বাবা ডাকেন মা, ও মা।
আমাকে সাড়া দিতে হয় জী বলে।
মুরব্বীরা ডাকলে জী বলতে হয়, মা তাই শিখিয়েছেন। জী না বলে হুঁ বা কী বলে উত্তর করলে মা বলেন, নেহাত বেয়াদবি করা। আদব কায়দা আমি কম জানি বলে মা’র অবশ্য বদ্ধ ধারণা। ঈদের সকালে মুরব্বিদের পা ছুঁয়ে সালাম করতে হয় ছোটদের। সে আমার দ্বারা কিছুতে হয় না। মা ধাক্কা দিয়ে পাঠান যেন বাবার পা ছুঁই। আমি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি চৌকাঠে, তবু কারও, সে বাবা হোক মা হোক, পা ছুঁই না।
চুলগুলা জোরে টাইনা দেও। বাবা কাতর স্বরে বলেন।
বাবার মাথা ভরা ঘন কালো কোঁকড়া চুল। জোরে টানতে গিয়ে চুলের গোড়া থেকে আঙুলে উঠে আসে জমাট রক্ত। শুকিয়ে কালো বালির মত দেখতে। বাবা কি মরে যাবেন, আমার ভয় হতে থাকে। কি হবে মানুষটি চিৎ হয়ে মরে পড়ে থাকলে এই বিছানায়! আমি চুল টানতে টানতে দেখব বাবা আর শ্বাস ফেলছেন না, শিয়রের পাশে দাঁড়িয়েই থাকব দিন পার হলে রাত, বাবা আর বলবেন না অনেক হইছে মা, এইবার পড়তে বস গিয়া। লেখাপড়া কইরা মানুষের মত মানুষ হও।
চৌবাচ্চা থেকে রোদ সরে পেয়ারা গাছের মগডালে ওঠে। বাবা এরমধ্যে নাক ডাকতে থাকেন। নাক ডাকা লোকের মাথায় হাত বুলোলেই কি না বুলোলেই কি, পা টিপে টিপে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাই। দরজার বাইরে শরবতের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছেন মা। কেউ যেন শুনতে না পায় বলেন যা তর বাবারে শরবতটা দিয়া আয়।
বাবা ঘুমাইয়া পড়ছে। আমিও স্বর নামিয়ে বলি।
গ্লাসটি হাতে ধরিয়ে মা বলেন তবু রাইখা আয়, ঘুম থেইকা উইঠা খাইবনে। লেবুর শরবত তর বাবার খুব পছন্দ।
ফরমাশ খাটা মেয়ে আমি, বাবার বিছানার পাশের টেবিলে ঠান্ডা লেবুর শরবত রেখে আসি। মা’র পরনে লাল একটি ছাপা শাড়ি। হাতখোঁপা করা চুল ঢাকা ছাপা শাড়ির আঁচলে। দরজায় দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা বাবার দিকে মায়া-চোখে তাকিয়ে থেকে মা দিব্যি ঘরে গা গলিয়ে খাটের কিনারে দাঁড়িয়ে বাবার মাথার চুলে হাত বুলোতে থাকেন।
এই সুযোগে আমি লাপাত্তা। ছাদে দাঁড়িয়ে পেয়ারা চিবোতে চিবোতে প্রফুল্লদের বাড়ির উঠোনে পাড়ার মেয়েদের গোল্লাছুট খেলা দেখি। এ বাড়ির মাঠে সম্ভব নয় খেলাধুলো, অন্তত বাবা যদ্দিন বাড়িতে লাগাতার আছেন। বাবা বাড়ি থাকলে তাঁর নাগালের ভেতর থাকতে হয় বাড়ির সবাইকে। হাতের পেয়ারা তখনও শেষ কামড় পড়েনি, বাবার ডাক শুনি। দৌড়ে নিচে নেমে বাবার সামনে দাঁড়াই ফরমাশ পালন করতে। বাজখাঁই গলায় জিজ্ঞেস করেন শরবত কেডা দিছে?
মা। আমি চোখ নামিয়ে উত্তর দিই।
ক্যান দিছে? শরবত কি আমি চাইছি? বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আমার বেয়াদবির জন্য দু’গালে চড় কষাবেন এমন হাত নিশপিশ করা গা জ্বলা স্বরে বলেন।
আমি নিরুত্তর।
শরবত নিয়া উঠানে ফালাইয়া দে। বাবার নিরুত্তাপ কণ্ঠ।
নিঃশব্দে হুকুম পালন করি। পেয়ারা গাছের তলে গ্লাসখানা উপুড় করে ধরি।
কেউ যেন আমার ঘরে না আসে। বইলা দিস আমি কারও চেহারা দেখতে চাই না। কারও হাতের কিছু খাইতে চাই না। আমারে বিষ খাওয়াইয়া মারবার মতলব আমি বুঝি। কোনও শত্তুর যেন আমার বাড়িতে না থাকে।
আমি এবারও নিরুত্তর।
পরদিন ফজলিখালা বাড়ি এসে মা’র গায়ে হাত বুলিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেন–দুনিয়াদারি ছাড় বড়বু। সিনেমা দেখা ছাড়। গুনাহর কাম আর কইর না। সংসারের মায়া ছাড়, স্বামী সন্তানের মায়া ছাড়, আল্লাহর পথে আস। এটাই শান্তির পথ।
মা সেই থেকে শান্তি খুঁজতে সিনেমায় নয় আর, আল্লাহর পথে পা বাড়ালেন। আল্লাহর পথ হচ্ছে নওমহলের পথ, ফজলিখালার শ্বশুর বাড়ির পথ। শ্বশুরের নাম আমিরুল্লাহ। অবাঙালি মুসলমান। ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক। ছেলেমেয়ে নিয়ে দেশ ভাগের পর ভারতের মেদেনিপুর থেকে পূর্ববঙ্গে চলে এসে নওমহলের হাজিবাড়ি জঙ্গল সাফ করে একতলা একটি বাড়ি তুলে পাকাপাকি থাকতে শুরু করেছেন। প্রথম কিছুদিন কেরানিগিরি করেছেন পৌরসভার আপিসে। এরপর চাকরি ছেড়ে পাড়া পড়শিকে কোরান হাদিস পড়ে শোনান, পড়শিরা হাদিয়া তুলে দেন হাতে, ওরকমই ইঙ্গিত দেওয়া আছে যে আল্লাহ রসুলের কথা যিনি বলেন তাঁকে হাদিয়া দিলে আল্লাহ খুশি হন, বান্দার জন্য বেহেসত নসীব করেন। আমিরুল্লাহর সংসারে ফজলিখালার প্রবেশ অনেকটা উল্কা পতনের মত। ঘটক, আমিরুল্লাহর বিয়ের যোগ্য ছেলে মুসার জন্য কন্যা দেখতে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে শেষে এঁদো গলির ভেতর খলসে মাছে ভরা পুকুর পাড়ে নানির বাড়ি পৌঁছে। এবাড়িই, উঠোনের লোহার চেয়ারে বসে ঘটক সিদ্ধান্ত নেয়, শেষ বাড়ি।
ঘটকের কাছে কন্যার রূপের বর্ণনা শুনে আমিরুল্লাহ মুসাকে বগলে নিয়ে হাতে এক হাড়ি রসগোল্লা নিয়ে পরদিনই হাজির নানির বাড়িতে। কী ব্যাপার, কাকে চাই? চাই ফজিলাতুননেসাকে। সে তো ইস্কুলে। বাড়ির লোকেরা টিনের ফুটোয় চোখ রেখে শাদা আলখাল্লা পরা ভিন ভাষায় কথা বলা অদ্ভুত মানুষদুটোকে দেখেন। ইস্কুল থেকে ফিরে ফজিলাতুননেসা দেখে ঘরের চেয়ারে বসা অচেনা দুই লোক তার পা থেকে মাথা অবদি গোগ্রাসে গিলছেন। কী কান্ড। কী কান্ড! ফজলিখালা দৌড়ে পগার পার। আমিরুল্লাহর চোখের তারা ফজলিখালাকে দেখে ঝলসে আছে তখনও। এমন সোনার বরণ মেয়ে তিনি আর দু’টি দেখেননি। নানার কাছে আমিরুল্লাহ হাত জোড় করে আবদার করেন–আপনি যদি রাজি হন, আজই, এখনই শাদি হয়ে যাক, পরে অনুষ্ঠানাদি করে না হয় মেয়ে তুলে নেব।
