নানা এক বড়মামাকেই মাদ্রাসায় পড়িয়েছেন, বাকি ছেলেমেয়েদের ইস্কুল কলেজে। নানার কড়া আদেশ ছিল, অবশ্য কেবল ছেলেদের বেলায়, বিদ্যা অমূল্য ধন, পড়ালেখায় যেন গাফিলতি না হয় কারও। মেয়েদের বেলায় মাইয়া মানষের অত নেকাপড়া করন লাগব না। রুনু খালা বিএ অবদি পড়েছেন, নানা ক’দিন পরপরই তাঁর বিয়ের ঘর আনেন, রুনু খালা মুখে ধুলো কালি মেখে চুল উস্কোখুস্কো বানিয়ে ছেলে পক্ষের সামনে আসেন যেন কারও তাঁকে পছন্দ না হয়। সুলেখার মা প্রায়ই নানির খাটে বসে শাদা পাতা মুখে পুরে বলেন–রুনুরে কি বাড়ির খুঁডি বানাইবাইন? বিয়া দেইন না কেন এহনও? ঈদুন আর ফজলির ত কি সুন্দর বিয়া হইয়া গেল।
নানি পানের খিলি বানাতে বানাতে বলেন–লেহাপড়া আরও করুক। নিজে চাকরি বাকরি করব। বিয়া পরে বইব নে। আইজকাইলকার যুগে মেয়েগোরেও টেকা কামাইতে অইব। জামাইয়ের উপরে নির্ভর থাহন ভালা না, কহন কি অয়, ঠিক আছে!
ঝুনু খালা ফর্সা বলে তাঁর বিয়ের ঘর আসে বেশি। নানি কড়া গলায় বলে দেন– মেয়ে আরও লেহাপড়া করব। এত তাড়াতাড়ি বিয়া কিয়ের! আর বড় বইনের বিয়া না হইলে ছুডু বইনের আবার বিয়া অয় কেমনে!
বড় মামা মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ভাষায় এম এ পড়ে ঢাকাতেই একটি চাকরি জুটিয়ে নিয়েছেন। শাদা বউটি তাঁর সঙ্গে থাকেন। আজও কোনও ছেলেপুলে হয়নি। লোকে বলে শাদা হইলে কী হইব, বউ ত বাঁজা। বউএর মাজায় বাঁধার জন্য পাড়ার লোকেরা অনেক তাবিজ কবজ নিয়ে এসে বড় মামাকে দেন। লোক চলে গেলে ওসব তিনি ছুঁড়ে ফেলে দেন কুয়োয়। বড় মামা ছুটিছাটায় বাড়ি আসেন, কখনও বউ নিয়ে, কখনও একাই। এ বাড়িতে এসে তিনি পায়ে খড়ম পরে যখন উঠোনে হাঁটেন, মনে হয় না যে কেবল ক’ সপ্তাহের জন্য তিনি এসেছেন, মনে হয় হাজার বছর ধরে এখানেই ছিলেন তিনি।
হাশেম মামা ইস্কুল কামাই করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বেড়াতেন। মেট্রিক পরীক্ষায় দু’তিনবার ফেল দিয়ে আর পড়ালেখা করেননি। ঝুনু খালাকে বড় মামা ঢাকায় নিয়ে ইডেন কলেজে ভর্তি করে দেবেন, এ রকম সিদ্ধান্ত। বাকিরা, ফকরুল, টুটু, শরাফ, ফেলু ইস্কুলের পড়ালেখাও যেমন আধাখেচড়া, নামাজ রোজাতেও। বন্ধু বাড়ছে, আড্ডা বাড়ছে। রাত করে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফেরেন, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে টুটু মামা সিগারেট ধরেছেন। নানা সবকটিকে প্রায়ই থামে বেঁধে পেটান। গাধা পিটিয়ে মানুষ করার মত। মানুষ হওয়ার লক্ষণ তবু কারও মধ্যে নেই। পরীক্ষায় ভাল ফল করছেন না কেউ। বড় মামার সঙ্গে পরামর্শ করেন নানি, এদেরও এক এক করে ঢাকায় নিয়ে ইস্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে, অন্তত মানুষ হবে।
ছেলেমেয়েরাও না আবার লেখাপড়া না করে বাউন্ডুলে হয়ে যায় এই দুশ্চিন্তায় নানির যখন চুল পাকতে বসেছে, নানা ঘোষণা করলেন তিনি হজ্বে যাবেন। হজ্বে যাওয়ার টেকা পাইবেন কই? নানি ক্ষেপে গেলেন! টেকা আল্লাহই দিব! নানার হেঁয়ালি উত্তর। টাকা শেষ অবদি আল্লাহ দেননি, দিয়েছিলেন বাবা। কথা, নানা হজ্ব থেকে ফিরে এসে সে টাকা শোধ করে দেবেন। বড় এক টিনের সুটকেসে কাপড় চোপড় মুড়িমুড়কি ভরে সুটকেসের গায়ে শাদা কালিতে মোহাম্মদ মনিরুদ্দিন আহমেদ, ঠিকানা আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার, ময়মনসিংহ লিখিয়ে যে বছর নানা জাহাজে করে হজ্বে চলে গেলেন, সে বছরই নীল আর্মস্টং চাঁদে গেলেন। নানা হজ্বে, নীল আর্মস্টং চাঁদে।
চাঁদ নিয়ে বাড়ির সবারই আবেগ প্রচন্ড। বাচ্চা কোলে নিয়ে উঠোনে চাঁদনি রাতে মায়েরা গান করেন আয় আয় চাঁদ মামা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা। চাঁদনি নামলে উঠোনে বসে কিচ্ছা শোনা চাই সবার। কানা মামুর কিচ্ছাই, বাড়ির লোকেরা বলে জমে খুব। রুনুখালা গান করেন আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে। ঈদের আগে চাঁদ দেখার ধুম পড়ে, চাঁদ দেখতে পেলে নানি বলেন–আসসালামু আলায়কুম।
সেবারও বলেছেন, আর ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসা বড় মামা নানিকে ফস করে বললেন–মা, নীল আর্মস্ট্রং পেশাব কইরা আইছে চান্দে। খ্রিস্টানের পেশাব পড়া চান্দেরে সালাম দেন ক্যা?
ফজলি খালার জ্বিন ছাড়ানো হলে, পেট খারাপ করলে, গায়ে জ্বর জ্বর লাগলে আর মাথাব্যথা হলে বাপের বাড়ি গিয়ে ক’দিন থাকার অনুমতি পান আব্বাজির কাছ থেকে। সেবার ফজলিখালা এসেছিলেন মাথাব্যথার কারণে, বড় মামার মন্তব্য শুনে বললেন– আব্বাজি বলেছেন আসলে চাঁদে কেউ যায়নি। আল্লাহই চাঁদ সূর্য্যর স্রষ্টা। আল্লাহতায়ালা চাঁদ সুর্যকে উদয় করেন, অস্ত যাওয়ান। চাঁদ পবিত্র, চাঁদ দেখে মুসলমান ঈদ করে, রোজা করে। চাঁদে মানুষ গেছে, এসব খিস্টানদের রটনা।
বড় মামা ঠা ঠা করে হেসে বলেন–ফজলি, তরে ত আমি ছোডবেলায় বিজ্ঞান পড়াইছিলাম। পড়াই নাই পৃথিবী কি কইরা সৃষ্টি হইল! সব ভুইলা গেছস?
ফজলিখালা কুয়ো থেকে অযু করার পানি তুলতে তুলতে বললেন–বিজ্ঞানীরা কি আল্লাহর চেয়ে বেশি জ্ঞানী? কি বলতে চাও তুমি মিয়াভাই! আল্লাহ যা বলেছেন তাই সত্য, বাকি সব মিথ্যা।
পানি ভরা বালতি উঠোনে নামিয়ে তিনি আবার বলেন–তরে ত আর জিনে আছড় করে না, করে তর শ্বশুরে!
আমি ঠিক বুঝে পাই না কার কথা সত্য। বড়মামার নাকি ফজলিখালার! এ বাড়িতে দু’পক্ষেরই আদর বেশি। বড়মামা বাড়ি এলে যেমন পোলাও মাংস রান্না হয়, ফজলিখালা এলে তা না হলেও তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোক এলে এলাহি কারবার শুরু হয়। বড়মামাকে যেমন দূরের মানুষ মনে হয়, ফজলিখালাকেও, তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকদের তো আরও। ওঁরা বেড়াতে এলে আমার মত রোদে পোড়া নাক বেয়ে সর্দি ঝরা মেয়ের চলাচলের সীমানা কুয়োর পাড় পর্যন্ত। কুয়োর পাড় ছাড়ালেই নানি বলেন–এইদিকে ঘূরঘুর করিস না। মেমান গেলে পরে আইস। দূরে দাঁড়িয়ে দেখতাম ঘরের বিছানায় তোষক যা গুটিয়ে রাখা হয় দিনের বেলা সেটি পেতে দিয়েছেন নানি, তার ওপর নতুন চাদর, ওতে বসে ফজলিখালার শ্বশুর আর স্বামী খাচ্ছেন। নানি পাকঘর থেকে গরম গরম তরকারি বাটি ভরে দিয়ে আসছেন, ফজলিখালা ঘোমটা লম্বা করে বাটি থেকে তরকারি তুলে দিচ্ছেন ওঁদের পাতে। ওদের খাওয়া শেষ হলে ওঁরা পান চিবোতে চিবোতে বিছানায় গড়াতেন। খেতে বসতেন ফজলিখালা, তাঁর শাশুড়ি, ননদ, মেয়েরা, হুমায়রা, সুফায়রা, মুবাশ্বেরা। নানি খেতেন সবার পরে, মেহমান চলে গেলে, বাড়ির লোকদের খাইয়ে। তখন আমার সীমান্ত খুলে যেত। আমাদের আর নানির উঠোনের মাঝখানে যে কুয়োর বেড়া, তা আমি অনায়াসে ডিঙোতে পারি।
