মা’কে নিচু গলায় বলি–তুমি ত মা। তুমি বেতন নিবা ক্যা?
মা ধমকে থামান আমাকে–আমার কি দিয়া চলে! আমারে দেয় কেডা? বাপে বিয়া দিছিল ডাক্তারএর সাথে, কত শখ আছিল আমার বাপের যে জামাইয়ে আমার ভাই বইনরে লেহাপড়া করাইব। কই, করাইছে কাউরে? কারও খোঁজ লয়? আমার হাত দুইডা আইজ কত দিন ধইরা খালি। মাইনষের বউগুলার শইলে কত গয়না। আমারে ফহিরনির মত রাইখা আবার আবদারের সীমা নাই, ছেলেমেয়ে দেখ, ছেলেমেয়ে মানুষ কর!
যখন আমার ছ’বছর বয়স, পীরবাড়ি থেকে খবর এনেছিলেন ফজলিখালা, দুনিয়াতে দজ্জাল বের হচ্ছে, দজ্জাল মস্ত এক রামদা নিয়ে মানুষের ঈমান পরীক্ষা করবে। যার ঈমান নেই, তাকে কুপিয়ে পাঁচ টুকরো করবে। দজ্জালের ভয়ে নানির বাড়িতে প্রায় সবাই তখন দিনে দু’বেলা কলমা পড়তে শুরু করল। দজ্জাল আজ আসে কাল আসে এরকম। দজ্জাল এসে আমাকে টুকরো করছে, এরকম স্বপ্ন দেখে প্রায়ই ঘুম ভেঙে যেত আমার। শরাফ মামা বললেন–ছোটবুর বাড়িত সবার ঈমান আছে। দজ্জাল ওগোরে কিচ্ছু করতে পারব না। মা’রও একই কথা–ফজলির আর চিন্তা নাই। ওই বাড়ির সবারই ঈমান মজবুত।
এক একটি দিন যায় আর শরাফ মামাকে, ফেলুমামাকে, মা’কে জিজ্ঞেস করি–কই, দজ্জাল ত আইল না!
মা বলেন–যে কোনও সময় আইব। তালই সাব কইছে শুনলাম দজ্জাল আওনের পরই কেয়ামত অইব।
— কেয়ামত অইলে কী হইব মা? মা’কে জিজ্ঞেস করলে — কী আর, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন–ইসরাফিল শিঙ্গায় ফুঁ দিব। পৃথিবী ধ্বংস হইয়া যাইব। আল্লাহর সৃষ্টি এই আসমান জমিন কিছুই আর থাকব না।
পৃথিবী কি করে ধ্বংস হবে তা অনুমান করে নিয়েছিলাম। আকাশ এসে চাপ দেবে পৃথিবীর ওপর, বাড়ি ঘরগুলো সব চ্যাপ্টা হয়ে যাবে, মানুষ মরতে থাকবে পিঁপড়ের মত। বিশাল বিশাল কড়ই গাছ, নিম গাছ, নারকেল গাছ, খেজুর গাছ সব মাটির তলায় ডেবে যাবে। দজ্জালের ঈমান পরীক্ষায় বাঁচলেও কেয়ামতে মরতেই হবে।
আমরা নানির বাড়ি ছাড়ার ঠিক আগে আগে, ফজলিখালা নতুন খবর নিয়ে আসেন সোনার গয়না পরা হারাম। শুনে বাড়ির মেয়েমানুষেরা যার যার সোনার গয়না খুলে রাখল। হাশেম মামার বিয়ে হয়েছে সবে। নতুন বউ গা ভরা গয়না পরে বসে থাকেন। পাড়ার বউঝিরা এসে ঘোমটা সরিয়ে বউএর মুখ দেখে যায়।
— পারুল, সোনার গয়না খুলে রাখ। শেষ জমানা চলে আসছে। এ সময় গয়না গাটি পরলে আল্লাহ গুনাহ দেবেন। বলে ফজলিখালা নিজেই হাশেম মামার বউএর গা থেকে গয়না খুলে যেন মরা ইঁদুর হাতে নিচ্ছেন এমন করে গয়নার লেজ ধরে ফেলে রাখলেন দূরে।
হাশেম মামা বলেছিলেন–ছোটবু, নতুন বউএর গা থেইকা গয়না গাটি খুলা নাকি অমঙ্গল জানতাম!
ফজলিখালা চিকন গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন–মঙ্গল অমঙ্গলের তুই কি বুঝস হাশেম! পরশু রাতে আব্বাজি নবীজিকে স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্নের মধ্যেই নবীজি বলেছেন সোনার গয়না শরীরের যে অংশে পরা থাকবে, সে সব অংশ দোযখের আগুনের পুড়বে।
নানি ফজলিখালাকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন–তর গয়নাগুলা কই রাখছস?
ফজলিখালা তসবিহ জপতে জপতে বললেন–গয়না দিয়ে কি হবে মা, ওগুলো হুমায়রার আব্বা বিক্রি করতে নিয়ে গেছে।
নানির কপালে ভাঁজ পড়েছিল দুটো।
বছর গড়ালো, পীর বাড়িতে সোনার গয়না পরা হালাল হয়ে গেছে। খোলা বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে মা’র দুঃখি মুখের দিকে তাকিয়ে বলি– সোনার গয়না পরা ত হারাম! পীর বাড়ির সবাই না সোনার গয়না পরা ছাইড়া দিছিল! মা আমার উত্তর দেন না। এমন চোখ করে তাকান যেন সত্যি সত্যি শয়তান ভর করেছে আমার ওপর। আমি নই, যা কিছুই বলছি আমি, বলছে শয়তান।
এর কিছুদিন পর, মাতৃ জুয়েলার্স থেকে বাকিতে একজোড়া অনন্ত বালা নিয়ে আসেন মা। জুয়েলার্সের মালিক বাবার বন্ধু মানুষ। মা বলে আসেন বাবাই গয়নার দাম কিস্তিতে কিস্তিতে দিয়ে দেবেন।
০৭. ধর্ম
মসজিদ থেকে শুক্রবার জুম্মার নামাজ পড়ে এলে পকেটে বাতাসা থাকত নানার। খেজুরের গুড় দিয়ে বানানো হলুদ চাকতি। জুম্মার পর মসজিদে বাতাসার দেওয়ার নিয়ম। পুকুর ঘাটের কাছে নানাকে দেখে বাড়ির ছোটরা, আমি ফেলু মামা, ছটকু ইয়াসমিন নানার কাছে দৌড়ে গিয়ে বাতাসা নিয়ে আসতাম। নানা বাড়ির ছোটদের প্রতি সদয় হলেও বড়দের প্রতি নন। আমাদের বাতাসা বিলিয়ে বাড়ি গিয়ে তিনি বড়দের হাড় মাংস জ্বালাতেন। জ্বালাতেন শব্দটিই নানি ব্যবহার করেন, যখন এই লাডি লইয়া আয়, কেডা কেডা মসজিদে যাস নাই ক। পিডাইয়া শ্যাষ কইরা ফালাইয়াম–বলে বাড়ি মাথায় তুলতেন নানা। ছেলেদের অন্তত জুম্মা পড়তে মসজিদে যেতে হবে, মেয়েদের যেহেতু মসজিদে যাওয়ার বিধান নেই, নামাজ পড়বে ঘরে। মেয়েরা ঘরের বাইরে যাক, ক্ষতি নেই, যেতে হবে বোরখা পরে। নানা জুম্মার দিন খানিকটা আলস্য করেন, এ তাঁর চিরকালের স্বভাব। মসজিদ থেকে বাড়ি ফিরে দুপুরের ভাতঘুমটি দেওয়ার আগে তাঁর হিশেব করা চাই কে কে ফাঁকি দিল, কোন ছেলে মসজিদে যায়নি এবং কোন মেয়ে বাড়িতে নেই, বাইরে সে মেয়ে বোরখা পরে গিয়েছে কি না। এত প্রশ্নে নানি অতিষ্ঠ হতেন। ঘুমিয়ে ওঠার পর নানা আবার ভাল মানুষ। লুঙ্গি কষে বেঁধে ডান হাত লুঙ্গির তলে রেখে বাঁ হাত নেড়ে নেড়ে যেন বাতাস সরাতে সরাতে, হেঁটে চলে যান নতুন বাজার। কে বাড়ি নেই, কে আছে, খোঁজ আর করেন না। বিকেলে রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলে সাত লোকের সঙ্গে কথা হবে, ওই আকর্ষণ নানাকে আর বাড়িতে রাখে না। এক নানি ছাড়া বাড়ির কোনও বয়ষ্ক মেয়ে স্বেচ্ছায় বোরখা পরেন না। রুনু খালা ঝুনু খালা বোরখা হাত ব্যাগে ভরে বাইরে বেরোন, পুকুরঘাট থেকে ছটকু বা কাউকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন নানা বাড়ি আছেন কি না, নেই জানলে তো ঢুকে গেলেন বাড়ি, আর থাকলে পড়শি কারও বাড়িতে অপেক্ষা করেন, নানা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে খবর পাঠানো হয়, খালারা বাড়ি ঢোকেন; অপেক্ষা না সইলে ব্যাগের বোরখা গায়ে চাপিয়ে আসেন।
