পর্দার আড়ালে কান্নার রোল ওঠে। ছেলেরা রুমালে চোখ মোছেন, কেউ কেউ হু হু করে কাঁধ ঝাকিয়ে কাঁদেন। কে জানে কার ঈমান আছে, কার নেই।
দুনিয়াদারি দিয়ে কিস্যু হবে না ভাইসব। আখেরাতের সম্বল করুন। আল্লাহর পথে আসুন। মহান পরওয়ারদিগারের ক্ষমা পেলে আপনারা কবরের আযাব থেকে বাঁচবেন, দোযখের যন্ত্রণা থেকে বাঁচবেন। দোযখের আগুন তো আর দুনিয়ার আগুন নয়, এ আগুনের চেয়ে সত্তরগুণ বেশি তার ধার।
আমি তসবিহ হাতে চুপচাপ বসে থাকি মা’র পেছনে। মা’র কান্না দেখে আমার মায়া হয়। মা’র শরীর ফুলে ফুলে ওঠে কান্নার দমকে। এত মানুষ আগুনের ভয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে, আমার অবাক লাগে। এ ঠিক বাচ্চাদের ভয় দেখানোর মত, পেটানো হবে হুমকি দিলে অনেক বাচ্চাই তো ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে। আমাকেও সম্ভবত আর সবার মত কাঁদা উচিত ভেবে আমি অপেক্ষা করতে থাকি চোখের জলের, চোখে আমার কিছুতেই জল আসে না। বরং দোযখে মানুষকে আল্লাহ যেভাবে আগুনে পোড়াবেন তার বর্ণনা শুনে আল্লাহকে বড় নিষ্ঠুর মনে হতে থাকে।
কবরের আযাব আর দোযখের দীর্ঘ বিভৎস বর্ণনার পর মোনাজাতের হাত তোলেন পীরসাব হে আল্লাহ, তুমি তোমার বান্দাদের ক্ষমা করে দাও। তাদের সব পাপ তুমি ক্ষমা কর। তুমি তো ক্ষমাশীল, তুমি মহান, তুমি পরওয়ারদিগার। তোমার পাপী বান্দাদের ক্ষমা কর, তোমার দরবারে আমি ওদের হয়ে ভিক্ষে চাইছি আল্লাহ।
হুজুরের গলার স্বর চড়ায় উঠতে থাকে, আর বান্দাদের কান্নার শব্দও তাল মিলিয়ে ওপরে ওঠে। আমি জবুথবু বসে থাকি, চোখের তারা আমার এদিক ওদিক ঘোরে। পর্দার ভেতরে বাইরে। এ এক আজব জগত বটে।
বাবা খবর পেয়েছেন মা আজকাল নিয়মিত পীরবাড়ি যান। আমিরুল্লাহ পীরের মুরিদও হয়েছেন তিনি। বাড়িতে তিনি ঘোষণা করে দিলেন এ বাড়ির কারও আর পীরবাড়ি যাওয়া চলবে না, বাবার আদেশ কেউ যদি অমান্য করে এ বাড়িতে থাকা তার চলবে না। ঘোষণা শুনে মা তাচ্ছিলউ-গলায় বললেন–আমার বাঁয় ঠ্যাঙ্গেরও ঠ্যাকা নাই এই কাফেরের বাড়িতে থাকনের। আল্লাহ খোদার নাম নাই। এই বাড়িত থাকলে আমার লাইগা বেহেসত হারাম হইয়া যাইব।
মা পীরের মুরিদ হওয়ার পর বাড়িতে আর রাঁধেন বাড়েন না। সকালে বাজারের থলে এলে মণি মা’কে জিজ্ঞেস করতে আসে কি দিয়ে কি হবে, লাউ দিয়ে মাছ নাকি কুমড়ো দিয়ে মাংস, শাক হবে কি না, ডাল পাতলা হবে নাকি ঘন। মা বলে দেন–তগোর যা খুশি রান।
মণি দিশা পায় না। মা এরকম আগে কখনও করেননি। মণি আনাজপাতি কুটে দিত, মা নিজে হাতে রান্না করতেন। এখন পুরো রান্নাবান্নার ভার মণির একা সামলাতে হবে। ভাঁড়ার ঘরের চাবিটিও মা মণির হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। মশলাপাতি, আনাজপাতি, যা খুশি মণিই বার করবে, মণিই রাঁধবে। মণিই বুঝবে কি দিয়ে কি। হঠাৎ এত স্বাধীনতা পেয়ে মণির নিজেকে বিবিসাব বিবিসাব বলে মনে হয়।
নওমহলে পানের পিচকি – কফ থুতু – মজলিশ মোনাজাতের পাট চুকিয়ে বাড়ি ফিরে মা জায়নামাজেই বসে থাকেন বেশির ভাগ সময়। নামাজ শেষে তসবিহ গোণেন। তসবিহ গোণা শেষে কোরান পড়েন সুর করে, কোরান শেষে আবার নামাজ। ফজর জোহর আসর মাগরেব এশা তো আছেই, নফল নামাজও পড়েন। সংসারে মন নেই মা’র। ছেলেমেয়ে খেলো কি না খেলো তা নিয়ে ভাবার সময়ও নেই। ধীরে, যদিও এত ধীরে কথা মা কখনও বলেন না, গম্ভীর কণ্ঠে, যদিও কণ্ঠে গাম্ভীর্য কখনও ছিল না তাঁর, বলেন–বাবারা, দুনিয়াদারির লেখাপড়ায় কোনও কাম হইব না। আখেরাতের সম্বল কর। নামাজ রোজা কর। তোমার বাপের মত কাফের হইও না। আল্লাহর নাম লও। আল্লাহই দয়াশীল, আল্লাহই তুমাদেরে ক্ষমা করবেন। কায়দা সিফারা পড়। কোরান শরিফ পড়। আমি তুমাদেরে কইতাছি, আল্লাহ আমারে দিয়া তুমাদেরে নছিহত করতাছেন। হেদায়েতের মালিক আল্লাহ। তিনি সব দেখেন, সব শুনেন। আল্লাহর হুকুম ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না।
মা’র মুখ গরমে ঝরে পড়া শুকনো পাতার মত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আবার বলেন–তুমার বাপে নামাজ পড়ে না। নামাজ যে না পড়ে সে কাফের। এই কাফেরের সংসারে আমি আছি তুমাদের লাইগা। কাফেররে রাইন্ধা বাইড়া খাওয়াইলে আমার গুনাহ হইব। তুমরা যদি আল্লাহর পথে না আসো, তাইলে আমি যেইদিকে দুইচোখ যায়, চইলা যাইয়াম। যাও মা, অযু কইরা আসো, নামাজ পড়বা।
মা আমাকে ইঙ্গিত করেন। আমার গা হিম হয়ে যায়। অযু করে মা’র সঙ্গে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে হাত দুটো খানিক বুকে রাখা, খানিক হাঁটুতে রাখা, খানিক নুয়ে থাকা, খানিক কপাল ঠেকানো মাটিতে—- এর মত অস্বস্তির কাজ আর নেই। কিন্তু মা’র আদেশ, পালন করতেই হবে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর মাকে দেখতে দমোদর নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন।
বাবা বাড়ি ফিরে আমাকে জায়নামাজে বসে থাকতে দেখে হাঁক দেন–নাসরিন, এদিকে আয়।
জায়নামাজ থেকে এক লাফে বাবার ডাকে উঠে যাই। এ এক ধরনের মুক্তি বটে। বাবার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আমি অনুমান করি অন্তত নামাজ জাতীয় জরুরি ব্যাপার নিয়ে আমি যেহেতু মগ্ন ছিলাম, খেলাধুলো বা আড্ডা জাতীয় অজরুরি ব্যাপারে নয়, সুতরাং এ যাত্রা রেহাই আমি ঠিকই পাব। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি আচমকা ঘাড় ধরে উল্টোদিকে ধাক্কা দেন, ধাক্কাটি আমাকে পড়ার টেবিলের সামনে এনে থামায়। দাঁত কটমট করে বাবা বলেন–লেখাপড়া ছাইড়া এইগুলা আবার কি শুরু করছস! মায়ের অষ্টকাডি হইছস। আল্লাহরে ডাকলে আল্লাহ ভাত দিব? নাকি নিজের ভাতের ব্যবস্থা নিজে করতে হইব। যা পড়তে ব। পড়ার টেবিল ছাইড়া উঠছস কি পিটাইয়া হাড় গুঁড়া কইরা ফালাব।
