আমিরুল্লাহ এবার হাতের লাঠিটি শক্ত করে ধরেন। ছেলেবউ হাত পা ছোঁড়ে যেমন, তিনি লাঠিও ছোঁড়েন ছেলেবউএর পিঠে, ঘাড়ে, মাথায়। এমন মার কখনও খাননি ফজলিখালা, নানা তাঁকে এক চড় কষিয়েছিলেন পিঠে সন্ধেয় পড়তে বসে বইএর ওপর মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিলেন বলে, পরদিনই তাঁকে মিষ্টির দোকানে নিয়ে পেট ভরে পোড়াবাড়ির চমচম খাইয়েছিলেন।
ফজলিখালার মনে হয় হাড়গোড় তাঁর সব ভেঙে যাচ্ছে। তিনি কাতর স্বরে বলতে থাকেন–আর করুম না, ছাইড়া দেন আমারে।
–ছেড়ে যাবি তো! আমিরুল্লাহ হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন।
–হ। ছাইড়া যামু। সত্যি কইলাম ছাইড়া যামু।
ফজলিখালা উপুড় হয়ে পড়েন শ্বশুরের পায়ে।
–নাম কি তোর?
–শরাফত।
–থাকিস কোথায়?
–নিম গাছে।
ফজলিখালার ক্লান্ত শরীর হেলে পড়ল মেঝেয়। চোখ অনেকক্ষণ তিনি খুললেন না। হঠাৎ মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে বসলেন, সামনে শ্বশুরকে দেখে তড়িঘড়ি ঘোমটা মাথায় দিয়ে বললেন–আব্বাজি আপনি এখানে? ঘর এত অন্ধকার কেন!
ফজলিখালা উঠে সোজা কলতলায়, বলতে বলতে–আব্বাজির অযুর পানি তো এখনও দেওয়া হয়নি, বেলা কম হল নাকি! উঠোনে দাঁড়িয়ে আমিরুল্লাহ বউ ছেলে মেয়ে সবাই দেখল জিন ছেড়ে যাওয়ার পর ফজলিখালা কি করে আগের সেই ফজলিখালা হয়ে উঠলেন। সকলে হাঁফ ছাড়লেন।
শরাফত নামের জিনটি প্রায়ই আছড় করে ফজলিখালার ওপর। কিন্তু জিন ফিনের ঝামেলা না হলে তিনি বেশ আল্লাহভক্ত, শ্বশুর স্বামীর বড় বাধ্য। হি হি হি হাসেন না, ঘোমটা খসে না মাথা থেকে। মাঝে মাঝে জিন তাড়ানোর কারণে পিঠে তাঁর কালশিরে দাগ পড়ে। ফর্সা সুডোল পিঠখানায় কালো দাগ, চাঁদের গায়ে কলঙ্ক।
ফজলিখালা মা’র গা থেকে হাত সরিয়ে চোখের জল ওড়নায় মুছতে মুছতে বলেন –এটাই শান্তির পথ বড়বু, আব্বাজির মজলিশে আসো, আল্লাহ রসুলের কথা শোনো। আখেরাতে কাজ দেবে। দুনিয়াদারি আর কদিনের বল। এক পলকের।
মা দুনিয়াদারির মোহ দূর করতেই চান। বাবা যা ইচ্ছে তাই করে বেড়ালে মা’র যেন কিছু আসে না যায়, যেন আল্লাহর ধ্যানে মত্ত থেকে সব ভুলে যেতে পারেন। আব্বাজি, বুঝলে বড়বু, তোমার জন্য আল্লাহর দরবারে বললেই তুমি কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাবে, পুলসেরাত পার হয়ে যাবে তরতর করে। হাশরের ময়দানে পাল্লাখানা ভারি হওয়া চাই তো! সংসারের জালে এত জড়িয়ে গেলে কি সম্বল নিয়ে ওইপারে যাবে?
মা মাথা নাড়েন। ঠিক কথা। আখেরাতের সম্বল কিছুই নেই মা’র, মা’র তাই মনে হয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজেও আজকাল গাফিলতি হয়। কোরান শরিফের ওপর ধুলো জমছে। তাক ধেকে নামানো হয় না অনেকদিন। এ কালে সুখ হল না, পরকালেও যদি না হয়! আচমকা মা’র মনে ভয় ঢোকে।
ফজলিখালা মা’কে নছিহত করে পাঙ্গাস মাছের পেটি দিয়ে ভাত খেয়ে ঢেকুর তুলতে তুলতে কালো বোরখায় গা ঢেকে হাজিবাড়ি জঙ্গল সাফ করে বানানো শ্বশুরবাড়ি চলে যান। নওমহলে।
পরদিন থেকে বাড়িতে নাস্তার পাট চুকলেই মা বোরখা চাপান গায়ে।
কোথায়? নওমহল।
সপ্তাহ যায়। মাস যায়। মা কোথায় যাও? নওমহল।
ব্যস কারু মুখে রা নেই। আমরা চার ভাই বোন খাবার টেবিলে বা সোফায় বা বারান্দায় বসে থেকে দেখি মা আমাদের পেছন ফেলে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। নওমহলের নেশা চাপলে বাড়ির কারু সাধ্য নেই যে পথ আগলায় মা’র। এ নেশা আল্লাহর নেশা, আফিমের চেয়েও কড়া।
মাস গেলে পর মা’র মনে কী উদয় হয় কে জানে, বোরখার তলে আলুথালু শাড়ি, উড়োখুড়ো চুল, হঠাৎ মাঠে খেলতে নামা আমার বাহু ধরে হেঁচকা টেনে বলেন চল। বাড়ির বাইরে যে কোনও জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হলেই আমার ফূর্তি লাগে। ফুরফুরে হাওয়ায় রিক্সায় চড়ে বেড়ানোর আনন্দ কী বাড়িতে বসে পাব আর! ইস্কুল-ইউনিফর্মের পাজামা, যেহেতু এর বাইরে আর কোনও পাজামা নেই আমার, তখনও হাফপ্যান্ট পরার বয়স যেহেতু, পাজামার ওপর লম্বা একটি জামা পরিয়ে, ইস্কুলের ভাঁজ করা শাদা ওড়না যেটিকে বেল্টের ভেতর ঢুকিয়ে পরতে হয় ভাঁজ খুলে সেটিতে মাথা আর বুক ঢেকে, যদিও তখনও ওড়নায় বুক ঢাকার বয়স হয়নি আমার, বুকে কিছু গজায়নি যেহেতু, আমাকে রিক্সায় ওঠান মা। নিজেকে কিম্ভুত লাগে দেখতে। তবু বাড়ির বাইরে বেরোনোর সুযোগ মা’কে অমান্য করে হাতছাড়া করি না। রিক্সায় বসে সিনেমার পোস্টার দেখতে দেখতে, দোকানের সাইনবোর্ড পড়তে পড়তে আর বিচিত্র সব মানুষ দেখতে দেখতে নওমহলে পৌঁছই। এত শীর্ঘ গন্তব্যে পৌঁছতে মোটেও ইচ্ছে করে না। রিক্সা যদি দিন রাত ভরে এমন নিয়ে চলত আমাকে আরও দূরে কোথাও!
পীর আমিরুল্লাহর হাজিবাড়ির জঙ্গল সাফ করা বাড়ি আমি জানি না কবে হয়ে উঠেছে ছোটখাট এক শহর মত। বিস্তর এলাকা জুড়ে ছোট ছোট ঘর। সবচেয়ে উঁচু, দালানের, চুনকাম করা ঘরটি আমিরুল্লাহর। মা আমিরুল্লাহর মুরিদ হওয়ার পর থেকে তাঁকে তালইসাব ডাকা বাদ দিয়ে হুজুর ডাকেন, পীরসাব যে কোনও ব্যক্তি সম্পর্কের উর্ধে। এ বাড়িতে মা’র প্রথম কাজ আমিরুল্লাহকে কদমবুসি করা তিনি ঘুমিয়ে থাকুন কি খাবার খেতে থাকুন কি অযু করতে থাকুন। তাঁকে কদম বুসি করে কেবল মা’র নয় সকলেরই কাজ শুরু করতে হয়। উনুনে আগুন ধরানো, কি ফজরের নামাজে দাঁড়ানো, কি পেশাব পায়খানায় যাওয়া। যেহেতু আল্লাহতায়ালার পেয়ারা বান্দা আমিরুল্লাহ, শুধু কি পেয়ারা বান্দা, রীতিমত আল্লাহর ওলি, আল্লাহতায়ালা প্রায়ই দেখা দেন তাঁর ওলিদের, আমিরুল্লাহর সঙ্গেও প্রায়ই আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ ঘটে। অবশ্য কখন ঠিক ঘটে কেউ জানে না। মা অনুমান করেন গভীর রাতে। মা’র ধারণা কথাবার্তা ওঁরা আরবিতেই বলেন। মা’র আরও ধারণা আল্লাহর নিজের মাতৃভাষা আরবি। ভাষাটি শিখলে, মা ভাবেন, তিনি নিজেও সম্ভবত আল্লাহর সঙ্গে পরকালে দু’একটি বাক্য বিনিময় করতে পারবেন। ভাষাটি শেখার ইচ্ছে খুব মা’র। মা জিভ বেরিয়ে আসা সারমেয়র মত তাকিয়ে থাকেন আরবি জানা লোকের দিকে। মা’র জিভ থেকে লালার মত বেরিয়ে আসতে থাকে বেহেসতের লোভ। মা’র দু’চোখের পাতা আবেশে নুয়ে আসে ভেবে যে গভীর রাতে স্বয়ং আল্লাহতায়ালার সঙ্গে কথা বলেন হুজুর। আমিরুল্লাহ তুষ্ট হলে মা’র মত পাপীর প্রতি আল্লাহতায়ালা সদয় হবেন হয়ত, গুনাহ তিনি কম করেননি, পাগলের মত যাত্রা সিনেমায় দৌড়েছেন। আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন কি এই গুনাহগারকে! হুজুরকে কদমবুসি সেরে মা পীরের ঘরের মেঝেয় বসে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন। সাফ করা নালার মত দু’চোখ মা’র, পথে না আটকে গড়িয়ে কেবল নামে। গাল বেয়ে, বুক বেয়ে, শাড়িতে, ব্লাউজে নামে। গোলাপি দুটো ফোলা ঠোঁট শুকিয়ে চড়চড় করে ফজলিখালার, তিনি মা’র কাঁধে হাত রেখে ঠান্ডা গলায় বলেন–আল্লাহ কেন ক্ষমা করবেন না, তুমি আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। আল্লাহ ক্ষমাশীল! আল্লাহ মহান। তিনি তোমাকে ক্ষমা করবেনই। আল্লাহর কাছে হাত ওঠালে আল্লাহ কখনও ফেরান না।
