বোরখার মাথাটুকু খুলে খাটে পা ঝুলিয়ে বসে যে কথা বলতে এসেছেন তিনি, বলেন, — তুমি যে সেদিন বললে আল্লাহতায়ালা বলেছেন পুরুষেরা দাসীর সঙ্গে সহবাস করতে পারে। কোন আয়াতে তুমি পেয়েছ! ভুল ভুল। আল্লাহতায়ালা দাসীর কথা বলেননি। কোরানে স্পষ্ট লেখা আছে, ক্রীতদাসীর কথা। ক্রীতদাসীর সঙ্গে সম্পর্ক বৈধ। কিন্তু, এখন তো আর ক্রীতদাসী নেই! আমরা ত আর কাজের লোককে পয়সা দিয়ে কিনে নিই না! বলে তিনি হাসেন। বিজেতার হাসি।
বড় মামা খাটে পা তুলে আসন করে কোলের ওপর বালিশ চেপে বলেন–ও এই কথা! এইডা কুনো জরুরি কথা হইল যে তুই বোরখা খুলবি না, ঠান্ডা হইয়া বইবি না, কথা কইয়াই চইলা যাইবি। তা ক ত দেখি দাসপ্রথা এহন নাই কেন! পারবি কইতে! দাসপ্রথাডা তুলল কে? তর আল্লায়? নাকি তর রসুলে? তুলছে মানুষে, বুঝলি! প্রথাডা মানুষে না তুললে, কী ছ্যাদাব্যাদা কারবার অইত, ক? আর, চিন্তা কর, ক্রীতদাসী হোক দাসী হোক, আল্লাহ কি কইরা এই বিধান দেয় যে ..
কথা শেষ না হতেই ফজলিখালা গলা চড়ান–সেই সময়ের জন্য আল্লাহ লিখেছেন। সেই সময়ে মেয়েদের নিরাপত্তা ছিল না। ক্রীতদাসীর আর কোথায় যাওয়ার জায়গা ছিল না। তাই আল্লাহতায়ালা ..
এবার, ফুললিখালার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বড় মামা বলেন–যদি মনে করস, কোরান সেই সময়ের জন্য লেখা, ভাল কথা। তাইলে কোরান সেই সময়ের জন্যই রাইখ্যা দে, এই সময়ে এইডা লইয়া নাচনের মানে কি! আর আল্লাহ খালি সেই সময়ের কথা কইছেন ক্যান! এইডাও একটা প্রশ্ন। আল্লাহ অতীতের কথা জানেন, ভবিষ্যতের কথা জানেন, সব দেখেন, সব বোঝেন তাইলে ভবিষ্যতে যে দাসপ্রথা থাকব না, এইডা লিখলেন না ক্যান! দুনিয়াতে বিজলিবাত্তি আইব, মোটর গাড়ি, উড়োজাহাজ, রকেট– রকেটে কইরা চাঁদে যাওনের খবরটাও লিখতে পারতেন। এই যুগে যেইডা চলে না, সেইডা লইয়া মাতামাতির কারণডা কি আমি বুঝি না। তগোর ডরটা এট্টু বেশি।
মুখ কালো করে উঠে পড়েন ফজলিখালা। বোরখার মাথাটুকু হাতে নিয়ে বলেন তুমি এত নিচে নেমেছ মিয়াভাই। ছি ছি ছি। তোমার মুখ দেখাও আমার পাপ। নানির চৌচালা ঘর থেকে বেরিয়ে আমাদের শোবার ঘরে এসে–বড়বু এই ঘরে একটু ঘুমাব আমি, খুব মাথা ব্যথা করছে–বলে সটান শুয়ে পড়লেন। মা ফজলিখালার জন্য পাকঘরে রাঁধতে চলে গেলেন। বিরুই চালের ভাতের সঙ্গে কবুতরের রোস্ট।
বাবার সঙ্গে বড় মামার বেশির ভাগ আলাপ হয় জমি নিয়ে। বড় মামা বলেন– ঢাকায় একটা জমি কিইনা ফালাও রজব আলী। সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। এই দামে পরে আর পাইবা না।
বাবা মাথা নেড়ে বলেন–দেখি দেখি। কিনব।
আমার খুব ইচ্ছে করে বড় মামার কাছে ঢাকার গল্প শুনি। ঢাকা কেমন দেখতে, ওখানে কি কি আছে এসব। কিন্তু তাঁকে লক্ষ করি কখনও তিনি আমার দিকে ফিরে তাকান না। তাঁর রাজকন্যাটি এখন ধুলো কাদায় মিশে আর যে রাজকন্যা নেই, সম্ভবত তাই। তবে একবার, তাও ঢাকা চলে যাওয়ার আগের দিন, তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয় সরাসরি। পায়খানায় যাওয়ার রাস্তায় আরবি লেখা একটি ছেঁড়া কাগজ কুড়িয়ে পেয়ে মা’র কাছে দিচ্ছিলাম। এরকমই নিয়ম, মা বলে দিয়েছেন হরফ চেনার পর থেকেই, যে, এই হরফের কোনও কাগজ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলে, যেহেতু সে কাগজ পবিত্র, কোনও ময়লায় না মেশে, পায়ের তলায় না পড়ে, পানিতে ফেলে দিতে। তাই করি অন্যদিন, টুকিয়ে ওতে চকাশ করে চুমু মেরে নৌকোর মত ভাসিয়ে দিই জলে। পায়খানার রাস্তায় পাওয়া কাগজটি, আমি যে লক্ষ্মী মেয়ে, মাড়িয়ে যাইনি, মা’কে তাই দেখাতে আসা আমার। মা উঠোনের দড়িতে কাপড় নাড়ছিলেন, বললেন আমার হাত বন্ধ, তর বড়মামার হাতে দে। বড় মামা ছেঁড়া টুকরোটি নিয়ে গড়গড় করে পড়ে ফেললেন। শুনে, মা তাকালেন মুগ্ধ চোখে বড়মামার দিকে। আরবি জানা মানেই তো বড় ঈমানদার হওয়া। যদিও বড়মামা শুক্রবারেও জুম্মা পড়তে মসজিদে যান না, ঈদের নামাজেও না। এতে কারও কোনও আপত্তি নেই।
বড় মামা বললেন–কি করবি এই কাগজরে!
মা’র আঁচল ধরে, খানিকটা ভর রেখে, শরীরের না হোক, মনের, বললাম–চুমা দিয়া পুস্কুনিত ফালাইয়া দিয়াম।
বড় মামা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কাগজটি, বললেন–এই লেখারে চুমা দিতাছস? কি লেখা আছে জানস এতে! লেখা আছে হালার পু, তর মায়েরে চুদি।
মা’র মুখ মুহূর্তে লাল হয়ে গেল শরমে। তাঁর ভেজা কাপড় পড়ে থাকে কাঁধে, দড়িতে নাড়া হয় না। ফুলবাহারি পানি ভরা কলস নিয়ে কলপাড় থেকে যাচ্ছে ঘরের দিকে, থমকে দাঁড়ায়। নানি মরিচ গাছে পানি ঢালছেন, হাত থেকে বদনি পড়ে উঠোন ভিজে যায়। আমি বড় মামার দিকে দু’পা এগিয়ে, চোখে অপার বিস্ময়, বলি–বড় মামা, আরবি না আল্লাহর ভাষা? এই ভাষায় গালিগালাজও লেখা হয়!
বড় মামা খড়ম পায়ে ঠকঠক শব্দে হাঁটেন আর বলেন–হইব না ক্যান! আরবি আরবগোর ভাষা। আরবেরা মদ খায়, খারাপ কাজ করে, মানুষ খুন করে। গালিগালাজ করে। পুরুষ লুকেরা চৌদ্দটা বিয়া করে। কেউ কেউ একশটাও করে।
নানি বলেন–সিদ্দিক থাম ত।
নানির বড় ছেলে, ননীটা ছানাটা খাইয়ে মানুষ করেছেন, মাদ্রসায় পড়া, আরবি জানা, থামেন।
বড়মামার দিকে খুব সন্দোহ-চোখে তাকিয়ে থাকেন মা। তাঁর বিশ্বাস হতে চায় না এই মানুষটির সঙ্গে একদা তিনি বেড়ে উঠেছেন এই বাড়িতে, এই উঠোনে, কড়ইগাছতলায়। ইস্কুল থেকে ফিরে কোনওরকম নাকে মুখে কিছু ভাত দিয়ে দৌড়ে দু’জন চলে যেতেন নাসিরাবাদ মাদ্রাসার পুকুরে। সারা বিকেল সাঁতরে যখন জল থেকে উঠতেন, চোখ লাল। লাল চোখে বাড়ি গেলে নানির মার খেতে হবে এই ভেবে দু’জনে ঘাটের সিঁড়িতে বসে কচুপাতায় মন্ত্র-মত পড়ে চোখে বুলোতেন যেন শাদা হয়। চোখ শাদা করে ভালমানুষ সেজে বাড়ি ফিরতেন। রাস্তায় তখন দু’একটি ঘোড়ার গাড়ি চলত কেবল। গলির মোড়ে এসে মা খানিক দাঁড়াতেন, মোড়ের দোতলা বাড়িতে এক মেমসাহেব থাকতেন, তাঁকে দেখতে। বিকেলে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে মেমসাহেব হাসতেন, ধবল পা জোড়াও মেমসাহেবের হাসির সঙ্গে হাসত। বড় মামা মা’র ফ্রক ধরে টেনে গলিতে ঢোকাতেন আর বলতেন–ওরা খ্রিস্টান, ওগোর দিকে এত চাইয়া থাকলে আল্লাহ গুনাহ দিব।
