কিন্তু তাতে আমি নিরুৎসাহ হইলাম না। আমি হাজী সাহেবের নিকট পঁচিশ টাকা কমিশনের প্রস্তাব করিয়া পোস্টকার্ড লিখিলাম। হাজী সাহেব আমার প্রস্তাবে রাজি হইয়া খুব তাড়াতাড়িই পত্রের জবাব দিলেন। তাতে আমার কী কী পুস্তক কত কপি চাই অতি সত্বর জানাইতে লিখিলেন। আমার আর কোনও সন্দেহ থাকিল না যে, আমার নাম দেখিয়াই হাজী সাহেব অত সহজে আমার প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছেন এবং অতি সত্বর বইয়ের লিস্টি চাহিয়াছেন। আমি কি আর দেরি করি? হাজী সাহেবের তালিকা পুস্তকের প্রায় অর্ধেক বইয়ের নাম লিখিয়া ফুলস্কেপ কাগজের এক শিট ভরিয়া ফেলিলাম এবং সেটা ইনভেলাপ ভরিয়া পোস্ট মাস্টারের পরামর্শে অতিরিক্ত টিকিট লাগাইয়া পাঠাইয়া দিলাম। পুস্তকের বদলে আরেকটি চিঠি পাইলাম। তাতে হাজী সাহেব জানাইয়াছেন যে, অর্ডারি পুস্তকের মোট দাম হাজার টাকার উপরে হইবে; অত টাকার পুস্তক বিনা-অগ্রিমে পাঠানোর নিয়ম নাই। অতএব পত্র পাওয়ামাত্র যেন আমি শতকরা পঁচিশ টাকা অগ্রিম হিসাবে অন্তত আড়াই শ টাকা মনি-অর্ডারযোগে হাজী সাহেবের নিকট পাঠাইয়া দেই। ঐ টাকা পাইয়াই হাজী সাহেব আমার নামে সমস্ত বই পাঠাইয়া দিবেন। অবশ্য অগ্রিম পাওয়া বাদ দিয়াই তিনি পুস্তক ভি পি করিবেন।
এই পত্র পাইয়া আমার মাথা ঘুরিয়া গেল। কোথায় হাজী সাহেব নিজে দিবেন আমাকে শতকরা পঁচিশ টাকা কমিশন। তা না করিয়া তিনি এখন আমারই নিকট শতকরা পঁচিশ টাকা অগ্রিম চাহিয়া বসিয়াছেন? নিশ্চয়ই কোথাও বুঝিবার কোনও ত্রুটি হইয়াছে। কিন্তু কোথায়? হাজী সাহেব যে লিখিয়াছেন ভি পি করিবেন, সে কথারই বা অর্থ কী? বড় ভাবনায় পড়িলাম। যিনি এ বিষয়ে আমাকে পরামর্শ দিতে পারিতেন, সেই আতিকুল্লাহর কাছে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। কারণ ব্যাপারটা তার কাছে গোপন রাখিয়াছি। তার কাছে শিক্ষা পাইয়া, তারই নিকট হইতে তালিকা আনিয়া তাঁরই ব্যবসাটা নিজের হাতে লইয়া আসিতেছি, এটা জানিলে আতিকুল্লাহ ভাই মনে কষ্ট পাইবেন বলিয়াই ব্যাপারটা তাকে জানিতে দেই নাই। এখন তার কাছে যাওয়াটা বড়ই লজ্জার ব্যাপার হইবে। কাজেই নিজেই বুদ্ধি করিয়া হাজী সাহেবের চিঠির জবাব দিলাম। এইরূপ লিখিলাম : ‘আমি আপনার মিতা, এ কথা ভুলিবেন না। বিনা অগ্রিমে বই পাঠাইয়া দেন। বই বিক্রয় করিয়াই টাকা পাঠাইয়া দিব। আল্লাহর ওয়াস্তে মিতাকে বিশ্বাস করুন। হাজী সাহেবের জবাব পাইলাম। তিনি লিখিয়াছেন : কোনও বয়স্ক ও বিশ্বাসী লোক যামিন না হইলে তিনি অত টাকার বই বিনা-অগ্রিমে বাকি দিতে পারেন না বলিয়া তিনি খুবই দুঃখিত।
.
১০. বৃদ্ধ মিতাজির দোওয়া
চিঠিটা পাইয়া আমি চমকিয়া উঠিলাম। বয়স্ক লোকের যামিনের কথা হাজী সাহেব লিখিলেন কেন? তবে কি তিনি ধরিয়া ফেলিয়াছেন যে আমি নয় বছর বয়সের ক্লাস থ্রির ছাত্র? বড় ভাবনায় পড়িলাম। এখন করা যায় কী? এতদূর অগ্রসর হইয়া পিছাইয়া পড়া বড়ই লজ্জা ও অপমানের বিষয় হইবে। অনেক চিন্তা-ভাবনা করিয়া বুঝিলাম, মিতা হওয়ার কথাটা হাজী সাহেব বিবেচনা করিয়াছেন। তাই আমাকে বাকি দিতে না পারিয়া তিনি দুঃখিত হইয়াছেন। তা হইলে বাকি দিবার ইচ্ছা হাজী সাহেবের আছে। শুধু আমাকে নাবালক সন্দেহ করিয়াই হাজী সাহেব দ্বিধায় পড়িয়াছেন কিন্তু আমি যে সত্যই নাবালক সেটা হাজী সাহেবের সন্দেহমাত্র। এই সন্দেহ দূর হইলেই তিনি আমাকে বাকি দিবেন। অতএব আমি লিখিলাম : মিতাজি, আপনি আমার বয়স সম্বন্ধে ভুল বুঝিয়াছেন। আমি নাবালক ছাত্র নই। আমি পঁয়ষট্টি বছর বয়সের বৃদ্ধ। আমি আহমদীয়া লাইব্রেরির মালিক। এটা খুব বড় পুরাতন পুস্তকের দোকান।
দাদাজীর আনুমানিক বয়সটাই নিজের বয়সরূপে চালাইয়া দিলাম। কম্পিত বুকে চিঠিটা পোস্ট করিলাম। জবাবের আশায় প্রবল আগ্রহে কানখাড়া রাখিলাম। দুই-একদিন পর-পর পোস্টাফিসে খবর লইতে লাগিলাম। শেষ পর্যন্ত জবাব আসিল। কিন্তু এবারের চিঠি বরাবরের মত পোস্টকার্ডে না। তার বদলে নীল রঙের ইনভেলাপ। কম্পিত হস্তে চিঠিটা খুলিলাম। চিঠিটা নীল রঙের। বরাবর কার্ডের লেখা থাকে এক হাতের, দস্তখতটা অন্য হাতের। দস্তখতের নিচে রবার স্ট্যাম্প মারা। ইতিমধ্যে আতিকুল্লাহর নিকট আমি রবার স্ট্যাম্প দেখিয়াছি। কিন্তু এবারের নীল রঙের পত্রটা আগাগোড়া এক হাতের লেখা। তাতে কোনও রবার স্ট্যাম্প নাই। আমি একদমে চিঠিটা পড়িয়া ফেলিলাম। চিঠিতে আমাকে সম্বোধন করা হইয়াছে। এইভাবে : ‘আমার প্রাণের ক্ষুদে মিতাজি’। তারপর আমার শতকোটি আন্তরিক দোওয়া-স্নেহ জানিবা,’ বলিয়া শুরু করিয়া বিশেষ স্নেহপূর্ব মোলায়েম ভাষায় লিখিয়াছিলেন, তার সব কথা মনে নাই। কিন্তু তার সারমর্ম ছিল এইরূপ : এত অল্প বয়সে পুস্তক বিক্রয় বা অন্য কোনও ব্যবসায়ের দিকে খেয়াল না দিয়া আমি যেন মন দিয়া লেখাপড়া করি। হাজী সাহেবের দৃঢ় আশা ও বিশ্বাস, আমি যদি মন দিয়া পড়াশোনা করি, তবে আমি ভবিষ্যতে পুস্তকের দোকানদারি না করিয়া পুস্তকের লেখক হইতে পারিব। তিনি এই মর্মে আল্লার দরগায় সর্বদাই মোনাজাত করিতেছেন। পত্রের নিচে তিনি লিখিয়াছেন : দোওয়াগো তোমার বৃদ্ধ মিতা। তার নিচেই বরাবরের মত দস্তখত।
