আমাদের বাংলার শিক্ষক বাবু বিপিন চন্দ্র রায় আমার সাহিত্য-প্রীতির জন্য আমাকে খুবই স্নেহ করিতেন। তিনি আমাকে সব সময়ে উৎসাহ ও উপদেশ দিতেন। রচনার মুনশীয়ানার জন্য তিনি তাঁর সহকর্মী ও বন্ধুদের নিকটও আমার তারিফ করিতেন। আমার সমাস-বহুলতার প্রশংসা করিয়াও তিনি আমাকে মাত্রাধিক্য বর্জন করিতে পরামর্শ দিতেন। আমি তাঁর অন্য সব উপদেশ পালন করিলেও এ ব্যাপারে তা অমান্য করিতাম।
.
১৩. কাব্য-সাধনা
কবিতা না লিখিয়া শুধু গদ্য রচনা করিলে সাহিত্যিক হওয়া যায় না, এই ছিল। তকালের জনমত। বস্তুত সাহিত্যিকের জীবন আরম্ভই হয় পদ্য রচনা হইতে। আমার বেলাও তাই হইয়াছিল। গোপনে-গোপনে কবিতা লিখিয়া বিভিন্ন কাগজে পাঠাইতে লাগিলাম। কোনও দিন ছাপা হয় নাই। ছাপা না হওয়ার দরুন নিজের কবি-প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধা হারাইতাম না। সম্পাদকদের পক্ষপাতিত্ব ও নির্বুদ্ধিতাকেই সেজন্য দায়ী করিতাম।
গ্রামে থাকিতে প্রথমে অবশ্য পুঁথির অনুকরণে মিত্রাক্ষর ছন্দে পয়ার, ত্রিপদী, একাবলি ইত্যাদি মাত্রায় কবিতা লিখিতাম। ময়মনসিংহ শহরে আসিবার পর মাইকেল, নবীনচন্দ্র, হেমচন্দ্র ও কায়কোবাদের বই পড়িবার পর অমিত্রাক্ষর ছন্দে কবিতা লিখিতে শুরু করি। অমিত্রাক্ষর ছন্দে কবিতা লিখিবার নিয়ম প্রচলন করায় মাইকেল ও তার অনুসারী কবিদের প্রতি মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাইলাম। কারণ পয়ার, ত্রিপদীর চেয়ে মিলহীন কবিতা লেখা অনেক সোজা বলিয়াই ছিল তৎকালে আমার বিশ্বাস। পদান্ত মিল সম্বন্ধেও আমার এবং তৎকালীন সমস্ত বন্ধু-বান্ধবের ধারণা স্পষ্ট ছিল না। ‘খালে’ ‘বিলে’ মিল দিতে তখন আমরা লজ্জা পাইতাম না। ময়মনসিংহ শহরে আসিবার পরই সর্বপ্রথম এ বিষয়ে আমার চোখ খোলে। অতুল চন্দ্র। চক্রবর্তী নামক আমাদের বাংলার শিক্ষক একদিন অধম মিলের কবিতাকে বিদ্রূপ করিয়া এই কবিতা আবৃত্তি করেন : কাঁঠালের ঠোঙ্গা নিয়া নাচে নন্দলাল, ফস্ করে নিয়া গেল এক বেটা চিল্। কাঁঠালের’ জায়গায় মিঠাই’ বসাইয়া অনেককেই এই কবিতা পরবর্তীকালে আবৃত্তি করিতে শুনিয়াছি। কিন্তু আমি জীবনের প্রথমে অতুল বাবুর মুখে ইহা এইভাবেই শুনি। অতুল। বাবুর উচ্চারণ ও আবৃত্তি এতই বিদ্রুপাত্মক হইয়াছিল যে, অধম পদান্ত মিলের হাস্যকরতা না বুঝিবার কোনও উপায় ছিল না।
ফলে অতঃপর পদান্ত মিল সংগ্রহে খুবই সাবধান হইলাম। তার ফলে পদান্ত মিল দেওয়া খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার হইয়া গেল। শব্দের তালাশে অভিধানে অভিযান চালাইতে হইল। স্কুল-পাঠ্য ছোটখাটো অভিধানে পোষাইল না। এই সময়ে সমাস-বহুল বৃহত্তম শব্দরচনার উদ্দেশ্যেও অষ্টপ্রহর অভিধান খুঁজিতে হইত। এই দুই কারণে আমি তঙ্কালীন বৃহত্তম দুইটা বাংলা অভিধান ‘প্রকৃতিবোধ’ ও ‘প্রকৃতিবাদ কিনিলাম। শব্দকোষ বা এই নামের একটি অভিধান কিনিল শামসুদ্দীন। এই সব অভিধান ঘাটিয়া এমন সব অজানা নূতন শব্দ আবিষ্কার করিতাম ও গদ্য রচনায় ব্যবহার করিয়া বসিতাম, যার অর্থ অনেক সময় নিজেই বলিতে পারিতাম না। কিন্তু পদান্ত মিল সম্বন্ধে ক্রমে এতটা সচেতন হইয়া গেলাম যে, অর্থহীন শব্দ প্রয়োগের দ্বারা হইলেও পদান্ত মিল সুন্দর করিতে হইবে, ইহাই হইয়া উঠিল আমার মতবাদ। অতুল বাবুর বক্তৃতা শুনিবার এবং এ সম্পর্কে শামসুদ্দীন ও অন্যান্য কবি-বন্ধুর সহিত আলাপ করিবার পর আমার বাল্যের ভুলিয়া-যাওয়া স্মৃতিকথা মনে পড়িল। ছেলেবেলা চাচাজীর মুখে আমাদের বাড়ির মাদ্রাসার মৌলবীদের মুখে এবং বিশেষ করিয়া মৌলবী এরফান আলী নামে আমার এক ফুফাত ভাইয়ের মুখে আমি বহু ফারসি কবিতা শুনিয়াছিলাম। আমি অর্থ না বুঝিয়া তার অনেকগুলি নিজেও আবৃত্তি করিতাম। এতদিনে গুন-গুন করিয়া মনে-মনে আবৃত্তি করিয়া দেখিলাম, ওগুলির পদান্ত মিল অতি সুন্দর। বাংলা কবিতায়, ‘চিল’ ও ‘বিল’, ‘খাল’ ও ‘লাল’ এইরূপ দুই হরফের মিল হইলেই চমৎকার পদান্ত মিল হইল। কিন্তু ফারসিতে বহু কবিতার শেষের চার হরফে পর্যন্ত মিল আছে। কোনও কোনও কবিতার দুইটা লাইনের প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত আগাগোড়াই মিল। তখন লাইনগুলিরও কোন-কোনটা মনে পড়িয়াছিল। কিন্তু এই বুড়া বয়সে এই বই লেখার সময়ে হাজার মাথা কুটিয়াও একটা লাইন বা তার অংশ মনে করিতে পারলাম না। হাতের কাছে ফারসি বইও দু-চারটা নাই যা হইতে দৃষ্টান্ত দেখাইতে পারি। তবু ব্যাপারটা এবং মিলের ধরনটা দেখাইবার জন্য অর্থ নির্বিশেষে কয়েকটি অক্ষর-সমষ্টির উল্লেখ করিতেছি। যথা : ‘গেরেফ তানের’ সঙ্গে ‘সেরেফ খান’, ‘আকরিব’-এর সঙ্গে ফান ফরিব’। পরওয়ারদিগারের সঙ্গে ‘সরওয়ারনিগার’-এর পদান্ত মিল হইলে চমৎকার হইবে। এতে পাঁচ-ছয় অক্ষর হইতে আট-নয় অক্ষর পর্যন্ত মিল হইয়া যাইবে।
পয়ারের দুই পদের আগাগোড়া মিলের লাইন মোটেই মনে পড়িতেছে না। তবে সেটার কল্পিত রূপ এই :
খাতায়ে বুযুর্গান গেরেফতান খাতাস্ত;
আতায়ে হুযুর খান সেরেফ জান আতাস্ত!
শুধু মিল দেখাইবার জন্য এই ‘কবিতা’। কাজেই দুসরা ছতরের অর্থ বুঝিবার চেষ্টা করিবেন না। এই ধরনের পয়ার রচনায় যে কী পরিমাণ মুনশীয়ানা ও শব্দ-জ্ঞান-প্রয়োজন, তা ভাবিয়া বিস্মিত হইতাম। কিন্তু উহার অনুকরণে হাজার চেষ্টা করিয়াও সফল হইতাম না। অথচ অন্তত পাঁচ-ছয় অক্ষরে পদান্ত মিল না দিয়া কবিতা রচনায় মনও উঠিত না।
