নানি শুনে আপত্তি করেন পর্দার আড়াল থেকে। ইশারা করেন নানাকে কাছে আসতে, ইশারা দেখেও চোখ ফিরিয়ে রাখেন নানা, জানেন পর্দার আড়ালে কি উত্তর অপেক্ষা করছে। নানি বেহিশেবি মানুষ নন, হুজুগে নাচেন না, উঠ ছেড়ি তর বিয়া লাগছে বলে মেয়েকে, ইস্কুল থেকে ফিরেছে সবে, জানে না কি হতে যাচ্ছে, ধরে বেঁধে কবুল বলাতে রাজি নন। নানির আপত্তির দিকে মোটে ফিরে না তাকিয়ে নানা জী হা জী হা বলে আমিরুল্লাহর কথায় মত দিয়ে বসলেন–তা যখন কইছেন, বিয়া অখনই করাইবেন, আপনের কথায় না করতে পারি কি! আপনে হইলেন আলেম মানুষ।
ফজলিখালাকে পাড়া খুঁজে বাড়ি এনে ঘাড় ধরে ভেতরের ঘরে একটি লাল শাড়িতে মুড়ে বসিয়ে দেওয়া হল। বড় মামা মন খারাপ করে বসেছিলেন সরতাআলু গাছের নিচে। নিজে তিনি ফজলিখালাকে পড়াতেন। আর বছর তিন পরেই মেট্রিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হতে পারতেন ফজলিখালা। আর এমন সময় হুট করে মাইয়া মানসের এত নেকাপড়া লাগব না বলে নানা বাড়ির সবার মুখে খিল এঁটে বিয়ের ব্যবস্থা করছেন। খুশিতে বাগবাগ আমিরুল্লাহ সামনে রাখা চা বিস্কুট মুখে না তুলেই সূর করে সুরা গেয়ে ছ’শ টাকার কাবিনে দু’ঘরে দু’জনের মুখে কবুল শুনলেন। নানি অগত্যা বলেছিলেন– কাবিনের টেকাটা বাড়াইতে কন।
–আরে রাখো, আলেম মানষের লগে দর কষাকষি ঠিক না। নানা ধমকে থামিয়েছেন নানিকে।
ফজলিখালার বিয়েতে লোক নেমন্তন্ন করে পোলাও মাংস খাওয়ানো দিন কয়েক পরে ধুমধাম করেই হয়। পালকি চড়ে তিনি বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুর বাড়ি চলে যান, কাঁদতে কাঁদতে। বড় মামা গলা ছেড়ে কাঁদছিলেন। বড়মামাকেও যেদিন হুট করে বেড়াতে নিয়ে যেয়ে হালিমা নামের শাদা ধবধবে ধুমসি এক গেঁয়ো মেয়েকে দিয়ে বিয়ে করিয়ে এনেছিলেন নানা, ফজলিখালার বিয়ের বছর তিন পরে, নানি কেঁদেছিলেন গলা ছেড়ে। বড় মামা ছিলেন বাড়ির সবচেয়ে লেখাপড়া জানা ছেলে। ছেলে আরও লেখাপড়া করে জজ ব্যারিস্টার হবে, নানির ইচ্ছে ছিল। বড়মামাকে বিয়ে করিয়ে আচমকা বাড়ি ওঠার পর উঠোনের সরতা আলু গাছটি নানা এক কোপে কেটে ফেলেছিলেন, শাদা বউকে আবার জ্বিনে ভূতে না ধরে। আমার অবশ্য দেখা হয়নি এসব, ঘটেছে আমার জন্মের অনেক আগে।
ফজলিখালা ছিলেন পাড়া বেড়াইন্যা মেয়ে। সারাদিন টই টই করে ঘুরতেন পাড়ায় পাড়ায়। সেই মেয়েকে মেদেনিপুরি আমিরুল্লাহ হাতে তসবিহ ধরিয়েছেন, মাথায় ঘোমটা পরিয়েছেন। বাড়ির চারদিক জুড়ে দেয়াল তুলেছেন যেন বাইরের লোকের বাড়ির বউএর দিকে চোখ না পড়ে, শ্বশুর শাশুড়ি আর স্বামীর সেবা করলেই যে আল্লাহকে খুশি করা যায় তা তিনি কিতাব খুলে পড়ে পড়ে ছেলেবউকে শুনিয়েছেন। ছেলেবউ মাথা নেড়ে জী আচ্ছা আব্বাজি বলে সবই মেনে নিয়েছেন।
ওলিআল্লাহর বাড়ি, আল্লাহতায়ালা স্বয়ং হাজিরা দেন বাড়িতে তাঁর পেয়ারা বান্দার সঙ্গে বাতচিত করতে। বাড়ির গাছে গাছে জিনও থাকে। বাড়িটিতে ঢোকার পর থেকে ফজলিখালাকে প্রায়ই জিনে ধরেছে, জিন একদিন দু’দিন থাকে, কখনও সাতদিন, আমিরুল্লাহ নিজে যখন জিন ছাড়ান ফজলিখালা ধপাশ করে পড়েন মেঝেয়, জিনেরা এভাবেই মানুষের শরীর ছেড়ে বের হয়।
জিনে ধরলে ফজলিখালা মাথার ঘোমটা ফেলে দেন, বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যান একা একা বোরখা ছাড়া, রাস্তায় এর ওর সঙ্গে হেসে হেসে হাবিজাবি কথা বলেন, নওমহলের মোড়ে নিজের স্বামীকে দেখে ফজলিখালা নাকি একদিন বলেছিলেন কি মুসা ভাই কই যাইন? বাদাম খাইবাইন।
জিন ছাড়ানো এক বিষম ব্যাপার। ফজলিখালাকে রাস্তা থেকে সাড়াশির ধরে মত টেনে আনা হয় বাড়িতে। বাড়ির সবচেয়ে অন্ধকার ঘরে তাঁকে বন্দি করে আমিরুল্লাহ লাঠি হাতে ঢোকেন সে ঘরে। প্রথমে জিজ্ঞেস করেন–কি কারণ তোমার এইসব করার? ফজলিখালা বলেন–আমার কিছু ভালা লাগে না। আমার শহর সুদ্ধা ঘুইরা বেড়াইতে ইচ্ছা করে। আমার বাদাম খাইতে, পোড়াবাড়ির চমচম খাইতে ইচ্ছা করে। হি হি হি। আসলে ফজলিখালা তো আর কথা বলেন না, বলে শরাফত নামের জিন। তাঁর শরীরের মধ্যে শরাফত বসা, যা কিছু করছে ঘোমটা খুলে, বুকের কাপড় ফেলে সব শরাফতই। বিচ্ছিরি নাচ নাচছে, লাগামছাড়া কথা বলছে, সব শরাফত। ফজলিখালা তো আর এমন বেপর্দা বেশরম হতে পারেন না।
আমিরুল্লাহ নরম স্বরে বলেন–শোন, তোমার তো আমরা কোনও ক্ষতি করিনি। তুমি কেন আমাদের এত ঝামেলা করছ বাপু। ছেড়ে যাওনা ছেলেবউকে। ছেলে বউ আমাদের কত সতীসাধ্বী। এমন আর কটা বউ হয়। এই বউকে তুমি আর জ্বালিও না বাপু। ছেড়ে যাও।
ফজলিখালা লাফিয়ে ওঠেন বিছানায়, নাচতে শুরু করেন গান গেয়ে–আয় তবে সহচরি হাতে হাতে ধরি ধরি নাচিবি ঘিরি ঘিরি গাহিবি গান।
আমিরুল্লাহ চোখ নামিয়ে নেন ছেলেবউএর উদ্বাহু নৃত্য দেখে।
–তোমাকে কি করে বিদেয় করতে সে কিন্তু আমি জানি বাপু।
আমিরুল্লাহ কঠিন স্বরে বলেন।
শুনে লাফ দিয়ে নামেন বিছানা থেকে ফজলিখালা। শাড়ি তুলে পায়ের গোড়ালির ওপর নিজেকে লাটিমের মত ঘোরান। খিলখিল হেসে বলেন–তুমি আমার কচু করবা।
আমিরুল্লাহ মুখের পেশি কঠিন হতে থাকে।
— তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।
— হ্যাঁ তাই যামু। আমার যেমন ইচ্ছা করে তাই করুম। বাধা দিবি তো তোদেরে মাইরা ফালামু কইলাম। বটি দিয়া কুবাইয়া মারুম। আমারে চিনস নাই! ফজলিখালা হাত পা ছুড়তে ছুঁড়তে বলেন।
