আমি খানিকটা দমে যাই, হবে হয়ত, আল্লাহর মাটি যে দুনিয়ার মাটির মত, এর কোনও মানে নেই। সাত আসমানের ওপর হয়ত অন্যরকম মাটি পাওয়া যায়। আমাকে গালে হাত দিয়ে ভাবতে দেখে মা বলেন–আল্লাহর কুদরতের কোনও সীমা নাই। সবর করবি আল্লাহর কাছে। এই যে ধর ডাবের মধ্যে, খানিক থেমে, উঠোনে নারকেল গাছগুলোর দিকে বিহ্বল-চোখে তাকিয়ে আবার শুরু করেন–আল্লাহ কি সুস্বাদু পানি দিছেন। মানুষের শক্তি আছে ডাবের মধ্যে পানি দিতে? উখের কথা ধর, আল্লাহর কি কুদরত, লাডির মধ্যে শরবত!
মা’র মুগ্ধ দৃষ্টি নারকেল গাছ ছাড়িয়ে উঠোনের আরও গাছের ওপর ছড়িয়ে যায়।
— তারপর হইল গিয়া কাঁঠাল, কেমনে কোয়া কোয়া কইরা আল্লাহ বসাইয়া দিছেন! কোন মানুষের শক্তি আছে কাঁঠাল বানাইতে! আল্লাহর কাছে সবর কর। এত ফলফলান্তি দিছেন বান্দাদের খাইতে।
ডালিম গাছের ওপর চোখ ফেলে–ডালিমের কথাই ধর। কী কইরা দানাগুলার মধ্যে আল্লাহ চিনি ভইরা দিছেন! আল্লাহ ছাড়া কার ক্ষমতা আছে বানানির!
আমাকে কাবু করে ফেলে মা’র বর্ণনা। কাবু হলে মা স্থির হন। দু’চোখে মমতা উপচে ওঠে।
কালো বোরখায় সারা শরীর ঢেকে মা রওনা হচ্ছিলেন পীরবাড়িতে, হঠাৎই, মা’র এক পা যখন সিঁড়িতে, আরেক পা মাঠে, বলি–মা, মেয়েদের বোরখা পরতে হয় কেন?
মা বলেন, মা’র চোখে সুর্মা, মাঠের পা’টিকে সিঁড়িতে ফের উঠিয়ে–আব্রু রক্ষা করার লাইগ্যা। আল্লাহ কইছেন মেয়েদের শরীর যেন বাইরের মানষে না দেখে। দেখলে গুনাহ হইব।
সিঁড়ির দু’ধাপ নেমে এসে প্রশ্ন করি–আল্লাহ ছেলেদের বোরখা পরতে কন নাই ক্যান? তাদের শরীল যদি বাইরের মানষে দেখে?
মা’র ছাইরঙা চোখদুটো উনুনের মত জ্বলে ওঠে–আল্লাহ যা আদেশ করছেন তাই মানতে হইব। ছেলেদের বোরখা পরার আদেশ করেন নাই, মেয়েদের বোরখা পরতে কইছেন। মুখ বুইজা মানতে হইব আল্লাহর আদেশ। প্রশ্ন করলে গুনাহ হইব।
গুনাহ গুনাহ গুনাহ। তিন ধাপ পিছিয়ে দাঁড়াই। ডানে ফিরলে গুনাহ। বামে ঘুরলে গুনাহ। প্রশ্ন করলে গুনাহ। গুনাহ করলে আল্লাহ দোযখে ছুঁড়বেন। দোযখে সাপে কামড়াবে, বিচ্ছু কামড়াবে। সাপ বিচ্ছুকে আমার ভীষণ ভয়। কিন্তু ওদিকে যে ইস্কুলে অঙ্কের মাস্টার অঙ্ক একটি বোর্ডে লিখেই বলেন কোনও প্রশ্ন থাকলে কর। প্রশ্ন যে করে না, সে অঙ্ক বোঝে না।
যাক্কুম গাছের ফল খাওয়াবেন আল্লাহ, সে এক ভয়ংকর জিনিস, খেলে পেটের নাড়িভুড়ি উগলে আসে। নানার মুখে যাক্কুম গাছের নাম আমি প্রথম শুনি।
ও নানা যাক্কুম গাছ কি রকম দেখতে!
খালি কাঁটা! কাঁটার উপরে কাঁটা! নানা গা ঝাঁকুনি দেন ভয়ে।
ফণিমনসার মত! সম্ভবত।
আমার মনে হত নানা বোধহয় জীবনে একবার হলেও খেয়ে দেখেছেন যাক্কুম ফল। তিনি আর দ্বিতীয়বার এর ধারে কাছে যেতে চান না, এমন বিস্বাদ।
হজ্ব থেকে ফিরে এসে অবদি আর দোযখের নয়, বেহেসতের খাবারের বর্ণনা দিতে শুরু করেছেন নানা। চোখ বুজে, যেন তাঁর সামনে বেহেসতর খানা সাজানো, মুখে স্মিত হাসি, বলেন আহা বেহেসতে এমন খানা, একবার খাইলে ঢেক একটা আইব তো মেসকাম্বর। দেখে মনে হয় বেহেসতের সুস্বাদূ খানা খাবার লোভে নানা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পরেন, খাবারের পর সুগন্ধী ঢেঁকুরটির জন্যও। নানা যেদিন হজ্ব থেকে ফিরলেন, তাঁকে ঘিরে গোল হয়ে বসেছিল বাড়ির সবাই, যেন নানা ফিরেছেন স্বয়ং আল্লাহর সঙ্গে মোলাকাত করে। নানা কখনও কেঁদে কখনও হেসে বলছিলেন কি করে তিনি কাবার চারদিকে ঘুরেছেন, হযরে আসওয়াদ নামের কালো পাথরে চুমু খেয়েছেন, লোকের পাপ শুষে নিয়ে পাথরটি কালো বর্ণ হয়ে গেছে, জুতো ছুঁড়ে মেরেছেন পাহাড়ে, মাথা ন্যাড়া করেছেন, সেলাই ছাড়া কাপড় পরেছেন। হযরতের রওজা মোবারক জিয়ারত করেছেন। নানাকে দেখতে পড়শিরাও ভিড় করেছিল, পড়শিদের মধ্য থেকে সুলেখার মা বললেন–আহা একবার হজ্বে গেলে মানষের সব গুনাহ মাপ হইয়া যায়। আপনের কপাল ভাল।
আমি পা ছড়িয়ে মেঝেয় বসা পুঁচকে, বড়দের কথার মধ্যে নাক গলিয়ে বলি–যারা খারাপ কাজ করে, মানুষ খুন করে, যে পুলিশগুলা মিন্টুরে মাইরা ফেলছে গুলি কইরা, সবার গুনাহ মাপ কইরা দেন আল্লাহ?
নানা পুঁচকের প্রশ্নের উত্তরে বলেন–হ। সব গুনাহ।
মা বলতেন গুনাহ অনেক রকম। কবিরা গুনাহ সবচেয়ে খারাপ। এই গুনাহর কোনও মাপ নাই।
— কবিরা গুনাও? জিজ্ঞেস করি।
নানা এবার আর পুঁচকেকে উত্তর দেন না। নানাকে ঘিরে থাকা বৃত্ত থেকে উঠে পুঁচকের বাহু ধরে টেনে কলপাড়ে নিয়ে অখুশি মা ফুলবাহারি বালতিতে পানি ভইরা রাখছে কহন, গুসল কর, বলেন।
বালতি থেকে লোটা ভরে ঠান্ডা টিউবয়েলের পানি মাথায় ঢালতে থাকি, এখানে দাঁড়িয়েই বাড়ির ছেলে বুড়ো নাতির গোসল সারতে হয়। নানি আর তাঁর ডাঙর মেয়েরা করেন গোসলখানায়, ওটি আবার পেশাবখানাও। মাথার ওপর খোলা, সাড়ে তিনখানা দেয়াল, আধখানায় পর্দা ঝুলিয়ে দেওয়া। আমাদের উঠোনের এক কিনারেও এরকম একটি মাথা খোলা দরজা ফরজা নেই গোসলপেশাবখানা আছে, মুতের হলুদ দাগ পড়ে গেছে মেঝেয়। টিউবয়েল নানির উঠোনে বলে এখানেই আমরা গোসল সারি। বাবা অবশ্য দাগ পড়া গোসলখানায় সারেন। খুব ভোরে ফুলবাহারি বালতি ভরে দিয়ে আসে পানি। বেশিদিন হয়নি নানির উঠোনে টিউবয়েল বসেছে, আগে কাপড় ধোয়ার, গোসল করার এমনকি খাওয়ার পানিও কুয়ো থেকে নেওয়া হত। রাস্তায় সরকারি কল বসলে সেই কল থেকে কাজের বেটি পাঠিয়ে কলসি ভরে খাওয়ার পানি নিয়ে আসা হত। মা যখন ছোট, খাওয়া হত পুকুরের পানি, পুকুরে তখন গোসল করা, কাপড় ধোয়া ছিল নিষেধ। মা’র আমলের আর আমার আমলের দিনের মধ্যে বিস্তর তফাৎ, মনে মনে ভাবি। কলপারে বসে গোসল করতে করতে, গায়ে গন্ধ-সাবান মাখতে মাখতে সাবানের গন্ধের চেয়ে নাকে লাগে কাঁঠালের গন্ধ। নানির গাছে কাঁঠাল পাকছে গরমে। কাঠাঁলের গন্ধে আমার গলার ভেতরে সুরসুর করে চলে যায় পিচ্ছিল কিছু। প্রথম কাঁঠাল খেতে গিয়ে গলায় আমার আটকে গিয়েছিল রসালো কোয়া, ওয়াক করে আধ গেলা কোয়া ফিরিয়ে এনেছিলাম। এরপর থেকে মা কাঁঠাল চিপে রস বানিয়ে দুধ মুড়ির সঙ্গে খেতে দেন, ওতে গলায় আটকায় না ঠিক, কিনতু গন্ধ সয় না আমার। মা বলেন, এক হাতে নাক চিইপা ধর, আরেক হাতে খা। শুনে হাসি, এ ঠিক খাটা পায়খানায় হাগার মত, চারিতে গু পড়ে, গুএর গন্ধ ঠেকাতে এক হাতে নাক চেপে রাখতে হয়।
