.
৩. অনুবাদ
অথচ প্রবন্ধটা কোনও মৌলিক নিজস্ব লেখা নয়। ওয়াশিংটন আর্ভিং-এর টেলস-অব আল-হামরা গ্রন্থের অংশবিশেষের অনুবাদমাত্র। কিন্তু সেটাও কম কৃতিত্বের বিষয় ছিল না। কারণ ঐ পুস্তকে বিষয়বস্তু ছিল স্পেনে মুসলিম স্থপতির বিশদ বর্ণনা। গ্রানাডা, কর্ডোভা, সেভিল ইত্যাদি স্পেনীয় প্রাচীন নগরীগুলিতে মুসলিম স্থপতির যেসব বিস্ময়কর নিদর্শন আছে, ঐ বইয়ে তার নিখুঁত ও বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। স্থপতি বিদ্যার বহু টেকনিক্যাল ইংরাজি শব্দ ঐ পুস্তকে দেদার ব্যবহার করা হইয়াছে। ঐ সব ইংরাজি শব্দের বাংলা শব্দ খুঁজিয়া পাওয়া কত কঠিন কাজ! কারণ অভিধান দেখিয়া শুধু ইংরাজি শব্দের বাংলা অর্থ বাহির করিলেই চলিবে না। আমাদের দেশেও মুসলিম স্থপতিতেও ঐসব শব্দের টেকনিক্যাল প্রতিশব্দ আছে। কাজেই এটা এমনিতেই দুরূহ ব্যাপার। আমার মত পনের-ষোল বছর বয়সের ক্লাস সেভেন-এইটের ছাত্রের পক্ষে এটা ছিল আরো কঠিন। তবু স্পষ্টতই আমার অনুবাদ ভাল হইয়াছিল। প্রমাণ, সম্পাদক সাহেব পরবর্তী প্রবন্ধের জন্য তাকিদ করিয়া পাঠাইয়াছেন। বাল্যের দুর্বলতা ও অহমিকাহেতু ঐ প্রবন্ধের কোথাও উহাকে অনুবাদ বলিয়া স্বীকার করা হয় নাই। ঐ বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থকারের নামও কোথাও উল্লেখ করা হয় না। স্পষ্টই বুঝা যায়, উহাকে মৌলিক প্রবন্ধ বলিয়া চালাইয়া দেওয়াই আমার অভিসন্ধি ছিল। নব্য সাহিত্যিক হিসাবে আমি যে ঐ কাজ করিয়া কত বড় রিস্ক নিয়াছিলাম, তা বুঝিবার মত বুদ্ধি ও বয়স তখনও আমার হয় নাই। আমি তখন জানিতাম না যে, নিজের মৌলিক প্রবন্ধরূপে না পাঠাইয়া ওয়াশিংটন আর্ভিং-এর অনুবাদরূপে চালাইলে তা সম্পাদক সাহেবের অধিক শ্রদ্ধা পাইত সুতরাং প্রবন্ধ ছাপা হওয়া এবং আমার নাম ছাপার হরফে বাহির হওয়া একরূপ নিশ্চিত ছিল। তা না করিয়া আমার মত অখ্যাতনামা নবীন লেখক তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রের মৌলিক প্রবন্ধরূপে পাঠাইয়া আমি উহার ছাপা হওয়ার চান্সকে শতকরা নিরানব্বই ভাগ কমাইয়া দিয়াছিলাম। তাতেও যে উহা সম্পাদক সাহেবের কাঠোর পরীক্ষায় পাশ করিয়াছিল এইটাই ঐ প্রবন্ধের, তার ভাষার, সুতরাং আমার কৃতিত্বের বিষয়।
.
৪. আল-এসলাম
কিন্তু তবু আল-এসলাম-এ প্রথমে কবিতা পাঠানোর মত রিস্ক এটা ছিল না। সেটা আমি পরে বুঝিয়াছিলাম। আল-এসলাম-এ প্রথম লেখা পাঠাইবার সময় কবিতার বদলে প্রবন্ধ পাঠাইবার বুদ্ধি কে দিয়াছিল, তা মনে নাই। যতদূর মনে পড়ে বুদ্ধি কেউ দেয় নাই। কারণ কারো বুদ্ধি চাই নাই। অবিবাহিত মেয়ের গর্ভপাত হওয়ার মতই নব্য-লেখকদের এ ধরনের ব্যাপার চরম গোপনীয় বিষয়। নিছক আল্লার মেহেরবানিতে নিজের মগজের ঢেউ’-এর জোরেই এ কাজ করিয়াছিলাম। এটা না করিয়া কবিতা পাঠাইলে কী হইত, সেটা বুঝিলাম কিছুদিন পরে। আঞ্জুমনে ওলামার অন্যতম নেতা, আল-এসলাম-এর ভারপ্রাপ্ত সহ-সম্পাদক ও মুদ্রাকর মৌ. মোযাফফর উদ্দিন আহমদ ময়মনসিংহ বেড়াইতে আসেন এবং আমার মত নগণ্য অচেনা লোককে খুঁজিয়া বাহির করেন। সুপারের খাতিরে তিনি হোস্টেলে সরকারি মেহমান। তিনি সকলের সামনে আমার তারিফ করেন। এবং কথায় কথায় বলেন : এই ছেলের যে বিশেষ গুণটায় আমরা এর সম্বন্ধে আশান্বিত হইয়াছি, সেটা এই যে, সাধারণ নব্য-লেখকদের মত সে কবি হওয়ার চেষ্টা করে নাই। নব্য-কবিদের জ্বালায় শান্তিতে সম্পাদকতা করা অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে। কবিতার যে বস্তা আফিসে জমা হইয়াছে, তাই ঝটাইয়া ফেলিবার আমার লোকের অভাব। তার উপর কবিরা আফিসে গিয়া পর্যন্ত আমাকে ধাওয়া করে। আমার গা কাঁটা দিয়া উঠিল। গায়েবের মালিক আল্লাহকে মনে-মনে ধন্যবাদ দিলাম।
আল-এসলাম-এ গ্রানাডা-কর্ডোভার স্থপতি সম্বন্ধে কয়েকটা প্রবন্ধ বাহির হওয়ার পর ওদিককার প্রচেষ্টা বন্ধ হয়। এর পরে আমি ছোট-গল্প লেখায় মন দেই। এই সময় শরত্যাবুর পল্লী সমাজ পাঠ করি এবং ঐ একটি বই পড়িয়াই শরত্যাবুর ভক্ত হইয়া পড়ি। অতঃপর শরত্যাবুর বিভিন্ন বই পড়িয়া তার স্টাইল-এ এতই প্রভাবিত হই যে, পরবর্তীকালে শরবাবুর প্রভাব হইতে চেষ্টা করিয়াও মুক্তি লাভ করিতে পারি নাই।
.
৫. পিওর আর্টের বিতর্ক
১৯১৫ হইতে ১৯২০ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে আমি বাংলা ও ইংরাজি সাহিত্যের কাব্য-উপন্যাসের বহুলাংশ পাঠ করিয়া ফেলি। বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল, রমেশ দত্ত, নবীনচন্দ্র ও হেমচন্দ্রের বসুমতী-প্রকাশিত গ্রন্থাবলি এই সময় হইতেই প্রকাশিত হয়। সে জন্য এঁদের সব বই পড়া তখন খুবই সহজসাধ্য ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, ডা. নরেশ সেন, নারায়ণ ভট্টাচার্য প্রভৃতির সামাজিক নভেল এবং দীনেন্দ্র কুমার রায় ও পাঁচকড়ি দে প্রভৃতির ডিটেকটিভ নভেল পৃথকভাবে হয় নিজের কিনিতে, নয় ত বন্ধু-বান্ধবকে দিয়া কিনাইতে হইত, অথবা স্কুল-কলেজ, লাইব্রেরি ও পাঠাগার হইতে সংগ্রহ করিতে হইত। প্রাইভেট পাঠাগারের মধ্যে এই সময় ঢাকাস্থিত সারস্বত সমাজের লাইব্রেরিটি উল্লেখযোগ্য। এতে অনেক বই পাওয়া যাইত। বাবু পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য নামক এক ভদ্রলোক এই সময় ঐ লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। তিনি আমাকে পঠিতব্য পুস্তক নির্বাচনে অনেক সাহায্য করিয়াছেন। কলেজ লাইব্রেরি হইতে এই সময় হল কেইন, মেরি কোরেলি, স্কট, জর্জ ইলিয়ট, টমাস হার্ডি, গেলওয়ার্দি, টলস্টয়, ভিক্টর হিউগো, টুর্গেনিভ ও ডস্টয়ভস্কির নামকরা সব পুস্তক পড়িয়া ফেলি।
