এই সময় বাংলা মাসিক পত্রিকাগুলিতে ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ এই প্রশ্ন। লইয়া বাদ-বিতণ্ডার ঝড় বইতে ছিল। নামকরা পণ্ডিত লোকদের প্রায় সবাই এই বিতর্কে যোগ দিয়াছিলেন। এই সব প্রবন্ধ আমি প্রবল আগ্রহ লইয়া পড়িলাম। কিন্তু সে বিতণ্ডায় আমি কোনও আলো পাইলাম না।
মাঝখান হইতে এইসব তর্ক-বিতর্কে আমার নিজস্ব একটা মতবাদ গড়িয়া উঠিল। আমার মত নগণ্য তরুণ যুবকের মনোভাবকে মতবাদ বলা ঠিক হয় না। তবু নিজের কথাটা বলিবার আগ্রহ আমার দুর্নিবার হইয়া উঠে। কথাটা ঠিক পজিটিভ কোনও মতবাদ নয়। একটা নিগেটিভ অ্যাটিচুড মাত্র। শরৎবাবুর বই পড়িবার জন্য আমার মধ্যে একেবারে রাক্ষসী ক্ষুধা ছিল। তাঁর বই আমাকে একেবারে সম্মোহিত করিয়া রাখিত। তবু শরৎবাবুর পল্লী সমাজ বাদে আর সমস্ত বইয়ের বিরুদ্ধে আমার একটা গোপন বিদ্রোহ ছিল। এ যেন মদখোরের মদ-নিন্দা। মদখোরেরা বন্ধুদের মজলিসে বসিয়া মদ খাওয়ার নিন্দায় সককে ছাড়াইয়া যায়। কিন্তু মদের বোতল দেখিলেই সব কথা ভুলিয়া যায় এবং গোগ্রাসে বোতলকে-বোতল গিলিয়া ফেলে। আমার বিবেচনায় শরৎবাবুর এই গুণটাই ছিল দোষ। রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস সম্বন্ধেও আমার এই একই রকম অ্যাটিচুড ছিল। একমাত্র গোরা সম্বন্ধেই আমার ধারণা ছিল অন্যরূপ। এটাকে আমি রবিবাবুর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বলিতাম। কেন বলিতাম, সে কথা কাউকে বুঝাইতে পারিতাম না। ঠিক তেমনি টলস্টয়, টুর্গেনিভ ও ডস্টয়ভস্কির পুস্তকগুলিকে আমি আদর্শ উপন্যাস বলিতাম। কিন্তু সেগুলি কেন আদর্শ নভেল, তা বুঝাইতে পারিতাম না। ইংরাজি নভেলিস্টদের মধ্যে একমাত্র হল কেইনকেই আমি শ্রেষ্ঠ বলিতাম। ফরাসি নভেলিস্টদের মধ্যে আমি ভিক্টর হিউগোকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নভেলিস্ট বলিতাম। তাঁর লা মিজারেবলস ও লাফিং ম্যানকে আমি মহাকাব্যের অনুকরণে মহা-উপন্যাস বলিতাম।
কিন্তু একমাত্র রাশিয়ান নভেলগুলিকেই আমি আদর্শ নভেল বলতাম। কিসের জন্য, কী কারণে, ওগুলি আদর্শ নভেল বন্ধু-বান্ধবের এই প্রশ্নের কোনও জবাব দিতে পারিতাম না। কিন্তু নিজে-নিজে চিন্তা করতাম। এই চিন্তার ফল ১৯২২ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত আমার ‘গোলামী সাহিত্য’ নামক প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধটা বর্তমানে আমার সামনে নাই। অনেক তালাশ করিয়াও যোগাড় করিতে পারিলাম না। তাই কোন যুক্তিতে কী বলিয়াছিলাম, তা বলিতে পারিব না। কিন্তু ওতে আমার প্রতিপাদ্য ছিল যা সে কথাটা আমার মনে আছে। আমি ঐ প্রবন্ধে বলিতে চাহিয়াছিলাম যে বাংলা সাহিত্যের দিকপাল শিল্পীরা যে সাহিত্য সৃষ্টি করিতেছেন, সেটা বাঙ্গালীর সত্যিকার জীবনালেখ্য নয়; এটা গোলাম বাংলার সাহিত্য। কাজেই গোলামী সাহিত্য। এঁদের সৃষ্ট আর্ট শুধু আর্টেরই জন্য, জীবনের জন্য নয়। আমার মতে আর্ট আর্টের জন্য নয়, আর্ট মানুষের জীবনের জন্য। যে আর্ট মানুষের উপকারে আসিল না, সেটা সুন্দর নয়, অসুন্দর। আমি তাতে বলিয়াছিলাম আমাদের শিল্পীরা ধানক্ষেত কাটিয়া সেখানে ফুলের বাগিচা করিতেছেন। এই প্রবন্ধে আমি রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করিয়াছিলাম। তাতে সাহিত্যিক মহলে বেয়াদবির জন্য আমার যথেষ্ট নিন্দা হইয়াছিল। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ভোলার কবি মোজাম্মেল হক সাহেব আমাকে বলিয়াছিলেন যে, আমার ঐ প্রবন্ধ ছাপার জন্য কলিকাতার সাহিত্যিকরা তাকে তিরস্কার করিতেছেন। এত প্রতিবাদ ও নিন্দার মধ্যে আমি একটা সান্ত্বনা পাইয়াছিলাম বরিশাল হইতে প্রকাশিত বরিশাল হিতৈষীনামক একটি সাপ্তাহিক কাগজে দীর্ঘ সম্পাদকীয় প্রবন্ধে আমার ঐ প্রবন্ধের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং আমার সমালোচকদের নিন্দা করা হইয়াছিল।
আমি শরত্যাবুর যতই বিরোধী হই না কেন, তার প্রভাবমুক্ত হইতে পারিলাম না। তাঁর অনুকরণে অনেকগুলি গল্প লিখিয়া ফেলিলাম। ঐ সব গল্পই সওগাত-এ ছাপা হইয়াছে। ঐগুলি লেখার সময় আমি মাত্র আইএ পড়ি, অথবা সবেমাত্র আইএ পাশ করিয়াছি। সওগাত-এর সম্পাদক নাসিরউদ্দীন সাহেব শুধু মাসের পর মাস আমার গল্পই ছাপিতেন না, আমাকে উৎসাহ দিয়া পত্রও লিখিতেন। সেই হইতে নাসিরউদ্দীন সাহেব ও তার সওগাত-এর সাথে আমার ব্যক্তিগত ও সাহিত্যিক জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত হইয়া যায়। এ সম্পর্কের মধুরতা এই বৃদ্ধ বয়সেও অটুট রহিয়াছে।
.
৬. সাহিত্যিকদের সাথে প্রথম পরিচয়
আমি ১৯২২ সালের মাঝামাঝি বোধহয় জুলাই মাসে খিলাফত কমিটির সভায় যোগ দিতে প্রথম কলিকাতা যাই। কিছুদিন আগে শামসুদ্দীন কলিকাতা গিয়াছেন। তিনি মুসলিম জগত নামক সাপ্তাহিক কাগজের সম্পাদকতা করেন। তিনি ছাত্রজীবনের দুই বছরও কলিকাতায় কাটাইয়াছেন। সুতরাং কলিকাতার ব্যাপারে তিনি আমার বিবেচনায় একজন এক্সপার্ট। আর আমি আনাড়ি, একদম বাঙ্গাল। কাজেই আগে হইতে তাঁকে চিঠি লিখিয়া জানাইলাম। তিনি শিয়ালদহ স্টেশন হইতে আমাকে নিয়া গেলেন। আমি তার মেহমান হইলাম। যাকারিয়া স্ট্রিট ও চিৎপুরের মোড়ের একটি বাড়িতে খিলাফত আফিস। সেখানেও শামসুদ্দীনই আমাকে পৌঁছাইয়া দিলেন। কলিকাতা এত ভাল লাগিল যে খিলাফত কমিটির সভার কাজ শেষ হইবার পরও কলিকাতা ছাড়িতে মন চাহিল না। স্বরাজ ও খিলাফত দুই আন্দোলনেই তখন মন্দা পড়িয়া গিয়াছে। কাজেই নিজের গ্রামে বা জিলায় চাঞ্চল্যকর কিছু। করিবারও নাই। শহরের জাতীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করিয়া যা কিছু পাই, তাতে পকেট খরচা ও খাওয়াই চলে না। কাজেই কলিকাতায় কোনও কাজের যোগাড় করা যায় কি না দুই বন্ধুতে সে চিন্তা করিতে লাগিলাম।
