কিন্তু আমাদের কিছু বই সত্য-সত্যই বাইন্ডিং হইয়াছিল। কারণ এটা। আমরা নিজেরাই করিতাম। অর্থাৎ আমরা দুই বন্ধু বাইন্ডিং কাজে এমন মত্ত হইয়া উঠিয়াছিলাম যে, এক বন্ধু আরেক বন্ধুর উপর হাত সাফাই করিতে দ্বিধা করিতাম না। তবে দুর্নিবার প্রলোভন না হইলে এ কাজ করিতাম না। করিলে এত সাবধানে করিতাম যাতে কিছুতেই ধরা না পড়ি। ধরা পড়িলে আত্মহত্যা করিয়াও লজ্জা নিবারণ করা যাইবে না। কারণ আমার ধারণা, আমিই শুধু শামসুদ্দীনের বই বাইন্ডিং’ করিয়া ঘুমন্ত বন্ধুর পিঠে ছুরি মারিতেছি। কাজেই সময়ে সাবধান হইলাম। হোস্টেলে পুস্তকের স্টক বুকশেলফ হইতে পোর্টমেন্টে তুলিলাম। বাড়িতে বৈঠকখানার আলমারি অন্দর বাড়িতে নিয়া গেলাম। তাতে তালা-চাবি লাগাইলাম। তার পর একদিন নিতান্ত দৈবাৎ জানিতে পারিলাম আমার একখানা ভাল বই শামসুদ্দীন বাইন্ডিং’ করিয়া ফেলিয়াছে। নিজের চক্ষুকে বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। কিন্তু অল্পক্ষণেই সে ভাব কাটিয়া গেল। বুকের উপর হইতে একটা পাপের বোঝা নামিয়া গেল। শুধু আমিই শামসুদ্দীনের বই বাইন্ডিং’ করিয়া ঘুমন্ত সরল বিশ্বাসী বন্ধুর ডাকাতি করিতেছি বলিয়া আমি মনে-মনে শামসুদ্দীনের নিকট অপরাধী ছিলাম। প্রতি কাজে প্রতি কথায় আমার বুকে সেটা কাঁটার মত বিধিত। আজ সেটা হইতে রক্ষা পাইলাম। নিজের প্রিয় জিনিস চুরি হইলেও যে তাতে আনন্দ পাওয়া যায়, এই অভিজ্ঞতা লাভ করিলাম আমি ঐদিন।
আমি কিছু বলিলাম না। কিন্তু অতঃপর আমার কথাবার্তায় ও চাল-চলনে শামসুদ্দীনের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হইল। শেষ পর্যন্ত সে কথাটা নিজেই স্বীকার করিল। আমি তার সব কথা শুনিয়া বুঝিলাম সেও নিজেকেই একা অপরাধী মনে করে। আমি যে তার অনেক ভাল বই বাইন্ডিং’ করিয়া ফেলিয়াছি সে ঘুণাক্ষরেও তেমন সন্দেহ করে নাই।
অতঃপর দুই বন্ধুর কনফেশনের পালা। কে কার কতখানা বই বাইন্ডিং করিয়াছি, তার খতিয়ান করা হইল। দেখা গেল : কেহ কারে নাহি পারে, সমানে সমান। দুই জনের খতিয়ান প্রায় কাছাকাছি।
দুই বন্ধু খুব জোরে হ্যান্ডশেক করিলাম। বলিলাম : কুচপরওয়া নাই। তোমার বই আমার বই, আমার বই তোমার বই। আমাদেরটা জয়েন্ট লাইব্রেরি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের দুইজনের লাইব্রেরির একটাও টিকে নাই চুরিতে যে লাইব্রেরি গড়িয়া উঠিয়াছিল, ডাকাতিতে তা শেষ হইল। এ ডাকাতি শুরু হইল, চাকরি ও ব্যবসা উপলক্ষে আমরা বাড়ি ছাড়িবার পর হইতে। কারণ আমাদের বইগুলি লোকেরা নিল বলিয়া-কহিয়া। যিনি নিলেন তিনি আর ফেরৎ দিবার নামটি করিলেন না। আমরা টাকা-কড়ি খরচ করিয়াই বই কিনিতাম। যেগুলি বাইন্ডিং’ করিতাম, তাতেও বেশ পয়সা খরচ হইত। তারপর আমাদের নাম বহন করিয়াই আমাদের লাইব্রেরিতে থাকিত। কিন্তু আমাদের যে সব বন্ধু ও আত্মীয়েরা আমাদের পুস্তক নিয়াছেন, তাঁরা
বাইন্ডিং’-এ টাকা খরচ করেন নাই বলিয়া তাদের বাড়িতে বসিয়াই আমাদের পুস্তকগুলি আমাদেরেই বুড়া আঙুল দেখাইতেছে।
অধ্যায় তের – সাহিত্য-সাধনা
১. কবি হওয়ার অপচেষ্টা
ছাপার হরফে নিজের নাম দেখার ইচ্ছা বোধ হয় সব মানুষেরই ছেলেবেলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা। বিশেষত কবি-সাহিত্যিক হওয়া যাদের শখ তাদের ত নিশ্চয়ই। আমারও এই শখ ছিল খুব তীব্র। কবি হিসাবে নাম প্রকাশ করিবার আশায় বিভিন্ন মাসিক কাগজে নিজ নামে অনেক কবিতা পাঠাইয়াছি। নিজ নামে ছাপা না হওয়ায় ধারণা হইয়াছে, হিন্দু সম্পাদকরা মুসলমান কবিদের কবিতা ছাপাইবেন না। মুসলমানকে ওরা দু’চোখে দেখিতে পারেন না। কাজেই অবশেষে হিন্দু নামে কবিতা পাঠাইতে লাগিলাম। সে ফন্দিও ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বড় বড় নাম করা কবিদের নামে কবিতা পাঠাইতাম। আমার যতদূর মনে পড়ে একবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম দিয়াও একটা কবিতা পাঠাইয়াছিলাম।
ছাপার হরফে নিজের নাম মাসিক পত্রিকায় দেখিবার আশাতেই এসব ফন্দি-ফিকির করিয়াছিলাম, বলা বোধহয় ঠিক হইবে না। কারণ ঐসব কবিতা যদি ছাপা হইতও, তবু তাতে আমার নাম থাকিত না। তবে কিসের আশায় এত শ্রম, এত কাগজ ও এক টিকিট ব্যয়? নিজের নাম নয়, নিজের কবিতা ছাপার হরফে দেখিবার জন্য। নিজের সৃষ্টির প্রতি মানুষের এমনি একটা টান বোধ হয় স্বাভাবিক ও সহজাত। সন্তান ও আর কেউ যদি বাপ মাকে নাও চিনে, তবু বোধ হয় বাপ-মারা নিজের সন্তানকে সুস্থ ও যশস্বী দেখিয়া এমনি একটা পুলকের রোমাঞ্চ অনুভব করিয়া থাকেন।
.
২. গদ্যে প্রথম সাফল্য
যা হোক শেষ পর্যন্ত কবিতা লেখার দিকে ঝোঁক কমাইতে বাধ্য হইলাম। প্রবন্ধ ও গল্প লিখিতে চেষ্টা করিলাম। একটা লাগিয়া গেল। বোধ হয় ১৯১২ ১৩ সালের কোনও এক সময়ে নেতৃস্থানীয় সাহিত্যিক-আলেমরা ‘আঞ্জুমনে ওলামায়ে বাঙ্গালা’ নামে একটি সমিতি গঠন করেন এবং তার মুখপত্র রূপে আল-এসলাম নামে একটি মাসিকপত্র বাহির করেন। ১৯১৩ সালে এটা আমি প্রথম দেখি। মুসলমানদের নিজস্ব মাসিকপত্র বাহির হওয়ায় আমি উৎসাহিত হইয়া উঠিলাম। অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া এই কাগজে কবিতা না পাঠাইয়া একটি প্রবন্ধ পাঠান স্থির করিলাম। কারণ, ভয় হইল যদি একবার এই কাগজের সম্পাদক আমার লেখা না-পছন্দ করিয়া বসেন, তবে পরে হাজার ভাল লেখাও তিনি ছাপিবেন না। হয়ত বা নাম দেখিয়াই লেখাটা ফেলিয়া দিবেন, পড়িয়াও দেখিবেন না। অতএব প্রবন্ধই পাঠাইতে হইবে। অনেক খাঁটিয়া-খুটিয়া একটি প্রবন্ধ পাঠাইলাম। প্রথম গুলিতেই শিকার পড়িল। প্রবন্ধ ছাপা হইয়া গেল। শুধু ছাপা হইল না। পরবর্তী লেখাটার জন্য সম্পাদক সাহেব তাকিদ-পত্র লিখিলেন। সেদিন আমার আনন্দ দেখে কে? বন্ধু-বান্ধবের কাছে, এমনকি মুরুব্বিদের কাছে, আমার কদর কত! কলিকাতায় প্রকাশিত মাসিক কাগজে নিজের নামসহ প্রবন্ধ ছাপা হইয়াছে। সারা গায় রোমাঞ্চ হইল। তা দুই-এক দিনে কাটিল না। নিজের প্রবন্ধটা অন্তত কুড়িবার এবং ছাপার হরফে নিজের নামটা অন্তত হাজার বার পড়িলাম। যতই দেখিতে লাগিলাম, ততই ভাল লাগিতে লাগিল।
