার নিজে শেকল খুলে বেরিয়ে আসতে শিখেছে, বেরিয়ে কালো ফটক খোলা পেলে সোজা চলে যায় রাস্তার ময়লা খুঁটে খেতে। রাস্তার কুকুর দল বেঁধে রকেটকে কামড়ায়। এক পাল নেড়ি কুত্তা আর একা এলসেসিয়ান। এলসেসিয়ান হেরে যায়। রকেটের গায়ে ঘাঁ হতে থাকে। মা বলেন–কুত্তার অসুখ হইছে। ভাত খাইলে বমি করে। কুত্তারে আর ভাত দেওয়া ঠিক না।
ছোটদা তাঁর গিটারে সুর তোলেন, শিস দিতে দিতে রাস্তায় হাঁটেন, পাশের বাড়ির ডলি পাল শিস শুনে তাদের জানালায় এসে দাঁড়ায়। বন্ধুরা বাড়িতে আসে আড্ডা দিতে, আড্ডা দিয়ে চুলে টেরি কেটে বন্ধুদের সঙ্গে ছোটদা বেরিয়ে যান বাইরে। রকেটের খবর নেওয়া আর তাঁর হয়ে ওঠে না।
কুত্তা থাকলে বাড়িত ফেরেসতা আয়ে না, মা’র চিৎকার আমাকে এতটুকু নড়ায় না। যেমন আমি দাঁিড়য়েছিলাম, তেমন থাকি। যেন আমি শুনিনি মা কি বলছেন। যেন এ বাড়িতে ফেরেসতা আসুক না আসুক আমার কিছু যায় আসে না। যেন আমি ঝিঁঝির ডাক শুনছি খুব মন দিয়ে। গল্পের বই গেলা এক উদাসীন মেয়ে আমি, মা প্রায়ই আক্ষেপ করেন। আমি আজ না হয় সত্যিই উদাসীন। পথ হারিয়ে মণি যদি ফিরে আসে, গোপনে অপেক্ষা করি এক উদাসীন মেয়ে, কুয়াশায় ভিজে।
