হাজী সাহেব নিশ্চয়ই বহুদিন আগেই বেহেশতবাসী হইয়াছেন। আজ প্রায় তার সমান বয়সের বৃদ্ধ হইয়া এখন মনে পড়িতেছে, বৃদ্ধ মিতার ঐ আশীর্বাদ-পত্রখানা আমার সযত্নে রক্ষা করা উচিৎ ছিল। কিন্তু সযত্নে রক্ষা করার বদলে আমি কী করিয়াছিলাম? অতি সাবধানে ও সঙ্গোপনে আমি চিঠিটা পুনঃপুন পড়িলাম। যতই পড়িলাম, ততই মনে হইল, হাজী সাহেবের ঐ চিঠিটা চিৎকার করিয়া আমাকে জনসমক্ষে তিরস্কার করিতেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হইল, চিঠিটা আমার মস্ত বড় একটা কুকর্মের জাজ্বল্যমান সাক্ষী। এই মুহূর্তে ঐ সাক্ষী একদম গায়েব না করিলে যেন আমার আর রক্ষা নাই। কাজেই বিনা দ্বিধায় আমি চিঠিটা টুকরা-টুকরা করিয়া টুকরাগুলি আবার টুকরা করিয়া, আবার টুকরা করিয়া, অতি সাবধানে বাড়ির পুকুরে ডুবাইয়া দিলাম। যতক্ষণ সবগুলি টুকরা ভিজিয়া লুথা ও সাদা হইয়া পানিতে না ডুবিল, ততক্ষণ আমি ঐ স্থান ত্যাগ করিলাম না।
এইভাবে বাহিরের সাক্ষী নিশ্চিহ্ন করিলাম বটে, কিন্তু আমার ভিতরের সাক্ষী ত বাঁচিয়া থাকিল! বহুদিন পর্যন্ত হাজী সাহেবের চিঠিটা সময় পাইলেই আমার চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিত। ঐ চিঠির প্রত্যেক লাইন, প্রত্যেক শব্দ, এমনকি প্রতিটি হরফ, বিকট অট্টহাসিতে আমাকে তিরস্কার করিত। আজ মনে হইতেছে, আমি ভুল বুঝিয়াছিলাম : ওটা তিরস্কার ছিল না, ছিল আশীর্বাদ।
.
১১. উচ্চতর পরিবেশ
১৯১৩ সালে ময়মনসিংহ পড়িতে আসিয়া আমার সাহিত্যচর্চার নিশা আরো বাড়িয়া যায়। বাসায় শামসুদ্দীন ও সাঈদ আলী সাহেবের সাহচর্য এবং স্কুলের শিক্ষকের উপদেশ দুইটাই সাহিত্য-সাধনার অনুকূল ও উপযোগী ছিল। শামসুদ্দীন ও সাঈদ আলী সাহেব নিজেরা বই-পুস্তক কিনিতেন। মাসিক কাগজ লইতেন। সাঈদ আলী সাহেব সম্পর্কে আমার চাচা, বয়সেও কিছু বড়, পড়িতেনও উপরের ক্লাসে। কাজেই সাহিত্য আলোচনা ও রসালাপ তার সাথে হইত না। সেটা সীমাবদ্ধ থাকিত আমার ও শামসুদ্দীনের মধ্যে। তবে সাঈদ আলী সাহেব তার কিনা বই-পুস্তক আমাদেরে পড়িতে দিতেন। আমাদের কিনা পুস্তকও পড়িতে নিতেন। এই সময় আমরা পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া কিনিতাম যাতে তিনজন একই বই কিনিয়া না ফেলি। আমি আগে হইতেই প্রবাসীর গ্রাহক ছিলাম বলিয়া শামসুদ্দীন সুরেশ সমাজপতির সাহিত্য ও সাঈদ আলী সাহেব প্রমথ চৌধুরীর (বীরবলের) সবুজ পত্র-এর গ্রাহক হইলেন। আমি প্রবাসীর ও শামসুদ্দীন সাহিত্য-এরও গ্রাহক হওয়ায় আমাদের সাহিত্যিক মতও যার-তার কাগজের দ্বারা প্রভাবিত হইয়াছিল। কবি হিসাবে আমি রবীন্দ্রনাথের ভক্ত হইলাম। শামসুদ্দীন অক্ষয় বড়ালও ডি এল রায়ের সমর্থক হইল। ফলে এই সময় রবীন্দ্রনাথ নোবেল প্রাইয পাওয়ায় আমি যতটা খুশি হইলাম, শামসুদ্দীন তা হইল না। নিজেরা বই-পুস্তক কিনায়। আমাদের অনেক বন্ধু জুটিল। অবশ্য বন্ধুদের মধ্যে হিন্দুই ছিল বেশি। তাদের সাথে আমাদের বই-পুস্তক আদান-প্রদান হইত। তার ফলে শহরে যাওয়ার এক বছরের মধ্যে আমি বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ, দুর্গেশ নন্দিনী ও রাজসিংহ, রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি, নৌকাডুবি ও গোরা, কালীপ্রসন্ন ঘোষের প্রভাত চিন্তা, নিশীথ চিন্তা, চন্দ্র শেখর করের উদভ্রান্ত প্রেম, কায়কোবাদের অশ্রুমালা ও মহাশোন, মাইকেলের মেঘনাদবধ নবীনচন্দ্রের পলাশীর যুদ্ধ, হেমচন্দ্রের বৃত্রসংহার ইত্যাদি কাব্য-উপন্যাস পড়িয়া ফেলিলাম। এ ছাড়া অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়ের সিরাজদ্দৌলা ও মীর কাসিম ইত্যাদি ইতিহাস গ্রন্থও আমি কিনিয়াছিলাম। মাইকেলের মুসলমান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আমরা কেউ ডা. আবুল হোসেনের যমজভগ্নি কাব্যও কিনিয়াছিলাম। এসব পুস্তক ছাড়া আমি মাস্টার মশায়দের মুখে নাম শুনিয়া স্কটের আইভানহো, টেলিসম্যান, মেরি কোরেলির সরোয-অব-স্যাটান, জর্জ ইলিয়টের অ্যাডাম বিডিইত্যাদি ইংরাজি নভেল স্কুল লাইব্রেরি হইতে আনিয়া পড়িবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। বন্ধু-বান্ধবদেরে দেখাইয়াও ছিলাম যে ঐসব বই আমি বুঝিতে পারি।
.
১২. বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব
লোকমুখে শুনিয়া এবং মুসলমান সাপ্তাহিক খবরের কাগজ পড়িয়া আমি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি খুব বিরূপ ছিলাম। তাকে আমরা মুসলিম-বিদ্বেষী বলিয়াই জানিতাম। দুর্গেশ নন্দিনী ও রাজসিংহ পড়িয়া সে বিষয়ে আমার আর কোনও সন্দেহ থাকিল না। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় খুবই আকৃষ্ট হইয়া পড়িলাম। অবশ্য তৎকালের অন্যান্য লেখক যথা কালীপ্রসন্ন ঘোষ ও চন্দ্রশেখর কর প্রভৃতির ভাষাও খুব ভাল লাগিত। এমনকি বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাস-এর ভাষাও আমার কাছে খুব মধুর লাগিত। এটা আমাদের পাঠ্য বহি ছিল। কিন্তু এঁদের মধ্যে সবচেয়ে মজাদার লাগিল আমার কাছে বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা। বিশেষত দুর্গেশ নন্দিনীর ভাষায় আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম তাঁর বাণী-বন্দনা আমার মুখস্থ ছিল। এটা উদ্ধৃত করিবার সময় আমি ধবল’ কথাটা যোগ করিয়া বলিতাম : হে বাগদেবী, হে কমলাসনে, অমলধবল-কমল-দল-নিন্দিত-চরণ-ভকত-জন বসলে ইত্যাদি ইত্যাদি। বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষকদের কেউ কেউ ঐ ‘ধবল’ শব্দ দুর্গেশ নন্দিনীতে নাই বলিয়া আমার ভুল ধরিতেন। কিন্তু আমি সেদিকে কান দিতাম না। এইভাবে সমাসবহুল শব্দরচনা আমার ও শামসুদ্দীনের তখন একটা নিশা হইয়া গিয়াছিল। আমরা স্কুলের রচনায় এমনকি, পরীক্ষার খাতায়ও সমাসবহুল শব্দ প্রয়োগ করিতাম। প্রতিযোগিতায় আমরা এমনি মাতিয়াছিলাম যে, শামসুদ্দীনের চৌষট্টি হরফের শব্দের জবাবে আমি একশ আট হরফের শব্দ রচনা করিয়াছিলাম। পঞ্চাশ-ষাট হরফের শব্দ ত আমাদের ডাল-ভাত হইয়া গিয়াছিল। এইভাবে আমরা স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রকে হারাইয়া দিয়াছিলাম। কারণ তাঁর সব চেয়ে বড় শব্দেও পঁচিশটার বেশি হরফ নাই।
