বড় মামাকে গোসল করে ঈদের জামা কাপড় পরতে তাগাদা দিয়ে লাভ নেই। হাল ছেড়ে নানি বলেন–ঈদ ত করলি না। এল্লা খাইবিও না! খাইয়া ল।
— না খাওয়ার কি আছে, খাওন দেন। গরুর গোসত ছাড়া অইন্য কিছু থাকলে দেন। বড় মামা লম্বা শ্বাস ফেলে বলেন।
চোখে জল জমছিল নানির। বড়মামা কোরবানির ঈদে গরুর মাংস খাবেন না, এ তিনি কি করে সইবেন! নানি আঁচলে চোখ মোছেন এই পণ করে যে তিনিও মাংস ছোঁবেন না। ছেলের মুখে না দিয়ে মায়েরা আবার খায় কি করে কিছু!
বড় মামার মাংস না খাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ল বাড়িতে। শুরু হল বড়দের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি। মা আমাদের পাতে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বলেন–মিয়াবাই ঈদের গোসত না খাইয়া ঢাকায় ফিইরা যাইব। গরু জবো করা নাকি তার সহ্য হয় নাই। গরুর গোসত যে বাজার থেইকা কিইনা খাওয়া হয়, হেই গোসত কি গরু না মাইরা হয়!
ঈদ শেষ হলে আবার আগের জীবনে ফিরতে হয় আমাকে। শরাফ মামা আমার সামনের সারিতে দাঁত নেই বলে গায়ে খোঁচা মেরে বলতে থাকেন–
দাঁত পড়া আনারস
গু খায় তিন কলস।
দাঁত পড়লে মা ইঁদুরের গর্তে সে দাঁত ফেলে বলেছেন–
ইন্দুর রে ইন্দুর
আমার পঁচা দাঁত নে,
তর সুন্দর দাঁত দে।
ইঁদুর তার দাঁত যতদিন আমাকে না দিচ্ছে, ততদিন আমাকে শরাফ মামার দাঁতাল হাসি দেখতে হবে। রুনু খালা অবশ্য বলেন–গু না খাইলে দাঁত উঠে না।
গু দেখলেই আমার বিবমিষা হয়। পায়খানায় বসে নিচের দিকে চাইলেই গু উপচে পড়া চারিটি দেখতে হয়, নীল মাছি ভন ভন করে ওড়ে চারির চারপাশে। নাক মুখ বন্ধ করে যত কম সময় থাকা যায়, থাকি। দাদা অবশ্য পায়খানায় গেলে দু’ ঘন্টার আগে বেরোন না। কী করে যে অত দীর্ঘ সময় ওখানে টিকে থাকেন দাদা! এদিকে বাড়িতে মেথর এলেও নাক চেপে ঘরে বসে থাকি আর থুতু ফেলি উঠোনে। মেথর মাসে একবার এসে চারির গু সরিয়ে নেয়। নানি দিব্যি মেথরের সঙ্গে দরদাম করে পয়সা দেন হাতে। রুনু খালার কথায় আমার রাগ ধরে, গু আবার খাওয়া যায় নাকি! বলেছিলাম–তোমার ত দাঁত আছে। তুমিও কি গু খাইছ রুনু খালা!
রুনু খালা দিব্যি বলে ফেলেন–হ খাইছি। ছুট বেলায়।
শরাফ মামা আমার চেয়ে আরও এক কাঠি ওপরে। ভাতের থালা ফেলে দেন উপুড় করে যদি খেতে বসে দেখেন উঠোনে মুরগি হাগছে বা কেউ উচ্চারণ করছে গু শব্দটি। শরাফ মামা খেতে বসলে একদিন ভাল মানুষের মত বলেছিলাম গু না খাইলে নাকি দাঁত ওঠে না শরাফ মামা, জানো? ব্যস, ছুটে এসে ধুম্মুর করে এক কিল বসালেন পিঠে আর ভাত সুদ্ধ থালা ইটের টুকরোর মত ছুঁড়ে দিলেন উঠোনে।
আমাকে গু খায় তিন কলস বললে আমি শরাফ মামার পিঠে কিল বসাতে পারি না। তিনি আমার বড় বলে। বড়দের গায়ে হাত তুলতে হয় না। বড়রা আমাকে যখন খুশি ন্যাংটো করে সে কথা কাউকে না বলতে বললে সে কথা বলাও যায় না। বড়রাই হয়ত, বড়রা যে কোনও এক মন খারাপ করা বিকেলে কোনও এক সুনসান ঘরে ছোটদের ন্যাংটো করে, বিশ্বাস করবে না। মাঝখান থেকে কিলচড় খেতে হবে আমাকেই। বড়দের কিলচড়কে রুখে দাঁড়ানোও যায় না, মাথা নুয়ে মেনে নিতে হয় বড়রা যা দেন, শাস্তি হলে শাস্তি, সোহাগ হলে সোহাগ। বড়রা যা করেন ভালর জন্যই, বড়রা শিখিয়েছেন। গুণি এসে টুটুমামা আর শরাফ মামার নুনুর আগা কেটে মুসলমানি করিয়ে যাওয়ার পর নতুন লুঙ্গি পরিয়ে ওঁদের বসিয়ে রাখা হয়েছিল ঘরে, হাঁটলে ওঁরা লুঙ্গির সামনেটা আঙুলে উঁচু করে পা ফাঁক করে হাঁটতেন যেন কাঁটা নুনতে ব্যথা না লাগে, দেখে হাসি পেলে দু’জনই কিলোতেন আমাকে। আমার হাসতে মানা, এমনকি ওঁদের লুঙ্গির দিকে, হাঁটার দিকে তাকানোও মানা। বড়রা, চাইলেই এঁকে দিতে পারেন আমার মানা না মানার সীমানা।
সেবার ঈদের ছুটিতে বড় মামা অনেকদিন ছিলেন। প্রায় সারাদিনই শুয়ে শুয়ে বই পড়েছেন, বিকেলে উঠোনে খড়ম পায়ে হেঁটেছেন। কখনও কখনও রাতে বাবার সঙ্গে গল্প করতে এসেছেন আমাদের ঘরে। বড়মামা ধীরে কথা বলেন, চেঁচিয়ে নয়। কারও চেঁচানো শুনলে তিনি জিভে চু চু শব্দ করেন। হাশেমমামা হঠাৎ হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠেন, পইড়া গেলাম পইড়া গেলাম। চিৎকার শুনে বাড়ির সবাই ছুটে এসে দেখেন হাশেম মামার শরীর কুয়োর ভেতরে ঝুলছে। নানি ধমকে বলেন–এই সব্বনাশা খেলা বাদ দে হাশেম। একদিন ঠিকই পইড়া যাইবি!
হাশেম মামা হাসতে হাসতে উঠে আসেন। বড় মামা বোকা চোখে তাকিয়ে থাকেন হাশেম মামার দিকে। হাঁ মুখে শব্দ উঠে আসে–এইটা কি ধরনের খেলা? এই খেলার মজাটা কি বুঝলাম না ত! হাশেম কি পাগল হইয়া গেল নাকি!
হাশেম মামা আরও একটি কাজ করেন, আমাকে বা ফেলু মামাকে মাঝে মাঝেই কুয়োর ভেতর উপুড় করে ধরে বলেন ফালাইয়া দিলাম ফালাইয়া দিলাম। আমার গলা ফাটা চিৎকার শুনে ঘর থেকে লোক বার হয়ে হাশেম মামার কান্ড দেখে। বড় মামা একই রকম বোকা চোখে তাকিয়ে থাকেন।
ফজলিখালা এর মধ্যেই একদিন আসেন, জেনেই আসেন যে বড় মামা বাড়ি আছেন। এসেই, কাউকে কি খবর কেমন আছ বলাটুকুও নেই, বড় মামাকে–তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
বড় মামা শুনে ফজলিখালার কাঁধে হাত রেখে হেসে বলেন, তর এত রাগ ক্যান? এরম ত আগে আছিলি না! বোরখা টোরখা খুল, ব। তারপর কথা ক।
ফজলিখালা হাতের নাগাল থেকে কাঁধ সরিয়ে বলেন–না, এই বাড়িতে আমি বসতে আসি নাই। যা বলার বলে চলে যাব।
