দেশভাগের এটাই তাৎপর্য। এই কারণেই অখণ্ড বাংলায় আমরা মুসলমানরা যে কলিকাতা-কেন্দ্রিক সাহিত্য-সাধনা করিতেছিলাম, দেশ ভাগের পরের ঢাকা-কেন্দ্রিক সাহিত্য তার থনে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক নবজীবনের সাধনা। এই কারণেই আমার সাহিত্যিক জীবনকে দুই আলাদা খণ্ডে বিচার বিবেচনা করিয়াছি। ঢাকার সাহিত্য-সাধনা কলিকাতার সাহিত্য-সাধনার বিকাশ, উন্নতি ও পরিণাম নয়। নয়া জাতির জন্মে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবেই আমাদের এটা নবজীবন, নয়া জিন্দিগি।
.
২. শৈশবের খোরাক পুঁথি
আমাদের নিজেদের বাড়িতে এবং দুই মামুর বাড়িতে পুঁথি পড়ার খুব চর্চা ছিল। চাচাজী মুনশী ছমিরুদ্দিন ফরাযী, দুই মামু হোসেন আলী ফরাযী ও ওছমান আলী ফকির নামযাদা পুঁথি-পড়ুয়া ছিলেন। তিনজনের গলাই খুব মিঠা ছিল। ওছমান আলী ফকির সাহেবের গলা খুব দায় ও বুলন্দ ছিল। বিবাহ মজলিসে, ছোট-বড় যিয়াফতে, এমনকি ওয়াযের মজলিসের শেষে, নিয়মিতভাবে পুঁথি পড়া হইত। সাধারণত গুরুগম্ভীর বা ধর্ম-ভাবের সভায় কাছাছুল আম্বিয়া, আমির হামযা, শাহনামা, শহীদে-কারবালা, জঙ্গনামা, ফতুহশোমইত্যাদি কেতাব পড়া হইত। এ ছাড়া বিবাহ-মজলিসে, ছোটখাটো মেহমানিতে আলেফ-লায়লা, হাতেম-তাই, লায়লি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, বাহার-দানেশ, চাহার-দরবেশ, সূর্য-উজাল, জইগুন ও সোনাভানের কিচ্ছা, তুতিনামা ইত্যাদি হরেক রকমের পুঁথি পড়া হইত। চাচাজী মুনশী মানুষ ছিলেন বলিয়া তিনি বাছাই করা মজলিসে বাছাই করা পুঁথি পড়িতেন। কিন্তু মামুদের বেলা সে রকম কোনও বিধিনিষেধ ছিল না। সকল রকম মজলিসেই তাঁদেরে ডাকা হইত। যাইতেনও তাঁরা। পড়িতেনও হরেক রকমের পুঁথি। পার্শ্ববর্তী হিন্দুপাড়ায় যেমন মাঝে-মাঝে রাতভর কীর্তন হইত, আমাদের গ্রামের মুসলমান পাড়ার অনেক বাড়িতে তেমনি সারারাত পুঁথি পড়া হইত। এমন অনেক দিন গিয়াছে, যখন হিন্দুবাড়ির কীর্তনের লাইন : ‘কালা ত আইল না, কালা ত আইল না’ শুনিতে-শুনিতে ঘুমাইয়া পড়িয়াছি এবং ফযরে যখন ঘুম ভাঙ্গিয়াছে তখনও শুনিয়াছি ভাঙ্গা গলায় গাওয়া হইতেছে : কালা ত আইল না। ঠিক সেইরূপ, এমন অনেক রাত গিয়াছে, যেদিন ‘ওছি মামুর সুর করা দরা গলার ‘এতেক কহিল যদি আলী পালোয়ান, গোস্বায় জ্বলিয়া গেল বীর হনুমান’ শুনিতে-শুনিতে ঘুমাইয়া পড়িয়াছি আবার ফযরে ‘গোস্বায় জ্বলিয়া গেল বীর হনুমান’ শুনিয়াই ঘুম ভাঙ্গিয়াছে।
.
৩. পুঁথির নিশা
এই পুঁথি পড়ায় আমি এত প্রভাবিত হইয়াছিলাম যে সাত-আট বছর বয়সে আমিও একজন মজলিসি পুঁথি-পড়ুয়া হইয়া গেলাম। চাচাজী ও মামুরা পুঁথি পড়িতে পড়িতে ক্লান্ত হইলে আমাকে বদলি দিতেন। এইভাবে অল্পদিনেই স্বাধীন পড়ুয়া হইয়া গেলাম। ছেলেবেলা সকলেরই স্মরণশক্তি খুব প্রখর থাকে। আমারও ছিল। অনেক পুঁথির পৃষ্ঠাকে-পৃষ্ঠা আমার মুখস্থ হইয়া গিয়াছিল। স্কুলে যাইবার কালে পথেঘাটে এবং খেলা করিতে গিয়া মাঠে উচ্চসুরে এইসব আবৃত্তি করিতাম। ক্ষেতে কাজ করিবার সময় চাষিরা এবং গরু রাখিবার সময় রাখালরা যেমন গলা ছাড়িয়া ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া গান গাইত, আমিও তেমনি তাদের সাথে পাল্লা দিয়া গলা ছাড়িয়া পুঁথি পড়িতাম। পুঁথি পড়ায় আমি এমন অভ্যস্ত হইয়া গেলাম যে, এক পুঁথি পড়িতে-পড়িতে অন্য পুঁথির অনুরূপ দু-চার ছতর ঢুকিয়াইয়া দিতাম। শ্রোতারা টেরও পাইত না। এই অভ্যাস শেষ পর্যন্ত এমন হইল যে, পুঁথি পড়িতে-পড়িতে আমি এক্সটেমপোর স্বরচিত দু-চার লাইন ঢুকাইয়া দিতাম। আস্তে আস্তে এ কথা জানাজানি হইয়া গেল। এক কথা একশ কথা হইয়া প্রচারিত হইল। আমার সাহস ও উৎসাহ বাড়িয়া গেল। আমি পুঁথি রচনায় হাত দিলাম। সে সব লেখা অবশ্য আমি ছাড়া আর কেউ পড়ে নাই। কিন্তু নিজেই ঐসব পড়িয়া নিজেকে বাহবা দিতাম।
.
৪. গদ্য সাহিত্যের সাথে পরিচয়
ধানীখোলা পাঠশালায় আমার পড়া শেষ হওয়ায় আমি পুঁথি ছাড়া অন্য রকম বই-পুস্তক পড়িবার সুযোগ নাই। তার মধ্যে যশোহরের মুনশী মেহের উল্লার মেহেরুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জের মুনশী মেহেরুল্লার নসিহত নামা ও ময়মনসিংহের মওলানা খোন্দকার আহমল আলী আকালুবীর শুভ জাগরণ কবিতার বই, দারোগার দপ্তর নামে ডিটেকটিভ গল্পের মাসিক এবং প্রবাসী নামক মাসিক পত্র এবং বঙ্গবাসী, মিহির ও সুধাকরনামক সাপ্তাহিক কাগজের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সম্ভবত ১৯০৭-০৮ সালে ময়মনসিংহ শহরে মুসলিম শিক্ষা সম্মিলনী নামে খুব বড় একটি সভা হয়। চাচাজী ও এ অঞ্চলের অনেক মাতব্বর ও আলেম-ফাযেল ঐ সভায় যোগদান করেন। চাচাজী ঐ সম্মিলনী হইতে অনেক কাগজ-পত্র ও বই-পুস্তক নিয়া আসেন। তাতে বাংলা ইংরাজি দুইই ছিল। ইংরাজি পড়িতে পারি নাই। কিন্তু বাংলাগুলি রাক্ষসের ক্ষুধা লইয়া পড়িয়াছিলাম। তার সব কথা মনে নাই। শুধু মনে আছে, মি. শার্প নামে এক ইংরাজ সাহেব মুসলমানদের শিক্ষার কথা বলিয়াছিলেন। আর মনে আছে, করটিয়ার খান পন্নি ও জঙ্গলবাড়ি-হায়বতনগরের দেওয়ান সাহেবদের কয়েকজনের নাম ছাপার হরফে দেখিয়াছিলাম। তাঁদের মধ্যে ওয়াজেদ খান পন্নি ও দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁর নাম মনে ছিল। আর সব ভুলিয়া গিয়াছিলাম। এর পর সম্ভবত ১৯০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বৈলর বাজারে এক বিরাট সভা হয়। তাতে আমি ভলান্টিয়ার ছিলাম এবং কিছু বই-পুস্তক কিনিয়া ফেলিয়াছিলাম। সিরাজগঞ্জের মুনশী মেহেরুল্লা সাহেব এই সম্মিলনীর প্রধান বক্তা ছিলেন। তার বই-পুস্তক এই সভাতেই বিক্রয় হইয়াছিল।
