মা’কে আবার সেই আগের মা বলে মনে হবে। স্বামী ছেলেমেয়ের জন্য উতলা, আকুল। যেন ঝড়ে মচকে গেছে মা’র অসংসারি চরিত্র।
কপাল ঠুকে মেঝেয়, যেন সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করছেন মা কালিকে, বলবেন–ওরা যেইখানেই থাক, ওদেরে বাঁচাও আল্লাহ।
ঝড় থামবে আরও পড়ে, আমার মন বলবে এ ঝড় থামাতে মা’র বা আল্লাহ তায়ালার কোনও হাত ছিল না। আমার মন কেন এ কথা বলবে, আমি তার বুঝব না কিছু। আমি হাতড়াব খুঁজতে মনের শরীর, খুঁজে পাব না।
কিন্তু কাল বৈশাখি গেলে, জ্যৈষ্ঠ গেলে, আষাঢ়, শ্রাবণ গেলে, পৌষ মাঘ ফাল্গুন গেলে পাব, চৈত্রে গিয়ে। চৈত্রে গিয়ে মা’র আলমারিতে পাব অনুবাদ কোরানের। পড়ব। কারণ আমার জানার ইচ্ছে ছিল যা পড়ি তার মানে, সুরা ফাতিহা, সুরা নিসা, লাহাব, এখলাসের মানে। আরবির তলে বাংলা, মুখোশের তলে মুখ।
কাঠ ফাটা রোদ বাইরে। সারা পাড়া ঝিমোচ্ছে নিঝুম দুপুরের হাঁটুতে মাথা রেখে। পা ছড়িয়ে রকেট ঘুমোচ্ছে বারান্দায়। গাছগুলোও ঝিমোচ্ছে হাত পা অবশ ফেলে রেখে। মণি ছাদের সিঁড়িতে বেলগাছের ছায়ায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে, বালতির ভেজা কাপড় বালতিতে পড়ে আছে, ছাদের দড়িতে নাড়া হয়নি এখনও। আমার এক হাতে তেঁতুলের গুলি, জিভে চাটছি, আরেক হাতে কোরানের তরজমা। পড়তে পড়তে আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে, চাঁদের নিজস্ব আলো আছে! পৃথিবী স্থির হয়ে আছে, পাহাড়গুলো পৃথিবীকে কিলকের মত আটকে রেখেছে, তাই পৃথিবী কোথাও হেলে পড়ছে না। আমি একবার দু’বার তিনবার পড়ি। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ি। ডান কাতে বাম কাতে মাথা রেখে পড়ি। কিন্তু, পৃথিবী তো স্থির নেই, পৃথিবী ঘুরছে সূর্য্যর চারদিকে।
কোরানে তাহলে ভুল লেখা! নাকি ইস্কুলের বইয়ে যা লেখা, তা ভুল। আমি ধন্দে পড়ি।
মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বলে কিছু নেই তাহলে! পাহাড়ের কারণে কি পৃথিবী হেলে পড়ছে না ডানে বামে! কিন্তু বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছি পৃথিবী চব্বিশ ঘন্টায় একবার নিজের কক্ষপথে ঘোরে। পৃথিবী তো হেলছেই তবে!
কে সত্য! বিজ্ঞান না কোরান?
হাতের তেঁতুল হাতেই থাকে। আমি থ হয়ে বসে থাকি মেঝেয় পা ছড়িয়ে, হাঁটুর ওপর খোলা পড়ে থাকে বই। বাইরের লু হাওয়া এসে জানালার নীল পর্দাগুলো ওড়ায়, চুল ওড়ায়, বইয়ের পাতা ওড়ায়।
আমার মনও ওড়ে। উড়তে উড়তে যত দূরে যায় তত তার আকার বাড়ে আর নিজের অস্তিত্বটি হতে থাকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র। আমি পড়ে থাকি একটি বিন্দুর মত একা, অসহায়, নিষ্পন্দ। ঘুঘুর ডাকে আবার সজাগ হই, চোখের তারা নড়ে। নড়ে নড়ে দেখতে থাকি পুরুষের পাঁজরের একটি হাড় থেকে বানানো হয়েছে তার সঙ্গিনী। মেয়েদের ঘাড়ের একটি হাড় বাঁকা, তাই তারা সিধে কথা বলে না, সিধে পথে চলে না। মেয়েরা হচ্ছে শস্যক্ষেত্র, পুরুষেরা যেমন ইচ্ছে গমন করবে, মেয়েরা স্বামীর অবাধ্য হলে স্বামী তাদের বিছানা থেকে তাড়াবে, তারপর বোঝাবে, তারপরও অবাধ্য হলে পেটাবে। মেয়েরা বাপের সম্পত্তির ভাগ পাবে তিন ভাগের এক ভাগ, পুরুষেরা পাবে দুইভাগ। পুরুষেরা এক দুই তিন করে চারটি বিয়ে করতে পারে। নারীদের সে অধিকার নেই। পুরুষেরা তালাক দিতে পারে কেবল তিনবার তালাক উচ্চারণ করেই। নারীদের অধিকার নেই তালাক দেবার। সাক্ষী দিতে গেলে এক পুরুষ সমান দুই নারী।
চাঁদের নিজস্ব আলো আছে কি নেই, সূর্য ঘুরছে কি থেমে আছে, পৃথিবী থেমে আছে কি ঘুরছে তা আমি না হয় নিজের চোখে দেখিনি, কিন্তু মানুষে মানুষে তফাৎ কেন হবে, নারী এবং পুরুষে! ছোটদা আর আমি পাড়ার এক চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্রের জানালায় উঁকি দিয়ে আস্ত একটি নরকঙ্কাল দেখেছিলাম ঘরে ঝুলছে। কঙ্কালটি, ছোটদা বলেছিলেন, মেয়েরও হতে পারে, ছেলেরও। দু’শ ছ’টি হাড় আছে মানুষের শরীরে। ইস্কুল মাস্টাররাও বলেন সে কথা। দাদার ঘাড় আর আমার ঘাড়ে তফাৎ তো কিছু দেখি না! তাঁরটি যেমন সোজা, আমারটিও। তাঁর বরং হাড় ফোটানোর অভ্যেস আছে। হাত পায়ের আঙুল টেনে ফোটান, ঘাড় ধরে হেঁচকা টান দেন ডানে বামে, মটমট করে হাড় ফোটে, পিঠের হাড়ও ফোটান গা মুচড়ে। কেবল নিজের হাড় ফুটিয়ে দাদার মন ভরে না, অন্যের হাড়ও তাঁর ফোটানো চাই। আমাকে ঠেসে ধরে ঘাড়ের হাড় ফুটিয়ে দেন, একই রকম শব্দ হয় হাড় ফোটার। দাদার কিংবা ছোটদার বুকের যতগুলো হাড়, আমারও ততগুলো। বাবার পাঁজরে যতগুলো, মা’র পাঁজরেও। বাবার বুকে তো একটি হাড় কম নেই, যা দিয়ে মা’কে বানানো হয়েছে! এক লোকে যদি চার বিয়ে করে, তার পাঁজর থেকে চারটি হাড় কমে যাবে! আমার বিশ্বাস হতে চায় না। নানা যে হঠাৎ এক মেয়েকে বিয়ে করে বাড়িতে পনেরোদিন রেখেছিলেন, নানার সে সঙ্গিনীকেও কি নানার পাঁজরের হাড় দিয়ে বানানো হয়েছে!
সাক্ষী দিতে হলে দু’জন নারী দরকার হয় কেন যেখানে পুরুষের বেলায় একজন হলেই চলে! নারী কি সত্য কথা বলে না! কেবল পুরুষই কি সত্য বলে! শরাফ মামা কি সত্যবাদী! ঝুনুখালার সোনার দুল শরাফ মামা বলেছিলেন নেননি। সে দুল শেষ অবদি পাওয়া গেছে তাঁর লুঙ্গির গিঁটের ভেতর। ঘুমোচ্ছিলেন, গিঁট আলগা হয়ে বেরিয়ে এসেছিল দুলদুটো। নানি দেখে সরিয়ে রেখেছিলেন। শরাফ মামা ঘুম থেকে উঠেই বাড়ি ছেড়ে পালালেন। তাঁকে খুঁজে পেয়ে মারধোর করা হবে না এই শর্ত দিয়ে ফেরত আনা হয়েছিল বাড়িতে।
বাপের সম্পত্তির বেশির ভাগ পাবে ছেলে, মেয়ে পাবে কম ভাগ, কেন এই অবিচার! এ বাড়িতে দাদার অধিকার আমার চেয়ে এক ভাগ বেশি হওয়ার কারণ কি! দাদাও যেমন সন্তান, আমিও তেমন। তফাতের মধ্যে এই, দাদার নুনু লম্বা, আমার নুনু চ্যাপ্টা। বুদ্ধিসুদ্ধি মা মাঝে মধ্যেই বলেন, নোমানডার এক্কেবারে নাই। তবুও দাদার ভাগে বেশি, কারণ একটিই, তাঁর নুনু। যে কোরানকে চুমু দিয়ে নামাতে হয়, তুলতে হয়, সে কোরানে এমন বৈষম্যের কথা লেখা, আমার বিশ্বাস করতে মন চায় না। কোরান পড়তে আমার ইচ্ছে না হতে পারে, কিন্তু কোরানে মন্দ কথা লেখা আছে এরকম আমার কখনও মনে হয়নি আগে। আল্লাহও তাহলে সমান চোখে দেখেন না মেয়েদের! আল্লাহও তাহলে গেঁতুর বাবার মত, গেঁতুর মা’কে বেদম পেটাতো, গেঁতুর মা তার হুকুম মানে না, তাই। গেঁতুর মার চিৎকারে যেদিন পুরো আকুয়া পাড়া কাঁপছিল, আমি ফেলু মামার পেছন পেছন দৌড়ে, বাঁশঝাড়ের তল দিয়ে গেঁতুর মার উঠোনে থেমেছিলাম। আরও লোকের ভিড় ছিল উঠোনে। হাঁটুর ওপর লুঙ্গি, গা খালি, পা খালি, ঘাম ঝরছে দরদর করে গা বেয়ে ঠান্ডার বাপের গরম জিলিপির দোকানের সামনে দই মাঠা বিক্রি করা কদম ছাটা চুলের হোঁদল কুতকুতে চোখের গেঁতুর বাবার।
