সাত রাত মা’র অনুপস্থিতি সহ্য করার পর বাবা দাদাকে নওমহল পাঠান মা’কে নিয়ে আসতে। মহাসমারোহে ফেরত আসার পর বাড়িতে মা’র আদর বেড়ে যায়। তাঁকে ছাড়া এ বাড়ি অচল হয়ে পড়ছে, এ কথা তিনি অনুমানে বোঝেন। বাবাকে শুনিয়ে মা আমাদের বলেন–তরা যদি নিয়মিত নামাজ পড়ছ, তাইলে তগোর সাথে আমি থাকবাম। নাইলে না। সোজা কথা।
শুনে, সোফায় হেলান দিয়ে বাবা নরম গলায় বলেন–নামাজ পড়। কোরান পড়। তুমারে কেউ বাধা দিছে? তুমার ওই পীরবাড়িতে যাইতে অয় ক্যান? পীরবাড়িতে যারা যায় না তারা কি বেহেসতে যাইব না? পোলাপানের লেখাপড়া আছে। তাদের দেখাশুনা কর না, পীরবাড়িতে রাইতদিন পইড়া থাক। নামাজ রোজা করতে হইলে সংসার ছেলেমেয়ে ফালাইয়া করতে হয় নাকি! এইসব বুদ্ধি তুমারে দেয় কে? যত্তসব ধান্দাবাজের কবলে পড়ছ!
মা রুখে ওঠেন–খবরদার ধান্দাবাজ কইবা না। আল্লাহর ওলিরে তুমি ধান্দাবাজ কও? এত বড় সাহস! তুমার জিববা খইসা পড়ব কইলাম। তুমার মত কাফেরের সাথে আমার কুনো সম্পর্ক নাই। আমার জীবন তুমি ছারখার কইরা দিছ। এই সময় যদি আমারে ফজলি আইসা আল্লাহর পথে না নিয়া যাইত, আমি ত সিনেমা হলে উল্টা সেন্ডেল পইরা দৌড়াইতাম। আমি অন্ধ আছিলাম, আল্লাহর পথে গিয়া এহন আমার চোখ খুলছে। এই মায়া মহব্বত সব মিথ্যা। এহন আমি বুঝি দুনিয়াদারিতে ডুবলে সব্বনাশ। আখেরাত আমারে পার করব কে? কেউ না। স্বামী সংসার ছেলে মেয়ে কেউ আপন না। এক আল্লাহই আপন।
ফজলিখালা মা’কে বলেছেন–বেনামাজির সাথে ঘর করলে তোমার গুনাহ হবে বড়বু। দুলাভাই নামাজ পড়েন না, যারা নামাজ পড়ে না, তারা কাফের। আর কাফেরের সাথে যারা ওঠাবসা করে, তাদেরও আল্লাহতায়ালা কাফেরের সঙ্গে দোযখের আগুনে পোড়াবেন।
মা দোযখের আগুনে পুড়তে চান না। এই সংসারদাহে তিনি যথেষ্ট পুড়েছেন আর নয়। মা’র হাতে তসবিহর গোটা দ্রুত নড়তে থাকে। মা’র ঠোঁটও তালে তালে নড়ে, সাল্লিআলা সাইয়াদেনা মহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। অন্ধকার ঘরে তসবিহর গোটাগুলো বেড়ালের চোখের মত জ্বলে। মা জেগে থাকেন সারারাত, সারারাত জায়নামাজে।
মধ্যরাতে মা’র কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। বালিশ থেকে মাথা তুলে বলি– মা কান্দো ক্যান?
মা উত্তর দেন না। কেঁদেই চলেন।
— মা ঘুমাইবা না? বিছনাত আসো। মা’কে বলি।
মা কান্না থামান না, ঘুমোতেও আসেন না।
ভোরে ফজরের নামাজ শেষ করে বিছানায় আসেন। সকালে মা’কে জিজ্ঞেস করি– রাইতে কানতাছিলা কেন মা?
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দেন–কবরের আযাবের কথা ভাইবা কানতাছিলাম। ফেরেসতা যহন সাওয়াল জিগাস করব, কি উত্তর আমি দিব! কবরে দুইদিকের মাটি এমন চাপা দিব, এমন চাপা, যে—- মা’র কণ্ঠ বুজে আসে।
মা’কে বেঁধে রাখা যাবে না এ যেমন আমরাও বুঝেছি, বাবাও। তিনি আর কালো ফটক তালা দেওয়ার ঝুঁকি নিলেন না। ফটক খোলা থাক, মা যখন খুশি বাড়ি ফিরুন, তবু ফিরুন। আমার ধারণা, বাবা এই যে মা’র বাড়ি ফেরা চান, সে মা’র প্রতি ভালবাসায় নয়, মা যেন আমাদের গতিবিধি নজর রাখেন, কোনও দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সে কারণে। এর মধ্যে আমার আরবির মাস্টার, মা’র ছোটবেলার সুলতান ওস্তাতজি, মারা যাওয়ার খবর এলে বাবা বলে দিলেন আর আরবি পড়তে হবে না, ইস্কুলের পড়ালেখা কর মন দিয়ে।
মা’র চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে শুনে। তিনি আল্লাহর কাছে সেজদায় পড়ে কাঁদেন– আমার ছেলেমেয়েদের তুমি ঈমানদার কর আল্লাহ। ওদেরে তুমি কবরের আযাব থেইকা মুক্তি দাও। ওদেরে তুমি দোযখের আগুন থেইকা বাঁচাও, বেহেসত নসীব কর। তুমি ক্ষমাশীল। তুমি দীন দুনিয়ার মালিক আল্লাহ। তুমি পরওয়ারদিগার।
মা গাছের নারকেল, পেয়ারা, আম, জাম, কাঁঠাল বোরখার তলে করে নিয়ে যেতে থাকেন পীরবাড়ির লোকদের খাওয়াতে। পাকঘরে যাওয়া প্রায়ই ছেড়েই দিয়েছিলেন, নতুন করে আবার যাওয়া শুরু করেন, খোঁয়াড়ের কচি মুরগি ধরে জবাই করে নিজে হাতে তেলে মশলায় রেঁধে বাটি ভরে নিয়ে কালো ফটক পার হন নিঃশব্দে। পীরকে খেতে দেবেন। পুরোনো দু’চারটে শাড়িও নেন, ফজলিখালা কাঁথা বানানোর জন্য চেয়েছেন। হুজুর কথা দিয়েছেন মা’র কবরে এসে ফেরেসতা যখন সাওয়াল জিজ্ঞেস করবেন, সেই জবাবের উত্তর, হুজুর নিজে দেবেন। শিগরি তিনি গাউছুল আজম হচ্ছেন। গাউছুল আজমকে আল্লাহতায়ালা নিজের গোপন তথ্য জানান। স্বপ্নে এ সুসংবাদ হুজুর পেয়েছেন। মা’র বড় সাধ একবার আল্লাহর দেখা পেতে। তার মত পাপীকে আল্লাহ কি আর দেখা দেবেন! মা’র চোখে জল জমে। বোরখার তলে এক হাতে ধরে রাখেন মুরগির মাংস ভরা বাটি, আরেক হাতে চোখের জল মোছেন!
এক রাতে পীর বাড়ি থেকে ফিরে এসে বোরখা খুলতে খুলতে মা বিড়বিড় করেন বলেন–হুমায়রা আল্লাহু লেহা একটা সোনার লকেট বানাইছে। তিন ভরি দিয়া ছয়টা চুরিও বানাইছে। আমারে কি কেউ দেয় কিছু? আমার মত নিঃস্ব ত আর কেউ নাই দুনিয়ায়।
বোরখা খুলে মা চেঁচিয়ে মণিকে ডাকেন ভাত দিতে।
ভাত দেওয়ার পর ঠান্ডা ভাত দেস কেন? গরম ভাত নাই! আমারে কি পাইছস তরা? আমি মইরা গেলে তগোর সবার শান্তি। আমি কি বুঝি না? কেডা আমারে কি দেয় এই সংসারে! কিচ্ছু না। ভালা একটা কাপড় নাই পিন্দনের। কেডা দেহে? বলে মা থাল ঠেলে উঠে যান !
মণি ভাতের থালা নিয়ে পাকঘরে চলে যায় গরম করতে। মা আমার পড়ার টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে বলেন যেন বাবা ঘরে বসেই শুনতে পান–মাইনষে তাগোর বউরে সোনা দিয়া মুড়াইয়া রাখে। আর আমি কি পাই! এই বাড়িতে দারোয়ান গিরি করনের লাইগা আমারে রাখা হইছে। মানসে ত দারোয়ানরেও বেতন দেয়। আমি ত বেতন ছাড়া কাম করতাছি এই বাড়িত!
