মা ফোঁসেন জায়নামাজে বসে। মেয়ে নামাজ পড়ছে, আর একে ডেকে নিয়ে দুনিয়াদারির পড়ায় বসানো! মেয়েকেও নিজের মত কাফের বানানোর ইচ্ছে কি না! হুজুর মা’কে বলেছেন মাথা ঠান্ডা রাখবে হামিমা। পীর বাড়িতে মা’র নতুন নাম দেওয়া হয়েছে, ঈদুল ওয়ারা বেগম পাল্টে হামিমা রহমান। যারাই যায়, বয়স যার যতই হোক, সবারই নাম বদল করেন পীরসাব। রেনুর নাম এখন নাজিয়া, হাসনার নাম মুতাশ্বেমা, রুবির নাম মাদেহা। হামিমা এখন পীরসাবের কথামত মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করেন। মা আর কতটুকুনই বা ঠান্ডা করতে পারেন মাথা! ঠান্ডারও তো একটা সীমা আছে। ছেলে মেয়েদের তো আর বাবা বিয়োননি, সে কাজটি মা করেছেন। ছেলে মেয়েদের ওপর তাঁর অধিকার যদি তিল পরিমাণ না থাকে তবে আর এ বাড়িতে থাকার তাঁর মানে কী!
বাবা কাপড় পাল্টে পেটের ওপর লুঙ্গির শক্ত গিঁট দিয়ে আমার পড়ার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে বলেন–আমার কথামত না চললে বাড়ি থেইকা বার হইয়া যা। থাকস ক্যান? আমার খাস, আমার পরস, আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন কইরা এই বাড়িত থাকতে হইব। আর তা না হইলে যা, বাড়ি বাড়ি গিয়া ভিক্ষা কইরা খা। যাস না ক্যান। না করি নাই ত। কাফেরের বাড়িতে থাকবি না। চইলা যাইবি। যা ।
এসব কথা মা’কে উদ্দেশ্য করে বলছেন বাবা, সে স্পষ্ট বুঝি। নামাজ পড়া সে আমার ইচ্ছেয় ঘটেনি, নামাজ ছেড়ে উঠে আসা সেও আমার ইচ্ছেয় নয়। সুতরাং বাবা মা’র এ লড়াইয়ে আমার ভূমিকা নেহাতই তুচ্ছ অনুমান করে স্বস্তি বোধ করি। বাবা ঘর ছাড়লে মা এসে ঢোকেন ঘরে, বলেন–তা চইলা ত যাইয়ামই। বাইন্ধা রাখতে পারবি আমারে তরা? ভাবছস আমার জায়গা নাই যাওয়ার। কাফেরের সাথে থাকনের চেয়ে বনে জঙ্গলে পশুর সাথে থাকা অনেক ভালা। যেদিন যাইয়াম সেইদিন বুঝবি। কাউরে ত জানাইয়া যাইতাম না। চুপ কইরা চইলা যাইয়াম। ছেলেমেয়েগুলারেও বানাইতাছে নিজের মত শয়তান। এগোর সাথে থাকলে জীবনে যা সওয়াব কামাইছি, সব যাইব আমার।
মা’র কথাগুলোও বাবাকে উদ্দেশ্য করে। কিন্তু বলাবলি সব এ ঘরে, আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁরা যেহেতু পরষ্পরের ছায়া মাড়ান না, গর্জন বর্ষণ সব আমার ঘরে এবং আমার ঘাড়ে।
মা তাঁর বাণী শেষ করে হঠাৎ আমার গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসানো চড় লাগিয়ে বলেন নামাজ থইয়া উইঠা আইছস ক্যা? আল্লাহরে ডরাস না? অত সাহস তর কোত্থেকা অইছে? শয়তান সবসময় আল্লাহর ইবাদত থেইকা মানুষেরে সরাইয়া লয়। তুইও শয়তানের ডাকে সাড়া দিয়া নামাজ অর্ধেক ফালাইয়া উইঠ্যা পড়লি। দোযখের আগুনে পুড়বি দাউ দাউ কইরা, তখন কুনো বাপ তরে বাচাইতে পারব?
চড় খেয়ে মাথা ঝিমঝিম করে আমার।
রাত পার হয়ে দিন হলে মা নতুন উদ্যমে শুরু করেন তাঁর নছিহত আমার ওপর, যেহেতু আমি জন্ম নিয়েছি এক পবিত্র দিনে। ইস্কুল থেকে ফিরলে মা ওত পেতে থাকেন, কখন খপ করে ধরে আমাকে কোরান পড়াতে বসাবেন। বিকেলে মাঠে এক ঝাঁক মেয়ে আসে গোল্লাছুট খেলতে, তাদের নিয়ে মাঠে যেই না আয়োজন করছি খেলার, মা ডাকেন। খেলা ফেলে আমাকে অযু করে কোরান শরিফ নিয়ে বসতে হয়। মাথায় ওড়না। পায়ে পাজামা। দল বসে থাকে আমার অপেক্ষায়, মাঠে। আর আমাকে তখন পড়তে হয় আলহামদুলিল্লাহ হি রাব্বিল আল আমিন আর রাহমানির রাহিম…কুলহুআল্লাহু আহাদ আল্লাহুসসামাদ ..
মা’কে বলি, গলায় অসন্তোষ–কি পড়ি, এইগুলার মানে কিছু তো জানি না।
মা ঠান্ডা গলায় বলেন–মানে জানতে হইব না। আল্লাহর কিতাব পড়লেই সওয়াব হইব।
কোরান পড়া থেকে মা এই মুক্তি দেবেন, এই আমি দৌড়ে মাঠে খেলতে যাব এরকম ভাবতে ভাবতে মা’র সঙ্গে সুর করে কলব থেকে মা যেভাবে বলেন সেভাবে কোরানের সুরাগুলো পড়ে ফেলতে ফেলতে আর ফাঁকে ফাঁকে জানালার বাইরে তাকাতে তাকাতেই দেখি হঠাৎ ঝুপ করে সন্ধে নেমে পড়েছে। মাঠে অপেক্ষা করা গোল্লাছুটের মেয়েরা যে যার বাড়ি ফিরে গেছে। গলার ভেতর জমে থাকে কষ্টের কফ। পড়া শেষে মা যেমন যেমন বলেন, কোরানের গায়ে চুমু দিয়ে রেহেল থেকে সরিয়ে তুলে রাখি আলমারির সবচেয়ে ওপরের তাকে। সকালে সুলতান ওস্তাদজি আসেন আরবি পড়াতে। তা নাকি যথেষ্ট নয়, বিকেলেও কোরান পড়া চাই। এমনিতে আরবির মাস্টার নিয়ে আমি যথেষ্ট অশান্তিতে ছিলাম। লোকটি জালালি কবুতরের গুয়ে শাদা হয়ে থাকা বারান্দায় বসে আমাকে সিফারা পড়ান। গুয়ের গন্ধে নাক কুঁচকে থাকলে কী আল্লাহর কালাম পড়তে গেলে মুখটা এত ব্যাঙের মত কইরা রাখস ক্যা? বলে মাথায় মোটা আঙুলের গিঁটে ঠং করে টোকা মারেন। আলিফ লাম যবর আল, লাম খাড়া জরর লা, ইয়াও পেশ হু–পড়তে গিয়ে লাম ইয়াও পেশ লাহু বলাতে দাড়িঅলা এক সকালে বারান্দার সিঁড়ির কাছ থেকে চমৎকার লাল নীল হলুদ রঙের পাতাবাহার গাছের শক্ত ডাল ভেঙে এনে আমাকে দাঁত খিঁচে বললেন– হাত পাত। শিক্ষকের কথা মান্য করতে হয় বলে হাত পেতেছিলাম। সপাং সপাং মেরে হাত আমার লাল করে ছেড়েছিলেন সুলতান ওস্তাদজি। এখন বিকেলেও মা’র হাতের মার খেতে হবে, কোরান পড়তে গিয়ে ঝিমোলাম কি ভুল করলাম পড়ায়, মা কান মলে দেবেন, পিঠে দুমাদুম কিল দেবেন, গালে কষে থাপ্পড় লাগাবেন। আমার নাকি মন নেই পড়ায়, মা’র ধারণা। আমার মন দুনিয়াদারির লেখাপড়ায়, খেলাধুলায়, নাচগানে। আমার কপালে দোযখ লেখা, মা স্পষ্ট বলে দেন।
