হারামজাদি মাগী, শইল্যো তর তেল বাইড়া গেছে, নুন ছাড়া রাইন্ধা থস, আবার কাইজ্যা করস! বলতে বলতে পিঠে পেটে মুখে লাথি মারছে সে গেঁতুর মা’র, চুলোর ভেতর থেকে আগুনজ্বলা খড়ি এনে পেটাচ্ছে সারা গায়ে, ছ্যাঁত ছ্যাঁত করে গেঁতূর মা’র গা পুড়ছে, গেতুঁর মা কাটা মুরগির মত লাফাচ্ছে, উঠোনে ভিড় করা লোকের দু’হাত আড়াআড়ি করে পেটের ওপর রাখা, পিঠের ওপর রাখা, বাহুর শেকলে বাহু বাঁধা। আঙুলের ভেতর আঙুল ঢুকোনো হাত মাথার পেছনে রাখা, মাথার ভর হাতে অথবা হাতের ভর মাথায়। মেয়েদের ডান হাতে ঠোঁট ঢাকা, বাম হাতে কনুই ধরা ডান হাতের, কনুইয়ের ভর বাম হাতে। কারও বাম হাত ঝুলে আছে কাঁধ থেকে, ডান হাতের ভর কোমরে। চোখগুলো হাতের মত অলস নয় কারও, চোখ গিলছে গেঁতুর বাপের গায়ের জোর, গেতুঁর মা’র নাক মুখ মাথা থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত। এরপর যে কান্ডটি করেছিল গেতুঁর বাবা দেখে ভিড়ের হাতগুলো মাথা থেকে কোমর থেকে পেট থেকে পিঠ থেকে মুখ থেকে ধীরে ধীরে খসে পড়ে, ঝুলে থাকে, আঙুলগুলো থোড় থেকে বের হওয়া কচি কলার মত। উঠোনের মাঝখানে যুদ্ধ জয়ের মত দাঁড়িয়ে বলেছিল তরে আমি তালাক দিলাম মাগী, এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক, বাইন তালাক।
জবাই করা মুরগি তখন আর নড়ছে না, কাতরাচ্ছে না। চোখগুলো উৎসুক। চোখগুলোয় ক্ষিধে। পরনের কাপড় ছিঁড়ে ত্যানা ত্যানা গেতুঁর মার, রোদে পোড়া উড়ো খুড়ো লাল চুল ধুলো কাদায় মাখা। এক এক করে চোখ সরে যাচ্ছে, হাত সরে যাচ্ছে, পা সরে যাচ্ছে ভিড়ের। শেষ উত্তেজক দৃশ্যের পর বায়োস্কাপের যবনিকা পতন ঘটলে তো তাই হয়। ছোট শনের ঘর, চালের ওপর লতিয়ে ওঠা লাউ শাক, এক চিলতে গোবর জলে লেপা উঠোন, উঠোনে পড়ে থাকা তালাক হয়ে যাওয়া গেঁতুর মা। লোকের চোখের ক্ষিধে মিটেছে। শেষ দৃশ্য পেছনে রেখে লোক সরে যাচ্ছে। ফেলু মামাও সরে যাচ্ছেন, ফেলু মামার পেছন পেছন সরে যাচ্ছি আমি।
সরে যাওয়া লোকের মুখে খই ফুটছে তখন, নুন দিছে না তরহারিত, জামাই চেতব না তো কি করব! বেডিডাও আছিল আস্তা কাইজ্যাকুড়নি, অহন বুঝব মজা! গেতুঁর বাপের খেদমত করে নাই মাগী, হুত্যা থাকছে; উঁচ কপাইল্যা চিরন দাঁতি, রাইত পুহাইলে হারায় পতি। গেতুঁর মা শেষ দৃশ্য থেকে উঠে এসে পুকুর ঘাটে বসে সারাদিন বিনিয়ে বিনিয়ে কেঁদেছে। কেউ আর ভিড় করেনি তাকে দেখতে। কেবল জানালায় থুতনি রেখে আমি তাকিয়ে ছিলাম বর্ষায় জল ভরে উপচে ওঠা পুকুরের দিকে। ঘাটে বসে গেঁতুর মা কাপড় কাচত, গায়ে কাপড় কাচা সাবান মেখে ডুব দিয়ে গোসল সারত, গোসল সেরে ভেজা কাপড়ে সপ সপ করে হেঁটে ঘরে ফিরত, হাতে ঝুলে থাকত জল নিংড়ানো কাচা কাপড়। সেই পুকুর ঘাট খালি পড়ে আছে, গেতুঁর মা আর গেতুঁর বাবার লুঙ্গি গেঞ্জি কাচছে না, গেতুঁর মুতের কাঁথা কাচছে না, পুকুর পুকুরের মত পড়ে আছে একা, খলসে মাছ খলসে মাছের মত, গেঁতুর মা বসে থাকে গেতুঁর মা’র মত নয়, উঁইএর ঢিবির মত।
মা আমাকে ধমকে জানলা থেকে সরান–ছেড়িডার খালি ছুডুলুকের দিকে নজর। নানির বাড়ির সবাই বস্তির মানুষদের ছোটলোক বলে। আর দালানে থাকা মানুষদের বলে বড়লোক। বড়লোকেরা বাড়ি এলে নানির বাড়িতে বড় ঘরের গদিঅলা চেয়ারে বসতে দেওয়া হয়, শেমাই পায়েস রান্না করে গরম গরম খেতে দেওয়া হয় পিরিচে করে, চামচে তুলে তুলে বড়লোকেরা শেমাই পায়েস খায়। পায়েস খেয়ে কাচের গ্লাসে টিউবয়েলের পানি। পানি খেয়ে চিনেমাটির কাপে চা, চায়ের সঙ্গে গ্লুকোস বিস্কুট। ছোটলোকেরা এ বাড়ি এলে মেঝেয় বসে, পিরিচে করে তাদের শেমাই খেতে দেওয়া হয় না, চা বিস্কুটও না।
গেতুঁর মা’কে তালাক দেওয়ার সাতদিনের মাথায় কুতকুত খেলার বয়সী এক মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তোলে ছোটলোক গেঁতুর বাবা। মা শুনে বলেছিলেন–গেঁতুর বাপটা একটা আস্তা শয়তান। গেঁতুর মারে খামাকা তালাক দিল।
ফুলবাহারির জামাইয়ের চার বউ ঘরে। মা বলেন–ফুলবাহারির জামাইডা বড় বদমাইশ। কত্তগুলা বিয়া করছে।
মা বাবাকেও বলেন বাবার নাকি হাড়ে হাড়ে বজ্জাতি, কোনও একদিন রাজিয়া বেগমকে বাবার বিয়ে করার সম্ভাবনা আছে বলে। কিন্তু মা’র এ কেমন আল্লাহর আদেশ নিষেধ মানা! পুরুষকে আল্লাহ অবাধ অধিকার দিয়েছেন যখন ইচ্ছে বউকে তালাক দেওয়ার, যখন ইচ্ছে বিয়ে করার, এক দুই তিন করে চারটে। ওরা তো আল্লাহর বেঁধে দেওয়া নিয়মের মধ্যেই চলছে। মা কি সাহসে ওদের গাল দেন তবে! আল্লাহর আদেশ এ কেমন মাথা পেতে নেওয়া তবে মা’র! মা কি জানেন মা যে নিজেই গুনাহ করছেন! আমার হাঁটুর ওপর পড়ে থাকে বই, লু হাওয়ায় পাতা ওড়ে বইয়ের, জানলার পর্দা ওড়ে, ফিনফিনে চুল ওড়ে। আমার মনে হতে থাকে আমি যক্ষের ধন দেখেছি কারও, গোপনে। গোপনে দেখেছি মোহর ভরা কলসির গলায় পেঁচিয়ে থাকা সাপ। কলসিতে মোহর আছে বলেই জানে লোকে! আসলে কি মোহর, নাকি কলসি খালি। খালি কলসি বাজে বেশি।
০৮. সংস্কার
মা’কে খুব কমই দেখেছি আমাদের সঙ্গে বসে ভাত খেতে। বাড়ির সবাইকে খাইয়ে বেলা চলে গেলে নিজে খান। আমরা খেয়ে যে খাবার বাঁচে, তা। মুরগি রান্না হলে মা’র ভাগে গলার হাড়, বুকের হাড়, পিঠের হাড়। মা খেয়ে যা থাকে, খায় চাকর চাকরানি। না থাকলে ক্ষতি নেই, ওদের খাবার আলাদা রাঁধা হয়, মাছ মাংস আমাদের, কাজের মেয়েদের জন্য পাইন্যা ডাল, শুঁটকি। এরকমই নিয়ম, এ নিয়ম নানির বাড়িতেও ছিল, নানিও খেতেন নানাকে খাইয়ে, ছেলেদের খাইয়ে, বাচ্চাকাচ্চা খাইয়ে, পরে। সবার খাওয়া হলে কাজের লোক খেত। পান্তা ভাত, নুন মরিচ দিয়ে, নয়ত নষ্ট হয়ে যাওয়া ডাল মেখে। আমরা যখন খাই, মা কখনও কোনও কাজের লোককে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেন না। ওরা নাকি আমাদের খাবারে নজর দেয়। সাত বছর বয়সে একদিন পেট কামড়াচ্ছে রাতে, মা বললেন ফুলবাহারিডারে দেখছিলাম হাঁ কইরা দেখতাছে তুই যহন খাস। ওর নজর লাগছে।
