দাদা বললেন–সামনের সংখ্যায় তর নামে আরেকটা কবিতা ছাপাইয়াম।
মহানন্দো বলি–তাইলে আমি নিজে লিখবাম আমার কবিতা!
দাদা ফ্যাক করে হেসে ফেলেন–যা যা। তুই আবার লেখতে পারস নাকি!
মুহূর্তে বিষাদ আমাকে ছেয়ে ফেলে। ফ্রকের কোঁচড় ভরে জাম কুড়িয়ে দৌড়ে চলে যাই ছাদে। জামের রস রেগে বেগুনি হয়ে থাকে ফ্রক। আমার মন পড়ে থাকে কবিতায়।
এর পর থেকে দাদা বাড়ি না থাকলে তাঁর পড়ার টেবিলের ড্রয়ার খুলে কবিতার খাতা বের করে গোগ্রাসে পড়ি। আহা, এরকম আমিও যদি লিখতে পারতাম!
নতুন বাড়িতে আসার পর বাবা দেড় মণ ওজনের একটি গানের যন্ত্র কিনে আনলেন জার্মানি থেকে আসা এক লোকের কাছ থেকে। বন্ধুদের ডেকে এনে যন্ত্রটি দেখাতে লাগলেন দাদা আর বলতে লাগলেন মেইড ইন জার্মানি। হিটলারের বীরত্বে দাদা সবসময়ই বড় অভিভূত। হিটলারের দেশ থেকে আসা জিনিস নিয়েও। বন্ধুরা দু’চোখ ভরে যন্ত্র দেখে যায়। তারা এ যাবৎ হিজ মাস্টারস ভয়েজের কলের গানই দেখেছে, এমন যন্ত্র দেখেনি, বড় বড় ডিস্কে ফিতে লাগানো, একটির ফিতে আরেকটিতে ঘুরে ঘুরে জমা হয়। দেখে যাওয়ার পর পর নারায়ণ সান্যাল তার একক নাটিকা, পিন্টু তার গিটারের বাজনা, মাহবুব তার গলা ছেড়ে গাওয়া নজরুল গীতি ফিতেবন্দি করতে আসে। সবকিছুই আমাকে দেখতে হয় দরজার পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে, কাছে যাওয়ার কোনও অনুমতি আমি পাইনি। দাদা ভরাট গলায় নিজের আবৃত্তি করা রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের কবিতাও ফিতেবন্দি করেন। দাদার রাতারাতি নাম হয়ে যায় শহরে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখার্জি, মান্না দের গান বাজে, দাদা আর ছোটদা দিনের বেশির ভাগ সময় বাদন যন্ত্রটির ওপর ঝুঁকে থাকেন। বড় ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দেখতে। দাদা বলেন–কিছু ধরবি না। দূরে দাঁড়াইয়া দেখবি।
দাদা বাড়ি না থাকলে আমি সে যন্ত্রও ছুঁয়ে দেখি। ইয়াসমিন ছুঁতে চাইলে বলি –দূরে দাঁড়াইয়া দেখ। কিছু ধরবি না। ও দূরে দাঁিড়য়ে দেখে। আমি যন্ত্রের দু’তিনটে বোতাম টিপলেই গান বাজতে শুরু করে। পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে শুয়ে গান শুনি। আমার বড় দাদা হতে ইচ্ছে করে।
বাড়িতে চুরি হওয়ার কারণে এরকম নিয়ম দাঁড়ায় জানালা দরজা সব বন্ধ রাখতে হবে। সে গরমে গা সেদ্ধ হলেও জানালা খুলে হাওয়া খাওয়া চলবে না। ভাঙা জানালায় বাবা আরও তিনটে করে শিক লাগিয়ে দিলেন, জেলখানার শিকের মত, লম্বা আর পাথারি। ঘরগুলো অন্ধকার হয়ে রইল। দিনের বেলাতেও আলো জ্বেলে লেখাপড়া খাওয়াদাওয়া করতে হয়। স্যাঁতসেঁতে ঘরে নিজেদের ইদূঁরের মত মনে হতে থাকে। রাজিয়া বেগমের সঙ্গে বাবাকে রিক্সায় দেখার পর থেকে মা শয্যা নিয়েছেন। রাঁধাবাড়া, নাওয়া খাওয়া ছেড়ে, শুকনো মুখে সারাদিন শুয়ে থাকেন। বাবার ঘর থেকে নিজের কাপড় চোপড় বিছানা বালিশ সরিয়ে অন্য ঘরে ঢুকেছেন। মা’কে দেখলে যে কেউ মনে করবে কঠিন এক ব্যারাম হয়েছে মা’র। চুলে তেল পড়ে না, চিরুনি পড়ে না। ঘামাচিতে গা ভরে গেছে, ঘামে শরীরের কাপড় লেপ্টে থাকে শরীরে। সারাদিন রা শব্দ নেই, বাবার বাড়ি ফেরার শব্দ শুনলে কেবল ছুটে এসে চিকন গলায় বিলাপ শুরু করেন –ওই তো, বেটির সাথে সারাদিন কাটাইয়া আইলা। বুঝি, এত বড় বাড়ি কিনছ, ওই বেটিরে বিয়া কইরা এই বাড়িতে তুলবা বইলা। মা’র বিলাপের কোনও জবাব কখনও দেন না বাবা। যেন কারও কোনও কথা তাঁর কানে ঢুকছে না। যেন কেউ তাঁকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলছে না। যেন যে শব্দগুলো ভাসছে ঘরে, সেটি কিছুই না, বেড়ালের মিঁয়াও মিঁয়াও বা চুলোয় খড়ি পোড়ার শব্দ। মা যে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, অনর্গল চেচিয়ে যাচ্ছেন, বাবা তাঁর উপস্থিতি বা স্বর যেন টের পাচ্ছেন না এমন ঢঙে হাঁটাহাঁটি করেন উঠোনে ঘরে, বাচ্চাদের চাকরবাকরদের কুকুরবেড়ালের খবরটবর নেন, নানির বাড়ির পেছনের বস্তি থেকে নিয়ে আসা নতুন কাজের মেয়ে মণিকে ডাকেন ভাত দিতে, ভাত খেয়ে ঢেকুর তুলে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সর্ষের তেল মাখা চুল আঁচড়ে চলে যান বাইরে। মা পেছনে দাঁড়িয়ে বাবার গুষ্ঠি তুলে গাল পাড়েন–আমার বাবা ডাক্তারি পড়াইছে বইলা ডাক্তার হইছস, নাইলে তো চাষার ছেড়া চাষাই থাকতি। টেকার লুভে বিয়া করছিলি আমারে, এহন নিজের টেকা হইছে, আমারে ফালাইয়া আরেক বেডার বউ লইয়া রঙতামাশা করস। আল্লায় তরে ধ্বংস করব, তর এই বাবুগিরি থাকব না, দেমাগ কই যাইব! আমি তরে অভিশাপ দিতাছি, আমার বাপের নিমক যদি খাইয়া থাকস, তাইলে আমারে যন্ত্রণা দেওনের বিচার আল্লায় করব। তর চৌদ্দ গুষ্ঠি মরব কুষ্ঠ হইয়া। মা’র ধারণা বাবা আজ রাতে বা কাল সকালে রাজিয়া বেগমকে বিয়ে করে ঘরে তুলবেন। রাগে ফাটা মা’র সামনে কেউ দাঁড়াবার সাহস করে না। আমার মুখ ফসকে একদিন বেরিয়ে যায়–এত চিল্লাও ক্যা? এই ডা তো আর আকুয়া পাড়া না।
মা ঝড়ের মত উড়ে এসে আমার চুল ধরে এমন হেঁচকা টান দেন যে আমি চেয়ারে বসা ছিলাম সেটি উল্টে পড়ল পেছন দিকে, আর আমি গিয়ে ঠেকলাম দেয়ালে, মা আমাকে লাটিমের মত ঘোরালেন। দু’গালে কষে থাপ্পড় দিয়ে কর্কশ গলায় বলেন– হারামির বাচ্চা কস কি তুই! বাপে কুনওদিন ফিইরা চাইছে তগোর দিকে! বাপের পক্ষ লস! তা তো লইবিই! এক রক্ত তো! বদমাইশের রক্ত। রাক্ষুসি মাগি, তুই আমারে জন্ম থেইকা জ্বালাইতাছস! তই জন্মাইবার পর থেইকাই আমার কপাল পুড়ছে। তরে যে কেল্লিগা আমি ছডিঘরে নুন খাওয়াইয়া মাইরা ফেললাম না!
