গায়ে সাবান মাখতে মাখতে উঠোনে বসে জিভ বের করে হাঁপাতে থাকা কুকুরটিকে বলি–এই কুত্তা, কাডল আর গুএর রঙও ত একরকম, সত্যি না?
কুকুরের লাল জিভখানা বেরিয়েই থাকে, উত্তর নেই। এই কুকুরটির বড় দুর্নাম পাড়ায়। পাকঘরে ঢুকে পাতিলে মুখ দেয়, মাংস মুখে নিয়ে লেজ তুলে দেয় দৌড়। পাড়ার ছেলেরা একে দেখলেই ঢিল ছোঁড়ে।
সাবান মেখে লোটা ভরে পানি নিয়ে গায়ে ঢালি, আর কুকরটিকে বলি–হজ্বে যাইবি? তর সাত খুন মাপ হইব। কবিরা গুনাও।
কুকুরের গায়ে আমার গোসলের পানি ছিটকে পড়ে, সে কোনওরকম ঘেউঘেউএ না গিয়ে ভালমানুষের মত গা ঝেড়ে চলে যায়। ঘরে তখন নানা মক্কা থেকে আনা জমজমের পানি দিচ্ছেন খেতে বৃত্তের প্রত্যেককে। নানি দৌড়ে গেছেন পাকঘরে চিতই পিঠা বানাতে। নানা চিতই পিঠা খেতে বড় ভালবাসেন।
যে মাসে নানা মক্কা থেকে ফিরলেন, সে মাসেই বড়মামা গেলেন বিদেশ, উড়োজাহাজে করে, করাচি। করাচি থেকে ফটো পাঠিয়েছেন ঘোড়ায় চড়া, মাথায় হ্যাট, গায়ে স্যুট। নানি ছবিটি বাঁধিয়ে, টাঙিয়ে রেখেছেন ঘরে, বাঁশের ব্যাংকের পাশে। বিদেশে থাকা ছেলের ফটো দেখতেও পড়শিরা এ বাড়ি আসেন। সুলেখার মা নানির পানের বাটা থেকে পান বানিয়ে মুখে পুরে, এক চিমটি শাদা পাতা আর আঙুলে চুন তুলে জিভে লাগিয়ে, উঠোনে পিচ করে প্রথম পিচকি ফেলে এসে এদিক ওদিক দেখে, ঘরে যখন কেউ নেই, বলেছেন নানির কানের কাছে মুখ নিয়ে, ঘোমটাখানা মাথায় টেনে দিয়ে আরও, ডান হাতের বাকি সব আঙুলে চুনের আঙুল ছাড়া, সেটি খাড়া–সিদ্দিকে শুনি কমুনিস্ট হইছে। বিদেশের চাকরিডাও কমুনিস্টির।
পীরবাড়িতে নিয়মিত যাওয়া শুরু করার আগে মা দোযখের সাপ বিচ্ছুর কথা এত বলতেন না। নামাজও দ্রুত সারতেন, বাড়িতে বাবার ফেরার, দাদার-ছোটদার আসার, পাকঘরে চিনেমাটির থাল ভাঙার শব্দ হলেও মা নামাজের ফরজ পড়ে সুন্নত আর পড়তেন না, জায়নামাজ গুটিয়ে উঠে পড়তেন। আর এখন বাড়িতে তুফান বয়ে গেলেও মা ধ্যানে বসে থাকেন, সুন্নত না পড়লেও চলে কিন্তু মা’র পড়া চাই। মোনাজাত ততক্ষণ করা চাই, যতক্ষণ না মা’র মনে হয় তিনি প্রাণ মন সব ঢেলে দিতে পেরেছেন, এবং আস্থা হয় যে আল্লাহ তাঁর মোনাজাত কবুল করবেন, সাপ বিচ্ছুর কামড় থেকে বাঁচাবেন। সাপ বিচ্ছুর ব্যাপারটি আমার মাথায় কিলবিল করে, দোযখ মানে হচ্ছে বিশাল এক গর্ত, গর্তে আগুন জ্বলছে, সাপ বিচ্ছু কামড়াচ্ছে মানুষদের, আর আল্লাহতায়ালা শাদা মুখ, শাদা দাড়ি, শাদা পাজামা পাঞ্জাবি টুপি পরে ছড়ি হাতে দাঁড়িয়ে দেখছেন ওপর থেকে আর খুশিতে হা হা করে হাসছেন, সিনেমার খারাপ লোকদের মত। এর মধ্যে আমার আবার কুঁচ বরণ কন্যা, বেহুলা, রূপবান সিনেমাগুলো দেখা হয়েছে। মা সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন ক’দিন। ইস্কুল থেকে দেখিয়েছে দর্শন আর কাবুলিওয়ালা। সিনেমায় খারাপ লোকেরা মানুষকে কষ্ট দিয়ে আরাম পায়, দেখেছি। মা’কে সাহস হয় না বলতে যে আল্লাহ নিশ্চয় খারাপ লোক, না হলে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কথা এত বলেন কেন! তবে আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে বলি–দোযখে যদি ওঝারা যায়, তাইলে ত সব সাপগুলারে বশ কইরা ফালাইব। সাপ খেলা দেখ নাই? ওঝা যা কয়, সাপ তাই শোনে!
আমি এ সময় বাংলা ইংরেজি বিজ্ঞান পড়া, পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেয়ে তরতরিয়ে ক্লাস ডিঙোনো, দাদাদের বালিশের তলে রাখা বড়দের গল্পের বইও গোগ্রাসে পড়ে ফেলা মেয়ে। মা নামাজ পড়তে আদেশ করলে, কলপাড়ে বসে অযু করে, কাপড়ে মাথা ঢেকে, মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে, হাঁটু ভেঙে, বসে, বিড়বিড় করে যা বলতে হয় আরবি ভাষায়, যেহেতু তার অর্থ কখনও বুঝিনি, মা’কে বলি–ইস্কুলে মাস্টাররা বলে না বুইঝা কোনও কিছুই মুখস্ত করতে নাই, গাধা ছাত্রীরা মুখস্তবিদ্যা আওড়ায়, আর ভাল ছাত্রীরা বুইঝা পড়ে, পইড়া নিজের ভাষায় লেখে। ধর, আরবিতে না পইড়া বাংলায় নামাজ পড়লে অসুবিধা কি, আল্লাহ কি বাংলাভাষা জানে না?
মা ফুঁসে উঠে বলেন–এত কথা কইবি না। তুই আমারে আরে জ্বালাইস না। কত আশা ছিল মেয়ে একটা পবিত্র দিনে জন্মাইছে, মেয়ে নামাজ রোজা করব। ঈমানদার হইব।
মা এড়িয়ে যান প্রশ্ন।
তিনি অন্ধকার একলা ঘরে আল্লাহু আল্লাহু বলে ডানে বায়ে মাথা ঝাঁকিয়ে জিকির করতে নামছেন ইদানীং। স্বর আনতে হয় কলব থেকে, গলার স্বরে চলবে না। ঘন্টা পেরিয়ে যাবে, আল্লাহু থামবে না। আল্লাহু চলবেই। আল্লাহু আল্লাহু। সারা ঘর কেঁপে উঠবে শব্দে। ঘরের বেড়াল ভয়ের চোটে এক দৌড়ে পাঁচিলের ওপর গিয়ে বসে থাকবে। সেই অদ্ভুত শব্দে পোষা কুকুর ঘেউ ঘেউ রব তুলবে। মা তবু থামবেন না, কারণ জিকির যাঁরা করেন, তাঁদের কাঁধ থেকে পাখা গজায়, তাঁরা এই জগত থেকে উড়ে আরেক জগতে পৌঁছে যান, সে জগতে কেবল এক আল্লাহ আছেন, আর আছেন জিকিরঅলা, সাত আসমানের ওপর। আল্লাহ তাঁর জিকিরি বান্দার চিবুক উঁচু করে ধরে ঠোঁটে গাঢ় চুমু খান, দেখে বান্দা মুর্ছা যান মুহূর্তে। আল্লাহকে দেখতে আমিরুল্লাহর মত লাগে, কখনও ছোটবেলার জায়গির মাস্টারের মত, কখনও বা লম্বা আলখাল্লা পরা সুলতান ওস্তাদজির মত। মা মাথা ঝাঁকান জোরে, না আল্লাহতায়ালা নওমহলের হুজুর বা অঙ্কের মাস্টার বা সুলতান ওস্তাদজির মত হওয়ার কথা নয়, আল্লাহর কোনও আকার থাকতে নেই, আল্লাহ নিরাকার। আল্লাহ আকার হয়ে যত দেখা দেন, তিনি তত মাথা ঝাঁকিয়ে মনের ভূত তাড়ান। বেড়াল বসেই থাকে পাঁচিলের ওপর।
