আমি এবার সুযোগ পেয়ে ধনুক গলা থেকে ছুঁড়ে দিই শব্দের তীর–আল্লাহ হও না কইলে কোনও কিছু হয় না, তুমি নিজেই কও। আল্লায় বাচ্চাটারে হওয়াইছেন বিধর্মীর ঘরে। দোষ তো তাইলে আল্লাহর। জানে না বোঝে না বাচ্চারে দোষ দেওয়া ঠিক না।
মা’র যে হাতে তসবিহ ছিল, সে হাতেই খপ করে ধরে আমাকে এক ঝটকায় কাছে এনে চুল মুঠি ধরে হেঁচকা টান লাগিয়ে বলেন–আল্লাহ নিয়া কথা কস! কত বড় সাহস তর! কার কাছে শিখছস এইসব! আর যদি একদিন শুনি আল্লাহ রসুল নিয়া বাজে কথা কইতে, তরে আমি গলা টিইপা মাইরা ফালাইয়াম। আমি জন্ম দিছি, তর মত দুষমনরে আমার মাইরা ফেলার অধিকার আছে। এমন পাপীরে মারলে আমার আরও সওয়াব হইব।
আমি ঠিক বুঝে পাই না আল্লাহ রসুলের কথা আমি মন্দ কি বলেছি। কেবল মা’কে বোঝাতে চেয়েছিলাম একটি শিশুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই কোন ঘরে সে জন্ম নেবে, কোন ধর্ম সে বরণ করবে। যেহেতু আল্লাহতায়ালাই সিদ্ধান্তটি নেন, দায়িত্বটি তাঁর। আল্লাহর ওপর কোনওরকম জটিল দায়িত্ব দিতে পছন্দ করেন না মা। মা’র অপছন্দোর পরিসর এত দ্রুত বাড়তে থাকে, যে আমি যা কিছুই করি, মা বলেন গুনাহ করছি।
টিউবয়েল থেকে গ্লাসে জল ভরে খাচ্ছি, মা বললেন–খাড়ইয়া পানি খাস ক্যান? খাড়ইয়া পানি খাইলে শয়তানের মুত খাওয়া হয়।
পেশাবখানা থেকে এলে হাত পরীক্ষা করেন ভেজা কি না, না ভেজা থাকলে–মুইতা পানি লইছস? হিন্দুরা মুইতা পানি লয় না। কাফেরের একমাত্র স্থান দোযখ।
পুবের জানালা ঘেসে হাসনুহেনা গাছ, সারারাত ফুল ফুটে সুগন্ধে ভরে থাকে ঘর। জানালার দিকে মাথা রেখে যখনই শুই, মা তেড়ে আসেন–পশ্চিম দিকে পা দিয়া শুইছস ক্যা? জানস না পশ্চিমে কাবা শরিফ? গুনাহ হইব। পশ্চিমে মাথা দিয়া শ।
আমার তখন দিকের ধারণা হয়েছে, পাড়ার পশ্চিম দিকে একটি মন্দিরও আছে জানি। মা’কে বললে মা শয়তানের দোসর বলে গাল দেবেন, পিঠে কিলও হয়ত দেবেন ধুমুর ধুমুর, এই ভয়ে পা সরিয়ে রাখি। বেচারা পা দু’খানা যদিও মক্কার কাবা শরিফ থেকে হাজার মাইল দূরে ছিল, মাঝখানে খাল বিল পাহাড় পর্বত, পায়খানা, পেশাবখানা, মন্দির গির্জা সবই ছিল।
আমি যুক্তি খুঁজে পাই না মা’র ধর্মের। প্রশ্ন করে যে মামুলি উত্তরগুলো মেলে, তা এরকম, আল্লাহ মাটি দিয়ে মানুষ বানিয়েছেন আর আগুন দিয়ে বানিয়েছেন জ্বিন। হাশরের ময়দানে বিচার হবে ইনসান এবং জিনের। জিন কোথায় আছে, আছে বাতাসে বাতাসে, আমরা দেখতে পাই না। আল্লাহ কোথায় আছেন, আল্লাহ হচ্ছেন নূর, আল্লাহকেও দেখতে পাওয়া যায় না, আল্লাহ ওপরে থাকেন, মানে আকাশের কোথাও। আল্লাহ যেখানেই থাকুন সব দেখতে পান, সব শুনতে পান।
আবার শবেবরাতের রাতে রুটি সেমাই রেঁধে সারারাত নামাজ পড়ার আয়োজন করে মা বলেন–আজ আল্লাহ সাত আসমানের নিচে নাইমা আইছেন, এইখান থেইকা ভাল কইরা দেখবেন দুনিয়ায় কারা কি করতাছে।
ফস করে বেরিয়ে যায় মুখ থেকে–মা, সাত আসমানের ওপর থেইকা কি আল্লাহ ভাল দেখতে পারেন না দুনিয়ার মানুষদের? ভাল কইরা দেখতে হইলে কি নিচে আসতে হয়?
মা দাঁতে দাঁত পিষে বলেন–এত প্রশ্ন করতে হয় না। আল্লাহকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করবি। আল্লাহ সর্বশক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নাই। আল্লাহ গফুরুর রাহিম। আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়।
পীর আমিরুল্লাহকে আমি ঠিক এই বাক্যগুলোই বলতে শুনেছি। মা’কে ময়না পাখির মত মনে হয়। নানিবাড়ির খাঁচায় বসে থাকা ময়না পাখিটি বাড়িতে কেউ ঢুকলেই বলত– মেমান আইছে, খাওন দেও। রুনুখালা শিখিয়েছিলেন বলতে। ব্যস, শিখে অবদি ময়না নিজের বুলি ভুলে, কেবল তা আওড়াত।
পীরবাড়ি থেকে মা যা শিখে আসেন, কেবল যে আওড়ান তা, তা নয়, আমার ওপর, বিশেষ করে আমারই ওপর, তার বিরামহীম চর্চা চলে। আমাকে সংক্রামিত করতে মা মরিয়া হয়ে ওঠেন, যদিও সময় সময় বলেন–তরা নিজের পথ নিজে দেখ। আমার নছিহত করার আমি করছি। হাশরের মাঠে আল্লাহ তগোরে জিগাস করবেন তোমাদেরে কেউ কি জানাইছিল আমার কথা, তখন না করতে পারবি? আসলে আল্লাহ রসুলের কথা আমি যে বলি, তা আল্লাহ আমারে দিয়া তগোরে বলাইতাছেন। আমি উছিলা মাত্র।
ভেতরের ঘরে বসে মা এবং বারান্দায় বসে সুলতান ওস্তাদজী আমাকে কলেমা শিখেয়েছিলেন, কতটুকু তার মনে রেখেছি, মাঝে মাঝেই ঝালাই করেন মা, নছিহত করার উছিলা হয়ে, বেশ মোলায়েম স্বরে–কলেমা এ তৈয়বটা কও তো মা!
আমি ফটাফট বলে দিই–লা ইলাহা ইল্লালল্লাহু মহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
শেষ হতে না হতেই মা আবার–কলেমা শাহাদাৎ?
–আশহাদু আন লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।
নির্বিকার, যেন আওড়াচ্ছি ফুল পড়ে পাতা নড়ে, যে আমি ফুলও চিনি না, পাতাও না।
মা’র মুখে হাসি ফোটে। প্রসারিত ঠোঁট সংকুচিত হতে মা’র সময় নেয়নি যেদিন বলেছিলাম–তুমি যে বল আল্লাহ মাটি দিয়া মানুষ বানাইছে। মা শুধরে দিয়েছিলেন–বানাইছে না বানাইছেন।
–বানাইছেন, তাইলে আমগোর শইলে মাটি কই! আছে চামড়া, চামড়ার তলে মাংস, মাংসের তলে হাড্ডি!
মা তাঁর কালো ঠোঁট আরও কালো করে আনেন কুঁচকে, মোলায়েম স্বর মিলিয়ে গিয়ে ঝাঁজ কেবল–আল্লাহর মাটি কি ভাবছস যেই সেই মাটি! দুনিয়ার মাটি?
শরাফ মামা প্রায়ই গায়ের চামড়ার ওপর নখের আঁচড় কেটে শাদা দাগ করে বলতেন –এইযে দেখ মাটি। আল্লাহ আমগোরে মাটি দিয়া বানাইছে।
