বড় মামার লেখাপড়ার জন্য টেবিল চেয়ার এল বাড়িতে, মা’র জন্য এল না। বড়মামার জন্য গোপনে আঙুর আনতেন নানা, কমলা আনতেন। পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে রেখে ওসব খেতেন তিনি, একটি আঙুরের দানাও মা’কে দেননি কখনও। সেই কুচুটে ছেলেটির বইখাতা, জামা কাপড় গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব ছিল মা’র ওপর। টেবিলে কোথাও কালির দাগ পড়ল কি কিছু এদিক ওদিক হল, ধুমধুম কিল বসাতেন মা’র পিঠে। হঠাৎ কখন যে বড় মামা বড় হয়ে গেলেন, বড় হতে হতে আকাশ স্পর্শ করছেন তিনি আর যে মাটিতে ছিলেন মা, সে মাটিতেই রয়ে গেলেন। মা’র আজও ঈর্ষা হয়, কিন্তু ঈর্ষা কি এই মানুষটির প্রতি! মা’র মনে হয়, এ মানুষটিকে, যাকে তিনি মিয়াবাই বলে ডাকেন, আদপেই চেনেন না।
খ.
একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলে মা আবার পীরমুখো হন। পীরের অবশ্য কোথাও পালাতে হয়নি, বহাল তবিয়তে ছিলেন শহরে। দু’চারটে বিহারির সঙ্গে খাতিরও করেছিলেন, ভারত ছেড়ে মুসলমানের দেশ বলেই না এখানে এসেছেন, পাকিস্তান ভেঙে গেলে এ দেশে থাকার তাহলে কি মানে হয়! নওমহলের দশটি বাঙালি বিচ্ছুর বাড়িতে পীরের সম্মতি নিয়ে মুরিদানরা আল্লাহু আকবর বলে আগুন ধরিয়েছেন। পীরসাব ওঁদের পিঠে হাত বুলিয়ে বলেছেন, এতে কোনও দোষ নেই বান্দারা, শত্রুর কবল থেকে এ ইসলাম বাঁচানোর জেহাদ। জেহাদ সম্পর্কে মা’র ধারণা তেমন স্পষ্ট না হলেও যেহেতু তিনি পীরের মুরিদ এবং যেহেতু পীরের কোনও কথা ও কাজ নিয়ে কোনও মুরিদের সংশয় থাকা উচিত নয়, মা কোনও প্রশ্ন করেন না, যে প্রশ্নে পীরের আহত বা বিচলিত হওয়ার কোনওরকম ফাঁক থাকে। মা মাথা পেতে জেহাদ পরবর্তী যে ফতোয়া ঘোষিত হয়, তা মাথা পেতে বরণ করে শাদা থান কাপড় কিনে লম্বা লম্বা সালোয়ার কামিজ বানিয়ে ফেলেন নিজের জন্য। শাড়ি ছেড়ে এখন থেকে তাই পরবেন, পীর আমিরুল্লাহ সাফ সাফ বলে দিয়েছেন–নবীজির পত্নীরা যেরকম পোশাক পরতেন, সেরকম পোশাক পরতে হবে সব মেয়েদের। চুল বড় করা যাবে না। চুল হবে ছেলেদের মেয়েদের, বাবরি ছাট। কাঁচিতে ঘ্যাঁচ করে পাছায় পড়া লম্বা চুল, সে ফিনফিনে হোক, টাসেল বেঁধে ঘন করতেন, কেটে ফেললেন মা। ঘাড় অবদি চুল নিয়ে ঢিলে সালোয়ার কামিজ পরে মাথায় বুকে ওড়না পেঁচালেন। মা’কে দেখে আর মা বলে মনে হয় না। মন খারাপ করে বলি –এইগুলা পরছ ক্যান মা?
মা বলেন–শাড়ি আর পরতাম না। শাড়ি হিন্দুগোর পোশাক। কাফেরের পোশাক। শাড়ি পরলে গুনাহ হইব।
পীরবাড়ি থেকে যে ফতোয়াই জারি হয়, মা মাথা পেতে বরণ করেন। মা ভুলে যান তাঁর ছোটবেলার সই অমলার কথা। ভুলে যান রথের মেলা থেকে খই, খেলনা, আর পুতলা কেনার দিনগুলো, লক্ষ্মী পুজোয় সরস্বতীদের বাড়ি গিয়ে মিষ্টান্ন খাওয়া, সখীদের হাত ধরে পাড়ার পুজোমন্ডপ দেখা। মা ভুলে যান মা’কে না জানিয়ে একা একা আমি পিঠের চুল কেটে ঘাড়ে ওঠালে মা মনের ঝাল মিটিয়ে আমাকে কিলিয়ে বলেছিলেন– কি সুন্দর চুলগুলা কাইটা ভূত বানাইছস। তর চুল আমি তেল পানি দিয়া কী যত্নই না করছিলাম!
সেই মা, চোখের সামনে বদলে গেলেন। খাবার টেবিলে বসে সবাই খাচ্ছে, মা থালায় খাবার বেড়ে টেবিল ছেড়ে মেঝেয় বসে, নয়ত বিছানায়, হাতে থাল, খান। কেন, কী ব্যাপার? মা বলেন–টেবিল চেয়ারে বইসা খাওয়া হারাম। ইহুদি নাছারারা টেবিল চেয়ারে বইসা খায়।
পুরো পাড়ায় দু’তিনঘর মুসলমান, বাকি সব হিন্দু। বারো মাসে তেরো পুজো লেগে থাকে পাড়ায়। হিন্দুরা কালো ফটক পেরিয়ে বাড়ি ঢুকে বেলপাতা চায়, পুজোয় লাগবে বলে। হ্যাঁ বলে দিই, ওরা গাছে উঠে বেলপাতা পেড়ে নেয়। ফটকের ওপর পেঁচিয়ে থাকা মাধবীলতা গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে নেয়। পাতার তলে কেউ কেউ দুটো তিনটে বেলও নেয়। নিক, বেল আমার বড় অপছন্দ। মা বেলের শরবত বানিয়ে মুখের কাছে ধরলে আমি নাক কুঁচকে হাত সরিয়ে দিই মা’র। মা বেলপাতা নিতে আসা অনেকের সঙ্গে ভাবও জমিয়ে ফেলেছিলেন–কি গো মেয়ে, তোমার নাম কি? কোন বাড়িতে থাকো? বাবা কি করে? ভাই বোন কজন? সেই মা পীরবাড়ি গেলেন আর বাড়ির ধারা বদলে ফেললেন। বেলপাতা নিতে আসা পাড়ার হিন্দু ছেলেমেয়েকে দূরদূর করে তাড়িয়ে আমাদের বললেন–পূজার লাইগা আর বেলপাতা দিবি না কাউরে। ওরা কাফের। ওদের পূজায় কিছু দিলে গুনাহ হইব।
আমি মন খারাপ করে বলি–ওদেরে কাফের কও ক্যান? আমি তো চিনি ওদের, ওরা ভাল মানুষ খুব।
মা তসবিহ জপতে জপতে বলেন–যারা মুসলমান না, তারা সব কাফের। হিন্দু বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব।
মা’র নাগাল থেকে নিজেকে খানিক দূরে রেখে বলি–ধর, একটা বাচ্চা আজকা জন্ম নিল, তার বাবা মা হিন্দু, নয়ত খ্রিস্টান। সে বাচ্চার কোনও হাত ছিল না কোন বাবা মার ঘরে সে জন্মাইব। সে তোমার কিম্বা মসজিদের ইমামের ঘরেও জন্মাইতে পারত। বাচ্চার তো কোনও দোষ নাই, তারে বাবা মা যা শিখাইছে তাই শিখছে, পূজা করতে, কীর্তন গাইতে, গির্জায় যাইতে, এই বাচ্চা কি দোযখে যাইব না কি বেহেসতে!
মা’র ঠোঁট নড়ে, তসবিহ গুনছেন। আমার প্রশ্নের কোনও জবাব দেন না। আমি দু’পা এগিয়ে এসে আবার বলি–কও মা, দোযখে না বেহেসতে?
মা বলেন–সে যদি মুসলমান হয়, ঈমান আনে, তাইলে বেহেসতে। তা না হইলে দোযখে।
— দোযখে? তার কি দোষ? চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করি।
সে যে জন্মাইছে বিধর্মীর ঘরে, মা চিবিয়ে চিবিয়ে বলেন, ওইটাই তার দোষ।
