বড় শ্বাস ফেলে ডান বাহুতে চোখের পানি মুছে মণি আবার শুরু করে–আমার মা পড়ে আমার চাচাগোর কাছে গেল, মামুগোর কাছে গেল। দূর দূর কইরা বেবাকে খেদাইল মায়েরে। তাগো চুলায় বাত ফুটতাছিল টগবগ কইরা। কি সোন্দর সুবাস, অহনও হেই সুৃবাস নাহো লাইগ্যা রইছে। আমগোরে কেউ একবেলা বাত দেয় নাই। ক্ষিদায় আমি কান্দি, নুনি কান্দো, চিনি কান্দো। মায়ে পুস্কুনি থেইকা শাপলা তুইলা সিদ্ধ কইরা খাইতে দিত। বাত নাই। বাড়ি বাড়ি ঘুইরা মায়ে বাতের মাড় মাইগ্যা আনে। হুগাইয়া আমগোর শইলো হাড্ডি ছাড়া কিছু নাই। খাওন না পাইয়া নুনিডা ব্যারামে পড়ল। শিং মাছের তরহারি দিয়া বাত খাইবার চায়। কেডা দিব! মা আল্লাহর কাছে কত কানল, এক চোখ্যা আল্লাহ ফিইরা চাইল না। নুনিডা মইরা গেল। কব্বরো নুনিডারে মাডি দিবার গিয়া মায়ের যে কী কান্দন। হেষে মা কাম খুঁজল মাইনষের বাড়ি। বিবিসাইবরা ছেড়ি উলা মায়েরে কামো নেয় না। মায়ে হেল্লিগা আমারে আর চিনিরেও কামে দিল। বান্দিগিরিই আছিল আমগোর কপালে। চিনি যেই বাড়িত কাম করত, হেই বাড়ির সাইবের খাইসলত আছিল খারাপ। চিনির বুহো বুলে আত দিত। বিবিসাইব দেইখ্যা চিনিরে খেদাইয়া দিছে। মা কত বাড়িত ঘুরল চিনিরে কামে দিবার। বিবিসাইবরা হেরে রাহে না। ডরায়। কয় আমরা ডাঙ্গর মাইয়া কামে রাহি না। চিনি অহন এক বাড়িত আছে, সাইব বিদেশো থাহে, বিবিসাইব থাহে পুলাপান লইয়া একলা।
মা বলেন–ডাইনদিকে খাজ্যাইতাছে, উহুন পাইবি। খুঁজ।
মণি মা’র মাথার ডানদিকে বিলি দিতে দিতে বলে–মা আমগোর মাতার উহুন মচকা দিয়া আনত। আনহে একটা মচকা কিন্যা লইনযে, উহুন ঝুরঝুরাইয়া পড়ব।
মণির পরনে মলিন এক জামা, জামার তলে ছেঁড়া পাজামা। বছরে দুদিন পায়ে সেন্ডেল পরে, ঈদে। ঈদের পরদিনই তা খুলে রাখতে হয়, পরের ঈদে পরার জন্য। ঈদের দিন গোসল করে জামা সেন্ডেল পরে মণি আমাদের কাছে হাতের তালু পেতে পাউডার চায়। পাউডার পেয়ে খুশিতে সে দৌড়োয় পাকঘরের ভাঙা আয়নার সামনে, মুখ শাদা করে পাউডার মাখতে। ওইটুকুন আনন্দই জোটে তার বছরে। শাদা মুখে লাজুক হেসে বাড়ির বড়দের পায়ে ঈদের সালাম ঠুকে ফিরে যেতে হয় তাকে আবার পাকঘরে, ঈদের দিনের রান্নায় দম ফেলার জো নেই, সারাদিন বড় বড় পাতিলে পোলাও মাংস রান্না চলে। সারাদিন যায় মণির ফুঁকনি ফুঁকে চুলো ধরাতে, থাল বাসন মাজতে। মণির ঈদের জামা সন্ধেবেলাতেই মশলার রঙে, ছাইয়ে, কাদায় মলিন লাগে দেখতে।
— মায়েরে মাইনষে কইছিল, উকুন এনে নখে টকাশ করে ফুটিয়ে মণি বলে একটা বিয়া বইতে। জামাই আবার পলায় যদি, খেদাইয়া দেয় যদি। মায়ে বিয়া বয় নাই। আমার বেতনের টেহা জমলে, আমি মারে লইয়া, চিনিরে লইয়া গেরামো যাইয়াম গা, যাইয়া একখান ঘর তুলবাম, মুগ্গা মুগ্গি কিইনা পালবাম। মুগ্গা মুগ্গি ডিম দিব, বাইচ্চা দিব, হেইতা বাজারো বেচলে আমগো ঠিহই পুষাইব।
মণির চোখে রাজহাঁসের মত সাঁতরায় স্বপ্ন। মাসে পাঁচ টাকা বেতন তার এ বাড়িতে। কখনও সে তার বেতনের টাকা হাতে নিয়ে দেখেনি। মা’র কাছে টাকা জমা আছে। মণির যখন বিয়ে হবে, মা বলেছেন তাকে জমানো টাকা দিয়ে সোনার দুল বানিয়ে দেবেন একজোড়া, নাকের একটি ফুলও।
— শুনার দুল দিয়া কি করাম! বিয়া বইলে আবার জামাইয়ে পুলা না অইলে যদি খেদাইয়া দেয়! আমারে বেতনের টেহাটি দিয়া দেইনযে, যহন যাইয়াম।
মণির চোখের ভেতর রাজহাঁস গ্রীবা উঁচিয়ে। মণির স্বপ্নের ঘরে মা তার দুই মেয়ে চিনি আর মণিকে নিয়ে মাংসের ঝোল মেখে পেট পুরে ধোঁয়া ওঠা ভাত খেয়ে নীল মশারির নিচে নকশি কাঁথা গায়ে ঘুমোয়। এর চেয়ে বড় কোনও স্বপ্ন দেখতে মণি জানে না।
সপ্তা দুই পরে বাড়িতে মা বাবা কেউ নেই, বিকেলে ইস্কুল থেকে ফিরে দেখি পাড়ার মেয়েরাও আসেনি খেলতে, মণি বাসন মাজছে উঠোনে বসে, নারকেলের ছুবলায় ছাই মেখে। আমারও ইচ্ছে করে এলুমিনিয়ামের কালি পড়া বাসনগুলোকে মেজে ধবধবে শাদা বানাতে। মণির হাত থেকে পাতিল টেনে নিয়ে ছাইমাখা ছুবলায় ঘসি। ওর মুখ নীল হয়ে ওঠে আমার কান্ড দেখে, ঢ়োঁক গিলে বলে–খালুজান জানলে আমারে মাইরা ফালাইব আপা। আনহে যাইন। আমারে কাম করতে দেইন।
— কেউ জানব না। তুই কাউরে কইস না। চল তাড়াতাড়ি মাইজা আমরা এক্কা দোক্কা খেলি। আমি বলি।
মণির একটি চোখ খুশিতে নাচে। এক্কা দোক্কা সে হয়ত খেলেছে কখনও, এ বাড়িতে নয়। এ বাড়িতে চাকরানিদের খেলার নিয়ম নেই।
— খেলবাইন আমার সাথে? খালা জানলে আমারে মারব। মণি চারদিক তাকায়, বাড়িতে কেউ নেই জেনেও তাকায়। তার আরেক চোখে দ্বিধা।
— কেউ জানব না। গেট খুলনের শব্দ পাইলে আমরা খেলা বন্ধ কইরা দিয়াম। মণির দ্বিধার চোখটিতে চেয়ে বলি।
উঠোনে দাগ কেটে এক্কা দোক্কা খেলি আমি আর মণি। বড়লোক আর ছোটলোক। মণিকে এত খুশি হতে কখনও দেখিনি আমি। ও ভুলে যাচ্ছিল আমি তার মনিবের মেয়ে। যেন আমরা অনেকদিনের সই, দু’জনই আমরা ছোটলোক, অথবা দু’জনই বড়লোক। হাতে পায়ে ধুলো আমাদের। আমি কিনি এক্কা, তেক্কা, যমুনা, মণি কেনে দোক্কা, চৌকা। খেলা পুরোদমে চলতে থাকে, এমন সময় কালো ফটকে শব্দ, ছিটকে পড়ি দু’জন দু’দিকে। মণি দৌড়োয় পাকঘরে। আমি পায়ে এক্কাদোক্কার দাগ মুছে দৌড়োই ঘরে, সোজা পড়ার টেবিলে। পাকঘর থেকে তড়িঘড়ি কাচের বাসন পত্র নিয়ে মণি দৌড়োয় কলপাড়ে, ধোবার কথা ছিল এসব। কলপারে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে বেচারা, ঝনঝন করে ভেঙে পড়ে কাচের গ্লাস, চিনেমাটির থাল, বাটি কাপ শত টুকরো হয়ে। মা দেখেন তাঁর শখের বাসনের হাল।
