আমার খেলা মাটি করে সারা বিকেল কোরান পড়িয়ে মা বেশ ধীরে, গম্ভীর গলায় দাদাকে সামনে পেয়ে বলেন–নোমান, তুই নামাজ শুরু করছ নাই?
দাদা হেসে জবাব দেন–হ মা। শুরু করাম।
— তরা যদি নামাজ রোজা না করস, তগোরে শেষ বারের মত জানাইয়া দিতাছি আমারে তরা পাইবি না। আমি যেদিকে খুশি চইলা যাইয়াম।
হুমকি শুনে দাদা বারান্দার চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে একগাল হেসে বলেন — বিশ্বাস করেন মা। কসম কাইটা কইতাছি নামাজ শুরু করাম। আপনে যাইয়েন না।
আমি বারান্দায় এসে বড় শ্বাস নিই। খেলার মাঠখানা খাঁ খাঁ করে। মাঠ থেকে দমকা হাওয়া উড়ে এসে সোজা বুকের ভেতরে ঢুকে হু হু, হু হু করে।
সপ্তাহ গেলে মা আবার পাড়েন কথা–তুই যে নামাজ শুরু করবি কইলি। কই!
— এই তো মা, শুক্রবার থেইকাই শুরু করাম। দাদা গম্ভীর স্বরে বলেন।
শুক্রবার এলে দাদাকে বলেন মা–যা মসজিদে যা, জুম্মা পইড়া আয়।
দাদা ঘাড় চুলকে বলেন–শইলডা ভাল লাগতাছে না। সামনের শুক্রবার থেইকা আল্লাহর নাম নিয়া যা থাকে কপালে শুরু করামই করাম।
শুনে মা খুশি হন। বলেন–কলমাগুলা শিখাইছিলাম মনে আছে?
— তা মনে থাকব না ক্যান? কি যে কন মা, কলমা মনে না থাকলে তো মুসলমানই না।
মা খাবার টেবিলে দাদার পাতে মুরগির রান তুলে দেন। দাদা কলমা মুখস্ত রেখেছেন, সামনের শুক্রবার থেকে নামাজ ধরবেন।
সামনের শুক্রবারে দাদার উত্তর–আল্লাহর হুকুম ছাড়া গাছের পাতা লড়ে না। আল্লাহ হও কইলে হয় সব। আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারও কিছু করার শক্তি নাই। আল্লাহর হুকুম ছাড়া আমি পড়ি কেমনে নামাজ! আল্লাহ আমারে দিয়া নামাজ পড়াইতাছেন না। আল্লাহ না শুরু করাইলে আমি কেমনে শুরু করি। আমার কি কোনও শক্তি আছে শুরু করার!
আমি যদি কই আমার শক্তি আছে, তাইলে তো শেরক করা হইয়া গেল। লা শরিকা লাহু। আল্লাহর কোন শরিক নাই। আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। দাদা সুর করে মারফতি গান গেয়ে ওঠেন–আল্লায় যেমনে নাচায় তেমনে নাচি, পুতুলের কি দোষ?
দাদার ওপর হাল ছেড়ে দিয়ে আমাকে নাগালের মধ্যে পেয়ে মা জিজ্ঞেস করেন — এই তুই নামাজ পড়ছস?
— বাবা কইছে আমারে ইস্কুলের পড়া পড়তে। আমি দৌড়ে যেতে যেতে পড়ার টেবিলের দিকে, বলি।
— নাক টিপলে এহনো দুধ বাইড়ব, ত্যাড়া ত্যাড়া কথা কওয়া শিখছস। যেমন বাপ, তেমন তার পোলাপান। আল্লাহ খোদা মানে না। তগোরে দিয়া আল্লাহ ভাল কাম করাইবেন কেমনে, তগোর উপরে তো শয়তান ভর করছে। শয়তানে তগোরে আল্লাহর নাম লইতে দেয় না। ইবলিশের দোসর হইছস।
মা হাউমাউ করে হঠাৎ কেঁদে উঠে বলেন–এই বাড়িতে শয়তান ঢুকছে। সব কয়টা কাফের হইয়া গেছে। ছেলেমেয়েদের উপরে ভরসা আছিল আমার। এরা নষ্ট হইয়া গেছে। আল্লাহ তুমি আমারে এদের কাছ থেইকা দূরে সরাইয়া নেও।
আল্লাহতায়ালা মা’র কথা রাখেন না। মা’কে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরান না। মা আমাদের দেয়াল ঘেরা বাড়িটিতে, ফুল ফলে ছাওয়া অবকাশে থেকেই যান। বাবার হুমকিও বিশেষ কাজে আসে না। মা নিয়মিত নওমহলে মিষ্টির দোকানের পেছনে আমিরুল্লাহর বাড়ি যেতে থাকেন। বৃহষ্পতিবার রাতের মজলিশে হাদিস কোরানের ব্যাখ্যা শুনে কেঁদে কেটে চোখ ফুলিয়ে বাড়ি ফেরেন। মা’র বিশ্বাস কেয়ামতের আর বেশি দিন নেই, তড়িঘড়ি তাই আখেরাতের সম্বল করতে হবে। মা’র বিশ্বাস পীর আমিরুল্লাহ আল্লাহর কাছে তদবির করে মা’র জন্য একখানা বেহেসতের টিকিট নেবেন। আমিরুল্লাহ ইঙ্গিতে মা’কে তাই বুঝিয়েছেন।
ছেলেমেয়েকে আল্লাহর পথে আনার হাল একরকম ছেড়ে দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন মা। ছেলেমেয়ে দুনিয়াদারির লেখাপড়া শিখেছে, শয়তান ওদের বে-নামাজি বানাচ্ছে। নিজের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবেন মা। আখেরাতের ময়দানে সবাই ইয়া নবসি ইয়া নবসি করবে। কারও দিকেও কারওর ফিরে তাকানোর সময় থাকবে না।
আল্লাহর পথে মা গেছেন ঠিকই, কিন্তু এ পথ প্রথম যেরকম মনে হয়েছিল, মোটে সস্তার পথ নয়। মা’কে আমিরুল্লাহ খানিকটা আভাস দিয়েছেন যে, মানুষকে বেহেসতের পথ দেখিয়ে নিতে গেলে পথে নানান বাধা বিপত্তিতে পড়তে হয়, পথ সুগম করতে হলে কড়ি দরকার হয়। কড়ি ছাড়া নবীজিও পথ চলতে পারেননি। টাকাকড়ি যা ঢালা হয় পথের উদ্দেশে, তার একটি নাম আছে, হাদিয়া। মা’র জন্য হাদিয়া যোগাড় করা খানিকটা মুশকিলের। টুকরো সদাইপাতির জন্যও এখন আর টাকা পয়সা পড়ে না মা’র হাতে। যা কিছু কেনেন, বাবা নিজেই। এ বাড়িতে আসার পর মা’র অলকা সিনেমা হল যেমন, আমার ইস্কুল যেমন বাড়ির কাছে, বাবার তাজ ফার্মেসি, যেখানে বসে বিকেলে রোগী দেখেন সেটিও কাছে, প্রায় ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। আমপট্টি নয়ত দুর্গাবাড়ির বাজার থেকে বাবা নিজে হাতে সদাই কিনে বাড়ি আসেন। মা’র গলায় সোনার মালা গলাতেই ছিল বলে চোর হাতাতে পারেনি। মাতৃ জুয়েলার্স হাঁটা পথ বাড়ি থেকে, মা এক দুপুরে মালাটি বিক্রি করে টাকা দিয়ে আসেন পীরবাড়িতে, পীরের হাদিয়া। ভাঁড়ার ঘর থেকে চাল ডাল তেল সরিয়ে পীর বাড়িতে দিয়েও একরকম স্বস্তি হয় মা’র, যে, একেবারে খালি হাতে তিনি কোরান হাদিস শুনতে আসেন না।
বাবা হাতখরচ বন্ধ করে দেওয়ার পর রিক্সাভাড়াও আজকাল মা’র মেলে না। মা হেঁটে হলেও পীর বাড়িতে যান, পীর বাড়িতে যাওয়া তাঁর চাইই। আমার জ্বর হল কি, দাদার পা ভাঙল কি ইয়াসমিন গাছ থেকে পড়ে মাথা ভাঙল, মা তাঁর যাত্রা বন্ধ করেন না। কেবল বৃহষ্পতিবারের মজলিশে নয়, ইস্কুল থেকে ফিরে সোমবার, মঙ্গলবারেও দেখি মা নেই। মা কোথায়? পীরবাড়ি। মা আমাদের প্রতিদিনকার খুঁটিনাটি ঘটনায় দিন দিন অনুপস্থিত থাকেন। বাবার অস্থিরতা বাড়তে থাকে। দিনে তিনি দু’বেলা বাড়ি এসে খোঁজ নেন বাড়িঘর সংসার সব হাওয়ায় উবে গেছে নাকি আছে। বাবা ভাঁড়ার ঘরে তালা দেন, কালো ফটকেও, রাত ন’টার পর। এসব মা’কে আরও বেশি উন্মাদ করে তোলে। তিনি ভাবেন শয়তান তাঁকে প্রাণপণ বাধা দিচ্ছে আল্লাহর পথে, তিনি আরও পণ করে আল্লাহর ধ্যানে বসেন, আমিরুল্লাহ পীরের খেদমতে প্রাণমন উজাড় করে দেন। বাড়ির কালো ফটক বন্ধ পেয়ে তিনি ফিরে যেতে থাকেন পীর বাড়িতে। মা’র উপস্থিতি রাতেও কমতে থাকে।
