বাবা, মা’র জিকির করার সময়ে, এক বিকেলে অসময়ে বাড়ি ফিরে, এদিক ওদিক উৎস খুঁজতে খুঁজতে শব্দের, সন্ধান পান।
যে বাবা আমার ঘরে এসে ছাত্রাণাম অধ্যয়নং তপ, সংস্কৃত শ্লোক না আওড়ে তাঁর বাণী শুরু করেন না, তিনি সেদিন বলেন, এক হাত কোমরে, আরেক হাত প্যান্টের পকেটে–তর মা কি পাগল হইয়া গেল নাকি! এইসব কি করে?
আমি রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর বইটি ভুগোল বই মেলে আড়াল করে, চোখ রেখে বঙ্গোপসাগরে, বলি–মা জিকির করতাছে।
— বেহেসতের জন্য মানুষটা বেহুঁশ হইয়া গেছে। সমাজ সংসার ফালাইয়া আল্লাহরে ডাকলে কে কইছে আল্লাহ খুশি হয়? কবি বইলা গেছেন কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর, মানুষের মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সূরাসুর।
বাবা আমার পড়ার টেবিলের দিকে দু’পা এগিয়ে আসেন। ওপরের বইখানা দুহাতে চেপে রাখি যেন আবার তলেরটি কোনও ফাঁক ফোকর দিয়ে বাবার চোখে না পড়ে।
–লেখাপড়া মন দিয়া কর। জীবনের এইটাই সম্বল। তোমার সম্বল তুমি আমারে দিয়া দিবা না, তোমারই থাকবে। আমি কষ্ট করে লেখাপড়া করছি, ইস্কুল থেইকা ফিইরা গরু চড়াইতে হইত আমার, রাত্রে কুপি জ্বালাইয়া লেখাপড়া করে ক্লাসে ফার্স্ট হইতাম। তোমাদের যেন কোনও কষ্ট না হয়, সেই ব্যবস্থা আমি করে দিছি। মন দিয়া লেখাপড়া কর, যেন ফার্স্ট হও। বইএর প্রথম পাতা থেইকা শেষ পাতা পর্যন্ত ঠোঁটস্থ কইরা ফালাও।
বাবার বাণীর কোনও উত্তর নেই, নীরবতা ছাড়া।
মা জিকির শেষ করে বেরিয়ে আসেন অন্ধকার থেকে আলোয়। মা’র ফোলা চোখ, ভোঁতা নাক, কালো ঠোঁট, হাড় বেরোনো গাল তৃপ্তিতে হাসে।
বাবার চলে যাওয়ার শব্দ পেয়ে ওপরের ভুগোলকে তলে পাঠিয়ে তলেরটিকে ওপরে নিয়ে আসি। পাঠ্য বইএর বাইরের কোনও বই পড়লে মাও ধমকাতেন আগে। সেদিন ফিরেও তাকালেন না আমি পাঠ্য কি অপাঠ্য পড়ছি। মা’র কাছে দুনিয়াদারির সব বিদ্যাই অপাঠ্য।
মা হাসি মুখে নিয়ে অপ্রকৃতিস্থের মত হেঁটে যান উঠোনের গোলাপ গাছের কাছে, গোলাপে হাত বুলোন। ডালের কাঁটা হাতে ফোঁটে মা’র, ফুঁটুক, কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল বুলোতে! হাত বুলোতে বুলোতে মা’র মুখের হাসি বেড়ে কানের লতি অবদি পৌঁছোয়, দু’গালের হাড়ের ওপর সুপুরির মত গোল হয়ে জমা মাংস। বই থেকে চোখ তুললেই খোলা দরজা, দরজার ওপাশে ছত্রিশ রকম ফুল ফলে ছাওয়া উঠোন, সেই উঠোনে মা আর পাঁচিল থেকে নেমে আসা বেড়াল, গালে মা’র সুপুরি হাসি। গভীর অরণ্যে ধাবমান হরিণের দ্যুতির মত মা’র হাসিটি আমাকে টেনে নেয় গোলাপ গাছের কাছে।
— কি মা, ফুলে হাত বুলাও কেন!
আমার প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই মা বলেন–আল্লাহ কি সুন্দর লাল রং দিছেন ফুলের, পাপড়িগুলা কি পাতলা কি নরম, পরতে পরতে পাপড়ি বসানো, এক মাপের, কুনো ছুটো বড় নাই। কী সুন্দর গন্ধ, কোনও মানুষের ক্ষমতা আছে এমন একটা ফুল বানানোর! আল্লাহর যে কত দান!
মা এত বিভোর হয়ে থাকেন ফুলের সৌন্দর্য্য যেন জীবনে প্রথম তিনি কোনও ফুল দেখছেন, ফুলের গন্ধ শুঁকছেন। যেন প্রথম আজ জেনেছেন যে আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি এই আসমান ও জমিনের যা কিছু, সব। মা বলেন–একটা ফুলের থেকে আরেক ফুল ভিন্ন, একটা ফুলের থেকে আরেক ফুলের সুবাস ভিন্ন। পাতাগুলা হরেক রকম হরেক গাছে। একটা থেকে আরেকটা ফলের স্বাদ ভিন্ন। কী অসীম ক্ষমতা আল্লাহতায়ালার।
ফুল থেকে চোখ তুলে মা আমার চোখে তাকান কিন্তু আসলে আমাকে তিনি দেখেন না, দেখেন মুখের ডৌলে সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা। মুখ থেকে চোখ যায় আকাশে, সেখানেও ক্ষমতা, মা’র মুখে মিষ্টি হাসি, মা জগত সংসারের অনেক উর্ধে।
সন্ধে হচ্ছে, মা এখন ঘরে যাবেন, আয়াতুল কুরশি পড়ে ফুঁ দেবেন ঘরগুলোয়, এতে বালা মুসিবত দূর হবে। কিন্তু বালা মুসিবত আসলে দূর হবে না। কারণ আকাশে কুন্ডুলি পাকাচ্ছে কালো মেঘ। গুড়ুম গুড়ুম শব্দে এক মেঘ আরেক মেঘকে গুঁতোচ্ছে। ঘুর্ণিঝড় শুরু হয়ে যাবে কিছু জানান না দিয়ে, ছুটে যাওয়া কিশোরীর চুলের মত উড়বে নারকেল গাছের পাতা। জাম গাছের ডাল ভেঙে পড়বে পেয়ারা গাছে, পেয়ারা গাছের ডাল লটকে থাকবে আম গাছে। আমের মুকুল ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে উঠোনে। ঝড়ে কারও বাড়ির টিনের চাল উড়ে এসে পড়বে আমাদের কাঠাল গাছের মাথায়। শেকড় উপড়ে থুবড়ে পড়ে থাকবে আমাদের আতা গাছ, কাঁঠালি চাপার গাছ। মা তখন আল্লাহর দরবারে চিৎকার করবেন আল্লাহ গো এই ঝড় থামাও। জিকির করা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া মা, রোজা করা, কোরান পড়া মা, ঘাড় অবদি চুল কাটা, নবীজির বিবিদের কায়দায় পোশাক পরা, বেহেসতের টিকিট প্রায় হাতে পাওয়া মা’র কান্না এক আকাশ থেকে দুই আকাশে ওঠে, বড়জোর তিন কি চার আকাশে, সাত আকাশে ওঠার আগেই মা’র কান্না ধপাশ করে পড়বে নিচে, পড়বি পড় ঝড়ের ঘাড়ে। দরজা জানলা সেঁটে, ডাল ভাঙা চাল ভাঙা প্রায় দালান ভাঙা শব্দে কাতর হয়ে আমি, ইয়াসমিন, মণি মা’কে ঘিরে থাকব, মা ওপরঅলার সঙ্গে যোগাযোগ করে কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন বলে। মা সশব্দে আওড়াতে থাকবেন–ওয়া ক্বীলা ইয়া আরদুবলায়ী মাআকি ওয়া ইয়াসামাউ আক্বলিয়ী ওয়া গীদাল মাউ ওয়া ক্বদিআল আমরু ওয়াসতাওয়াত আলাল জুদিয়্যি ওয়া ক্বীলা বুদাল্লিল কাওমিজ জালিমীন।
মা, হঠাৎ, অন্তত আমাকে, তাজ্জব করে দিয়ে বলবেন–তর বাবা না জানি কই, নোমানকামাল না জানি কই!
