মা আক্ষেপ করেন আমাকে কেন লবণ খাইয়ে আঁতুড় ঘরেই মারেননি। আমার চোখ ভিজে যায় জলে। মা ফিরেও তাকান না আমার চোখের জলের দিকে।
মা’র ভাষা দিন দিন অশ্লীল হতে থাকে, দিন দিন মা’র গায়ে ঘামাচি বাড়তে থাকে, চোখের নিচে কালি পড়তে থাকে। কেবল বাবাকে নয়, বাড়িসুদ্ধ সবাইকে সকাল সন্ধে গালাগাল করেন। ছেলেমেয়েরাও নাকি তাঁর জন্মের শত্তুর। চাকরবাকররা দুধ কলা দিয়ে পোষা কালসাপ। মণি যা ভাত তরকারি দিয়ে যায় মা’র ঘরে তা থালসুদ্ধ ছুঁড়ে মারেন উঠোনে আশংকা ক’রে যে ষড়যন্ত্র করে কেউ তাঁকে বিষ খাওয়াতে চাচ্ছে। নানির বাড়ি থেকে মামা খালারা এলে মা তাঁদের ঘরে বসিয়ে বাবা আর রাজিয়া বেগমকে কেমন গায়ে গা লাগিয়ে রিক্সায় বসা দেখেছেন বর্ণনা করেন আর বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদেন। মা’র স্বপ্ন ছিল নতুন বাড়িতে নতুন করে সংসার সাজিয়ে তিনি নতুন জীবন শুরু করবেন।
এরকমই দিন যাচ্ছিল, আমাদেরও অনেকটা গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল সাত চড়ে রা নেই। বাবার দিকে মা একটির পর একটি ছুঁড়ে দেবেন যা ইচ্ছে তাই। কফ থুথু গু মুত। আমরা যে যার পড়ার টেবিলে মুখ গুঁজে বসে থেকে ভান করব যে কিছুই দেখছি না বা শুনছি না। আমি সাধারণত সেসময় জটিল অঙ্ক কষতে বসি, অঙ্ক কষার এই এক সুবিধে, মার্জিনে কাটাকুটি করার স্বাধীনতা জোটে, তাই করি আমি, যে কেউ দেখলে ভাববে অঙ্ক আমাকে বিষম দাবড়াচ্ছে। কিন্তু আমি যে জটিলতার অনেক বাইরে মনে মনে মেঘলা কোনও দুপুরে, কোনও এক ধুধু মাঠের কিনারে এক শান্ত পুকুরের ধারে বসে গাঙচিলের ওড়াওড়ি দেখি, তার ছবি আঁকি আর কারও পায়ের শব্দ পেলেই তা কেটে দিই অঙ্কের কাটাকুটির মত তা আমি ছাড়া অন্য কেউ জানে না। বাবা না, মা না। এরকমই একসময়, মা যখন বাবা বাড়ি ফিরতেই বললেন দুষমনডা আইছে, বেডির সাথে যা কাম করনের তা কইরা আইছে। মাগিবাজ কুথাকার! চরিত্রহীন! বাবা, তখনও হাত মুখ ধোননি, শার্ট প্যান্ট খুলে লুঙ্গি পরেননি, টাই ঢিলে হয়ে আছে, ধেয়ে গেলেন মা’র ঘরের দিকে বলতে বলতে পাইছস কি বেডি, আমার বাড়িতে থাকস, আমার খাস, অত জ্বালাস কেন আমারে, পাইছস কি! বাবার হুংকার শুনে আমি রুদ্ধশ্বাস বসে থাকি। মার্জিনে কাটাকুটি করার কলমটি কাঁপে, কলম ধরা আঙুলগুলোও। মা’র ও বাবাগো চিৎকার শুনে চেয়ার ছেড়ে উঠে মা’র ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বিভৎস এক কান্ড দেখি। দেখি বাঘের মত, বাঘ ঠিক কেমন করে লাফিয়ে মানুষের গায়ে কামড় দেয় তা নিজের চোখে কখনও না দেখেও আমার বিশ্বাস বাবা ঠিক বাঘের মতই মা’র গায়ে লাফিয়ে মা’র চুল টেনে এক ঝটকায় মাটিতে ফেলে লাথি কষাতে থাকেন বুকে পেটে। বাবার পায়ে বাটা কোম্পানির শক্ত জুতো, আগের চেয়ে আরও ঢিলে হয়ে আছে গলার টাইখানা। মা খাটের তলে সেঁধিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও পারেন না। আমার পেছনে দাদা এসে দাঁড়ান, ছোটদা, ইয়াসমিনও। আমরা, কয়েকটি ইঁদুর, নির্বাক দেখতে থাকি মা’র নাক মুখ থেকে রক্ত বেরোচ্ছে, শুনতে থাকি মা’র চিৎকার আমারে মাইরা ফেলল রে, আমারে বাঁচাও। আমাদের কারও সাহস হয় না দু’পা সামনে এগোতে। মা গোঙরাতে থাকেন, মেঝে ভেসে যায় মা’র পেচ্ছাবে। আরও কইবি এইসব, ক? তরে আইজ আমি মাইরাই ফালাইয়াম। বাবা বলতে থাকেন হাঁপাতে হাঁপাতে।
আর কইতাম না, পায়ে ধরি আমারে ছাইড়া দেইন। মা কাঁদতে কাঁদতে হাত জোড় করেন পেচ্ছাবের ওপর আধন্যাংটো বসে।
কয়েকটি ইঁদুরকে দূর দূর তাড়িয়ে বাবা চলে যান নিজের ঘরে, গটগট করে জুতো ফেলতে ফেলতে মেঝেয়। মা সারারাত মেঝেয় শুয়ে কাঁদেন। আমার ইচ্ছে করে মা’র কাছে বসে পিঠে হাত বুলিয়ে বলতে যে মা আর কাইন্দ না, দেইখ এর শোধ আমি একদিন তুলাম,. আমার সাহস হয় না। অর্ধেক রাত অবদি অঙ্কের খাতার ওপর ঝুঁকে থেকে রাতে না খেয়ে শুয়ে পড়ি। শুয়ে শুয়ে ঘুমহীন চোখে স্বপ্ন দেখতে থাকি এ বাড়ি থেকে জন্মের মত চলে যাচ্ছি অন্য কোথাও। দূরে কোথাও, কোনও এক অমল ধবল জীবনে।
এই ঘটনার পর হাশেম মামা রাস্তায় বাবাকে পিটিয়ে আধমরা বানিয়ে বাড়ি এনে বালুর বস্তার মত ছুঁড়ে দিয়ে বলেন–আমার বইনের গায়ে আরেকদিন হাত তুলছ কি তুমার লাশ কুত্তা দিয়া খাওয়াইয়াম।
ইস্পাতের মত শক্ত মানুষকেও সাতদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছে। বাবার ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছে মণি। বাবা সাতদিন আমাকে সকাল দুপুর কাছে ডেকে ডেকে বলেছেন লেখাপড়া কইরা বড় হও মা।
শেষের দিন, যে দিনটি পার হলেই তিনি গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াবেন, সেদিন ছুটির দিন, আমাকে দুপুরবেলা কাছে ডেকে বললেন তোতাপাখির মত মুখস্ত কইরা ফালাও সবগুলা বই। ক্লাসে ফার্স্ট হইতে হইব। যারা তুমার ক্লাসে ফার্স্ট হয়, তারা যা খায় তুমিও ত তাই খাও, তাইলে হইবা না কেন? তুমার মাথায় কি ওগোর চেয়ে ঘিলু কিছু বেশি? কও বেশি কি না!
বাবার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে বলি– না।
যদিও আমার বরাবরই মনে হয়েছে ঘিলু খানিকটা কমই আমার মাথায় তবু বাবা যা শুনতে ইচ্ছে করেন তাই বলি। তা বলাই নিরাপদ কি না।
মা গো আমার মাথার চুলগুলায় হাত বুলাইয়া দেও তো মা। বাবা কোমল গলায় বলেন।
খাটের রেলিং ঘেঁসে দাঁড়িয়ে বাবার মাথায় আঙুল ডুবিয়ে দিই। যেন আঙুলগুলো আমার আঙুল নয়। যেন আমি দাঁড়িয়ে আছি এ আসলে আমি নই, অন্য কেউ। উদাস তাকিয়ে থাকি খোলা দরজার ওপাশে রোদ পড়ে কলপারের চৌবাচ্চার জল ঝিকমিক করছে, সেই জলের দিকে। ইচ্ছে করে হাত পা ছুঁড়ে জলে সাঁতার কাটি। আড়াইফুটি চৌবাচ্চার জলে সাঁতরে কতদূরই বা যাওয়া যায়। ঘুরে ফিরে চৌবাচ্চাতেই, কলপাড়েই, রোদ মাথায় করে দাঁড়িয়ে থাকা পেয়ারা গাছের তলেই, এ বাড়িতেই, যে বাড়িতে বেচারা আমাকে মুখে খিল এঁটে কারও না কারও ফরমাশ খাটতে হয়। আঙুলগুলো বাবার চুলে বেড়ালে মারা ইঁদুরের মত খুঁড়িয়ে হাঁটে।
