.
১৪. মাইকেলের প্রভাব
এমন বিপদের দিনে মাইকেল মধুসূদন আসিলেন আমার বিপত্তারক হিসাবে। প্রথমে তার একাকিনী শোকাকুলা অশোক কাননে’, পড়িলাম পাঠ্যবইয়ে। তারপর আস্ত মেঘনাদবধ কাব্যটাই পড়িয়া ফেলিলাম। তারপর এক-দুই করিয়া পলাশীর যুদ্ধ, বৃত্রসংহার ও মহাশ্মশান কাব্য পড়িলাম। নবীনচন্দ্র ও কায়কোবাদের কবিতা মাইকেলের কবিতার চেয়ে সহজ লাগিল। মাইকেলের কবিতা তুলনায় অনেক কঠিন। কঠিন বলিয়াই উহাকে শ্রেষ্ঠতর কাব্য মনে হইল। কারণ কবিতায় যত বেশি কঠিন শব্দ থাকিবে, কবিতা পড়িতে পাঠককে যত বেশি অভিধান দেখিতে হইবে, যত দুর্বোধ হইবে, কবিতা তত উৎকৃষ্ট হইবে, ইহাই ছিল আমার ধারণা। আমি অমিত্রাক্ষর ছন্দে যথাসম্ভব দুর্বোধ্য কবিতা রচনা করিতে লাগিলাম। তাতে যথেষ্ট নাম হইল। মাসিক কাগজের সম্পাদকরা আমার কবিতা না ছাপিলেও বিবাহ-মজলিসে আমার আদর ছিল। বিভিন্ন স্থান হইতে চেনা-অচেনা অনেক লোক প্রীতি উপহার’ লেখাইতে আমার কাছে আসিত। আগ্রহের সঙ্গে তাদের ফরমায়েশ পালন করিতাম। রাত জাগিয়া নিজের কাগজ-কলম খরচ করিয়া কবিতা লিখিতাম। অত খাটুনির ফল কবিতাটা ছাপার ভুলের জন্য নষ্ট না হয়, সেজন্য প্রেসে গিয়া প্রুফ দেখিয়া দিতাম।
বিবাহের ‘প্রীতি উপহার’ লিখিতে গিয়া এবং প্রেম-ভালবাসার কবিতা লিখিতে গিয়া বুঝিলাম অমিত্রাক্ষর ছন্দে তা চলে না। প্রেম-ভালবাসার মর্ম অবশ্য তখনও বুঝিতাম না। কিন্তু তাতে প্রেমের কবিতা লিখিতে কোনও অসুবিধা হইত না। কোকিল-পাপিয়া না দেখিয়াই ওদেরে সম্বোধন করিয়া যেমন অনেক কবিতা লিখিলাম, কোনও সুন্দরী না দেখিয়াও তেমনি তাকে সম্বোধন করিয়াও অনেক কবিতা লিখিলাম। বলা বাহুল্য, এসবই বড়-বড় কবিদের অনুকরণমাত্র।
.
১৫. পুস্তক বাইন্ডিং
কবিতা লেখার সঙ্গে নাটক-নভেল পড়াও সমান জোরে চলিতে লাগিল। শামসুদ্দীন, সাঈদ সাহেব ও আমি পুস্তক খরিদে প্রচুর অর্থ ব্যয় করিতাম। তাতে আমাদের তিনজনেরই নিজস্ব লাইব্রেরি গড়িয়া উঠে। শামসুদ্দীনের ও আমার লাইব্রেরি পুস্তক-সংখ্যা সাঈদ মিঞাকে অনেক ছাড়াইয়া যায়। এর একটা গুপ্ত কারণও ছিল। পয়সা দিয়া কিনা ছাড়াও আমি ও শামসুদ্দীন অন্য উপায়ে পুস্তক সংগ্রহ করিতাম। অন্যের নিকট হইতে ধার করিয়া আনা কোনও পুস্তক খুব পছন্দ হইলেই আমরা কয়েক হাত ঘুরাইয়া বইটি শেষ পর্যন্ত গায়েব করিয়া ফেলিতাম। কয়েক দিন গুপ্ত থাকিয়া অন্য চেহারায় সেই বই আসিয়া আমার অথবা শামসুদ্দীনের লাইব্রেরিতে স্থান পাইত। শামসুদ্দীন ও আমার মধ্যে এ কাজের ‘কোড ল্যাংগুয়েজ ছিল বাইন্ডিং করা। অর্থাৎ ঐ বইটির মলাট ছিঁড়িয়া ফেলিয়া নূতন করিয়া বইয়ের আকারভেদে চামড়ার ফুল বাধাই, হাফ বাধাই ও টিশ বাধাই করাইয়া ফেলিতাম এবং প্রয়োজনবোধে সোনালি-রুপালি হরফে নিজেদের নাম লেখাইয়া ফেলিতাম। এ কাজে আমরা দুইজন এমন সিদ্ধহস্ত হইয়াছিলাম যে, আমাদের বন্ধু বান্ধবদের কেউ কোনও ভাল বই হারাইলেই আমি ও শামসুদ্দীন পরস্পরকে সন্দেহ করিতাম। চোখ ঠারাঠারি করিয়া জিজ্ঞাসা করিতাম : ‘কিহে বাইন্ডিং করিয়া ফেলিয়াছ নাকি?’ এইরূপ বাইন্ডিং করানোর কাজে যে আমরা শুধু পুরাতন ছেঁড়াছুটা বইই বাঁধাই করাইতাম তা নয়, অনেক নূতন বইয়েরও ভাল বাঁধাই খুলিয়া ফেলিম এবং সম্পূর্ণ নূতন ধরনে নূতন বাঁধাই করিতাম। এ কাজে আমাদের বিশ্বস্ত দফতরি ছিল। কিন্তু সব ব্যাপারে শুধু দফতরির উপর নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতাম না। দফতরির হাতে দিবার আগেই বাঁধাই ভোলা হইতে শুরু করিয়া বইয়ের ভিতরে নাম লেখা নিশ্চিহ্ন করা পর্যন্ত সব কাজ নিজ হাতে করিতাম। প্রয়োজন হইলে দুই-এক পাতা বা পাতার অংশ ছিঁড়িয়া ফেলিতাম। এ কাজে আমাদের লোভ ও দক্ষতা এমন। বাড়িয়া গিয়াছিল যে, স্কুল-কলেজের লাইব্রেরি-কমন রুমে বা পাবলিক পাঠাগারে কোনও বই আমাদের একজনের পছন্দ হইলে অপর জনকে বলিতাম : বইখানা বাইন্ডিং করার যোগ্য হে’। অতঃপর দুই বন্ধুতে ঐ বইখানা বাইন্ডিং করার সুবিধা-অসুবিধা, বিপদ-আপদ চারদিক চিন্তা করিতাম। অবস্থা গতিকে বাইন্ডিং করার লোভ অনেক ক্ষেত্রেই ত্যাগ করিতে হইয়াছে। এ সব ক্ষেত্রে ইসু-করা পুস্তক একাধিকবার রিইসু করাইয়া দীর্ঘদিন একজনের কাছে রাখিয়াছি। নিয়মে না কুলাইলে দুজনের নাম বদলা-বদলি করিয়াছি। তবু বইখানা নিজেদের হাতছাড়া করি নাই। বেশ কিছুদিন এইভাবে রাখিয়াও যখন বাইন্ডিং করার কোনও নিরাপদ পন্থা বাহির করিতে পারি নাই, তখন বাধ্য হইয়া বই ফেরৎ দিয়াছি। প্রিয়জনকে দাফন করিতে গোরস্তানে লইয়া যাইবার সময় মানুষ যেমন শোকে মুহ্যমান থাকে, আমরা দুইজন তেমনি মুহ্যমান অবস্থায় বইখানা ফেরৎ দিতে গিয়াছি।
.
১৬. চোরের উপর বাটপারি
এইভাবে আমরা দুইজন নিজ-নিজ ব্যক্তিগত লাইব্রেরি এত বড় করিয়া ফেলিয়াছিলাম যে, তৎকালে আমাদের সহপাঠী, পরিচিত বা বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে কারো এত পুস্তক-সম্পদ ছিল না। বলা আবশ্যক, আমাদের লাইব্রেরির আয়-ব্যয়, জমা-খরচ ও হ্রাস-বৃদ্ধিও ছিল। অর্থাৎ আমাদের পুস্তকও হারাইয়া যাইত। সে সব পুস্তকও ‘বাইন্ডিং’ হইয়া যাইত কিনা বলা কঠিন। কারণ যাঁরা। আমাদের বই গায়েব করিতেন, তাঁরা আর যাই করুন, বাইন্ডিং করার ফন্দি তাঁদের মস্তিষ্কে ঢোকার কথা নয়। এটা ছিল আমার-শামসুদ্দীনের নিজস্ব আবিষ্কার। আমাদের বন্ধু-বান্ধবরা ছিল সবাই সাধারণ শ্রেণীর মামুলি পাঠক। আমাদের দুইজনের মত ‘প্রতিভাশালী’ কেউ ছিল না। ঐসব মামুলি পুস্তকের কিড়ারা-ফন্দি আবিষ্কারে আমাদের ধারে-কাছে আসিতেই পারে না। কাজেই তাদের চুরি ছিল মামুলি চুরি। ফলে কালে-ভদ্রে আমাদের হারান পুস্তক দু একটা ধরাও পড়িয়াছে। কিন্তু আমাদের চুরি ছিল আর্টিস্টিক। ধরা পড়িবার কোনও সম্ভাবনা ছিল না।
