মণিকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর মা দু’দিন ডাল ভাত রাধেঁন, একাই। মেজাজ খচে থাকে মা’র, বাবা বাড়ি ফিরলেই চেঁচান–ছেড়িগুলারে পাকঘরে আইতে দেয় না। অগোর কি বিয়া শাদি অইব না? জামাইরে রাইন্ধা খাওয়াইতে অইব না? বাপের বাড়ি থাইকা সব মেয়েরাই রান্দা শিহে। আর এইগুলান বেডার লাহান চলে।
বাবা কেশে গলা পরিষ্কার করে বলেন–এরা লেখাপড়া করে। পাকঘরে কাম করব ক্যা? কাম করার মানুষ রাখি নাই? আমার মেয়েরা যেন পাকঘরের ধারে কাছে না যায়। লেখাপড়া নষ্ট হইব।
— লেহাপড়া কইরা, মা বলেন, উল্ডাইয়া দিতাছে এহেকটা। বাপ না থাকলে ঘরে, সারাদিন ছেড়িরা খেলে। কামের মানুষ খুজো। আমার একলার পক্ষে রান্ধাবাড়ি সম্ভব না। যে কামের ছেড়িই আয়ে, কাম কাজ শিখ্যা যহন একলাই পারে সব করতে, তহন যায় গা।
মা রান্নাঘরে যাওয়া বন্ধ করে দেন, চুলোয় আগুন ধরে না। কেউ জানে না কে খড়ি চিড়বে, কে মশলা বাটবে, থাল বাসন মাজবে! রান্না করবে! কাপড়চোপড় ধোবে! ঘরদোর ঝারু দেবে! বাবাকে বোঝানো হয় সংসার অচল হয়ে আছে। তিনি ভাত চাইলে বলে দেওয়া হয় কামের মানুষ নাই, কেডা রানব ভাত! এদিকে, মা, বাবা যেন না জানেন, আমাদের খেতে দেন, বাড়িতে ভিখিরি এলে একবেলা খাবার দেবেন চুক্তিতে মশলা বাটিয়ে, থালবাসন ধুইয়ে, ভাত রাঁধিয়ে, আনাজপাতি কাটিয়ে, রাঁধেন।
শেষ অবদি নতুন বাজারের উদ্বাস্তু এক মেয়েকে, শুয়ে ছিল ফুটপাতে, ডেকে তুলে নাম ধাম জিজ্ঞেস করে বাবা নিয়ে আসেন বাড়িতে।
আপাতত, বলেন বাবা, রাখো।
আপাতত হলেও মা পরীক্ষা নিতে বসেন। মা চেয়ারে বসে ভেতর বারান্দায়, মেয়েটি কাঠের থাম ধরে দাঁড়িয়ে। বয়স আট নয় হবে, নাক বেয়ে সর্দি ঝুলছে, ছাতা পড়া গা, চুল রোদে পুড়ে লাল, পরনে একটি ময়লা হাফপ্যান্ট কেবল, একসময় শাদা ছিল বোধহয় এর রং, এখন মেটে রঙের, পুরু কাদা জমে শুকিয়ে আছে পায়ে। ঠ্যাংএর চামড়া খরার মাটির মত ফাটা। মা তেতো গলায় জিজ্ঞেস করেন–কি নাম তর?
— রেনু। মেয়ে নাকের সর্দি টেনে ফিরিয়ে নিয়ে নাকে, বলে।
— কি কি কাম পারস? মা জিজ্ঞেস করেন।
রেনু কথা বলে না। উঠোনের গাছগাছালি দেখে, হাঁস মুরগি দেখে।
মা রেনুর আগামাথায় তীক্ষ্ম চোখ ফেলে আবার জিজ্ঞেস করেন–কুনোদিন কাম করছস কারও বাড়িত?
রেনু মাথা নেড়ে বলে–না।
–তর মা বাপ নাই? ধমকে শুধোন।
–মা আছে। বাপ নাই। রেনু নির্বিকার বলে, যেন বাবা মা থাকা না থাকা বড় কোনও ঘটনা নয়।
মা মিঠে স্বরে জিজ্ঞেস করেন–আরও ভাই বইন আছে?
— নাহ। যায় আসে না ভঙ্গিতে, রেনু।
— মশলা বাটতে পারবি? কাপড় ধুইতে?
রেনু ঘাড় কাত করে, পারবে।
মা নাক কুঁচকে, রেনুর গা থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে বলেই কি না, বলেন–ভাত রানতে পারস?
রেনু আবার ঘাড় কাত করে, পারে।
পরীক্ষায় পাশ হয় রেনুর। রেনু বহাল হয়ে যায়। মা তাকে কলতলায় পাঠান সাবান মেখে, গায়ের ময়লা তুলে গোসল করতে। গোসল সারলে হাতের তালুতে তেল ঢেলে দেন চুলে মাখার। আমার পুরোনো একখানা জামা পরতে দিয়ে বাসি ডাল দিয়ে পান্তা খেতে দেন। খেয়ে রেনুকে ঘর ঝাড়ু দিতে বলেন, ঘর ঝাড়ুর পর মশলা বাটা, ভাত রাঁধা। মা রেনুর কাজ লক্ষ করেন আড়াল থেকে।
বাড়িতে কাজের লোক একটি গেলে আরেকটি আসে। মণি গেলে রেনু আসে। এক ছোটলোক গিয়ে আরেক ছোটলোক। ছোটলোকে শহর ভতি। হাত বাড়ালেই ছোটলোক। আমাদের আরাম আয়েশে কোনও ছেদ পড়ে না।
রেনুর হাতে সংসার তুলে দিয়ে মা পীরবাড়ি যান। মজলিশ শুনে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে বাড়ি ফেরেন। দুনিয়াদারির মা বাপ তুলে গাল দেন, আবার ভাত রাঁধতে গিয়ে জাউ করে ফেললে রেনুর গালে কষে চড় কষান।
মা’র মেজাজ এই ভাল, এই খারাপ। কাজের লোক মা’র মেজাজের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে এ বাড়িতে। মা’র ভালবাসাও হঠাৎ হঠাৎ উপচে পড়ে। রেনুকে কায়দা পড়াতে বসেন রাতে। রেনু আরবি অক্ষরে হাত রেখে পড়ে আলিফ বে তে সে। আমার পুরোনো জামা একটির জায়গায় দুটো চলে যায় রেনুর দখলে।
বড়র পিরিতি বালির বাঁধ
ক্ষণে হাতে দড়ি, ক্ষণে চাঁদ।
এ বাড়িতে রেনুর খাপ খাওয়ানোর আগেই রকেট মরে পড়ে থাকে বারান্দায়। মা বাবাকে খবর পাঠান মেথর ডেকে আনতে, মরা কুত্তাডারে বাইরে ফালাইতে। বাবা তাঁর ওষুধের দোকানের এক কর্মচারি পাঠিয়ে দেন। সে রকেটের গলায় দড়ি বেঁধে টেনে বাড়ির বাইরে নিয়ে যায়। উঠোনের মাটির ওপর দাগ পড়ে য়ায় রকেটের যাওয়ার। আমি দৌড়ে গোসলখানায় যাই, কাঁদতে। এই একটি জায়গা আছে বাড়িতে, নিজেকে লুকোনো যায়। রকেট আর রকেটের মত ছুটে আসবে না ডাকলেই। হাতে বিস্কুট নিয়ে দাঁড়ালে দৌড়ে এসে লাফিয়ে বিস্কুট নেবে না মুখে। আমরা রাস্তায় বেরোলে রকেটও বেরোত, পাড়ার লোকেরা হাঁ হয়ে আমাদের এলসেসিয়ান দেখত। মোড়ে গিয়ে বলতাম রকেট বাড়ি যা, আমাদের বাধ্য খোকা এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে যেত। সেই রকেট না খেতে পেয়ে, অসুখে ভুগে, ছলছল চোখে আমাদের দেখতে দেখতে চুপচাপ মরে গেল। কেউ তাকে পশু হাসপাতালেও একদিন নিয়ে গেল না। আমি এ বাড়ির ঢেঙ্গি ছেড়ি, আমি নাক গলালে গাল শুনতে হয়। তাই নিজের নাক কান ঠোঁট সাধ্যমত গুটিয়ে রেখেছিলাম। রকেট মরে যাওয়ার পর নতুন একটি কুকুরের বাচ্চা নিয়ে এলেন মা নানি বাড়ি থেকে। দেশি কুকুর। ওকে রকেট নামে ডাকার ইচ্ছে ছিল, মা বললেন এর নাম পপি। মা যা বলেন, তাই, পপি। পাবনায় এক কারাপালের কুকুরের নাম পপি ছিল, মা’র শখ তাই পপি রাখার। মা ছাগল পোষে, কবুতর পোষে, মুরগি পোষে, এখন কুকুর। মা তাঁর পপিকে এখন খাওয়ান দাওয়ান। এখন আর তেমন বলেন না কুত্তা নাপাক জিনিস, কুত্তা থাকলে বাড়িত ফেরেসতা আসে না। দেখতে দেখতে পপি মা’র খুব ন্যাওটা হয়ে পড়ে। মা এখন পপির মনিব। মা নিজের পাত থেকে পপির থালে মাংস তুলে দেন। পপিকে খেলা শেখাতে চাই, শেখে না, ছুঁড়ে দেওয়া বল লাফিয়ে মুখে নিতে পারে না। পপি একখানা শাদামাটা চোর তাড়ানো কুকুর হয়ে ওঠে। মা শাদামাটা কুকুরকে আদরযত্ন করেন, রেনুকেও করেন। রেনু মা’র গা টিপে দেয় রাতে। বিলি কেটে দেয় চুলে। মা তাকে আরবি অক্ষর শেখানো শেষ করে বাংলা অক্ষর শেখাতে শুরু করেন। তবু রেনু বিনিয়ে বিনিয়ে ফাঁক পেলেই কাঁদে, তার মা’র জন্য পরান পোড়ে।
