আমিরুল্লাহকে তুষ্ট করতে কেবল মা নন, আরও যুবতী পায়ের ওপর খাড়া।
বিকেলের চা নাস্তা সেরে আমিরুল্লাহ বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই মা এবং আর সব যুবতী নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি বাঁধান কে হুজুরের বাহু নেবেন, কে পা নেবেন, কে মাথা। পায়ের প্রতি লোভ বেশি মা’র। ভাগে পা পড়লে মা’র মুখ তারাবাতির মত ঝলসে ওঠে, ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকে হাসি। পা মানে নোংরা, তোমার নোংরা জায়গায় যখন হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, তার মানে তোমার নোংরাও আমার কাছে পবিত্র। টেপাটেপির কাজ চলে দু’ঘন্টা। এরপর হুজুরের জন্য এক এক করে বাড়িয়ে দিতে থাকেন যুবতীরা কমলার রস, লেবুর শরবত, দুধের ক্ষীর। হুজুরের জন্য খাবার আসে ঝকঝকে রূপোর রেকাবি করে, রুই মাছের দোপিঁয়াজা, কচি মুরগির ঝোল, বাসমতি চালের ভাত, খেয়ে ঢেকুর তুললে তবক দেওয়া পান, হুজুরের আবার পানের বড় নেশা। মেঝেয় শীতল পাটিতে বসে পান সেজে দেন ছেলে-বউ। একটি করে পান মুখে নেন হুজুর, ছ’ সাত চিবোন দিয়ে ফক করে ফেলেন চিলমচিতে, পানের পিচকি ছিটকে পড়ে যুবতীদের গায়ে। গায়ে পড়া পিচকি জিভে চাটেন কেউ কেউ, বেশির ভাগই হুমড়ি খেয়ে পড়েন চিলমচির ওপর। কে আগে হুজুরের চিবোনো পান বা পানের রস পাবেন তাই নিয়ে কুরুক্ষেত্র বেধে যায়। কাড়াকাড়ি দেখলে আমার কেমন ভয় ধরে যায়, মা’কে দেখেছি সিনেমার টিকিট কাটতে গিয়ে এরকম কাড়াকাড়ি চুলোচুলি বাঁধাতে। অলকা হলে মেয়েদের টিকিট কাটার কোঠায় মেয়েরা যখন চুলোচুলি শেষে হাতে টিকিট নিয়ে বেরিয়ে আসে, সারা শরীর ঘামে ভেজা, ব্লাউজের বোতাম ছেঁড়া, খোঁপা খুলে চুল হয়ে আছে কেইচ্যা খাউড়ি পাগলির চুলের মত কিন্তু মুখে তারাবাতির খুশি, হাতে শক্ত করে ধরা টিকিট। মা’দের এই পানের পিচকির জন্য কাড়াকাড়ি মনে হয় যেন বেহেসতের অমৃত নিয়ে কাড়াকাড়ি। মা’র তাই মনে হয়, এ যে সে মানুষের চিবোনো পান বা পিচকি নয়, এ সেই মানুষের মুখের পান, যে মানুষের সঙ্গে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা গভীর রাতে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে চুপি চুপি কথা বলেন, যে মানুষ চোখ বুজে গড়গড় করে বলে দিতে পারেন আল্লাহতায়ালার অসীম ক্ষমতার কথা, মহানুভবতার কথা, আল্লাহতায়ালা কখন কোথায় কি বলেছেন, কী ইঙ্গিত করেছেন কাকে– সব। এমন মানুষের মুখের পান খেলে বেহেসত নিশ্চিত না হয়ে যায় না। অবশ্য আমিরুল্লাহ পীরও তাই বলেছেন ইঙ্গিতে। চোখ ছোট করে বাচ্চাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে গেলে লোকে যেমন রহস্যের হাসি হেসে বলে, তেমন করে, যে– টিকিট চাও বেহেসতের? তবে চোখ কান খোলা রাখো বান্দারা, কি করলে আল্লাহ খুশি হবেন, তা বুঝে নাও। তোমাদের আল্লাহ বুদ্ধি দিয়েছেন।
মা চিলমচি থেকে তুলে আমিরুল্লাহর মুখের পান মুখে পোরেন। আমি বসা থাকি কাড়াকাড়ির ঠিক পেছনে, একা, ভীত, শরমে মাঝে মাঝে লাল হয় মুখ আমার। বেহেসতে মা’র পেছন পেছন মা’র আঁচল ধরে পৌঁছে যাওয়া যাবে এরকম একটি বিশ্বাস কাজ করে আমার ভেতর। ফজলিখালা বসা ছিলেন কাড়াকাড়ির ডানে। তিনি শুকনো চোখে তাকাচ্ছিলেন কাড়াকাড়ির দিকে, ভাগ চাচ্ছিলেন না চিবোনো রসের। চাইবেন কেন, তাঁর, মা’র ধারণা, টিকিট কেনাই আছে, শুয়ে বসে ইহকালের সময়টুকু পার করলেই চলে। তিনি তো আর যাত্রা সিনেমায় গিয়ে পাপ কামাই করেননি। ফজলিখালা কুরুক্ষেত্রে খানিকটা উবু হয়ে মা’র কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলেন–মুখের পান কেন, আল্লাহর ওলির কফ থুতুও মাথায় নিলে সওয়াব হবে।
কথাটি মনে গাঁথে মা’র।
কফ থুতুর ব্যাপারে যাওয়ার আগে মা একশ গোটার একটি তসবিহ হাতে দিয়ে আমাকে বসিয়ে দেন দক্ষিণের ঘরের মেঝেয়। কাগজে ছাল্লাল্লাহু আলা মহাম্মাদ লিখে দিয়ে যান যেটি গুণে গুণে পড়তে হবে পাঁচশ বার, পড়লে মা বলেন সওয়াব হয়। পীর বাড়িতে মা সওয়াব কামাতে আসেন, আমারও যেন আল্লাহর পথে এসে সওয়াব কামানো হয়, মা তাই গোল্লাছুটের মাঠ থেকে তুলে এনে বসিয়ে দিয়েছেন এখানে। গোল্লাছুট থেকে ছুটে হাওয়ার রিক্সায় ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ হয়ত বেশি, কিন্তু একটি অদ্ভুত বাড়িতে যে বাড়িতে কারও খেলতে মানা, কারও উচ্চস্বরে কথা বলা মানা, যে বাড়িতে মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবদি ঢাকা কাপড় একচুল সরা মানা, সে বাড়িতে তসবিহ হাতে নিয়ে বসে থাকার চেয়ে মুতের গন্ধঅলা পেশাবখানায় খামোকা বসে থাকাও ভাল।
সন্ধের মুখে হুজুর মজলিশ বসান। মা আমাকে দক্ষিণের ঘর থেকে সাঁড়াশির মত ধরে নিয়ে যান মজলিশ ঘরে। ওড়না মাথা থেকে খসে পড়লে কনুইয়ের গুঁতো মেরে মা আমাকে সতর্ক করেন। রিক্সায় তিনি আমাকে বলে বলে নিয়ে এসেছেন যেন হুজুরকে দেখামাত্র কদমবুসি করি, যেন মাথা থেকে আমার কাপড় না সরে। হুজুরকে কদমবুসিও আমি করিনি, মাথা থেকে কাপড়ও সরেছে। মজলিশ ঘরে মেয়েদের কাতারে মা আমাকে বসিয়ে নিজে বসেন আসন গেড়ে। পর্দার আড়ালে মেয়েদের বসার নিয়ম, পর্দার বাইরে ছেলের দল। ফাঁক দিয়ে দেখি বড় বড় কিতাব সামনে নিয়ে গদিতে বসে দু’তিনটে খোলা কিতাবের ওপর ঝুঁকে পড়ে আরবি বাক্য আওড়াচ্ছেন হুজুর, শুনে শ্রোতারা আহা আহা করে ওঠেন। চশমার কাচ মুছতে মুছতে হুজুর বলেন যারা ঈমান না আনবে, ঈমান যাদের নেই, তাদের আল্লাহতায়ালা দোযখের আগুনে কি করে পুড়বেন, তা কি জানেন আপনারা? দোযখের ভয়ংকর আগুনে আপনারা পুড়বেন! সূর্য মাথার এক হাত ওপর নেমে এলে যেমন তাপ, সেরকম তাপের আগুন। আর সহস্র সাপ বিচ্ছু কামড়াবে আপনাদের! আপনাদের খেতে দেওয়া হবে ফুটোনো পানি আর পুঁজ। আল্লাহতায়ালা আপনাদের জিহবাকে টেনে আনবেন আপনাদের মাথার ওপর, কিলক দিয়ে আটকে দেবেন সেই জিহবা। আল্লাহ আপনাদের ছুঁড়ে ফেলবেন আগুনে। সেই আগুনে জ্বলবে আপনাদের শরীর, পুড়বে, কিন্তু আপনারা মরবেন না, আল্লাহ আপনাদের মারবেন না, বাঁচিয়ে রাখবেন শাস্তি পোহাতে। সাপ পেচিয়ে থাকবে আপনাদের শরীর, বিচ্ছু কামড়াবে। দুনিয়াদারির আরাম বেশিদিন নয় বান্দারা। শেষ জমানা শুরু হয়ে গেছে। দজ্জাল আসবে যে কোনও সময়। প্রস্তুত থাকুন। কেয়ামত এই আসছে আসছে। শিঙ্গা ইসরাফিলের মুখে। আল্লাহর আদেশ পেতে আর দেরি নেই।
