স্মরণীয় ব্যাপার এই যে, ইংরাজ আমলের দুইশ বছরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে বিপুল ও সার্বিক উন্নতি সাধিত হইয়াছিল, ঐতিহাসিক কারণে তার মোল আনা উদ্যোগ ও কৃতিত্ব ছিল হিন্দুদের। মুসলমানদের তাতে কোনও অংশদারিত্ব ছিল না। ফলে খুব স্বাভাবিক কারণেই এই উন্নত বাংলা সাহিত্যের গোটা চেহারাটাই ছিল হিন্দুদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষ্টির রূপায়ণ। শরিক হিসাবে বাঙ্গালী মুসলমানেরা সেখানে শুধু অনুপস্থিতই ছিল না, ঐ সাহিত্যের তারা বাঙ্গালী বলিয়া স্বীকৃতই ছিল না। এসব কথাই দুই খণ্ডের যথা-যথাস্থানে আলোচিত হইয়াছে।
কিন্তু এখানে উল্লেখযোগ্য এই যে, বাংলা-সাহিত্যের এই চেহারার জন্য হিন্দুরাই এমন দোষী ছিলেন না। মুসলমানদের এই সাহিত্যিক অবমূল্যায়নের জন্য তারা নিজেরাও কম দায়ী ছিলেন না। বিশ শতকের গোড়া হইতেই দেশে গণতান্ত্রিক জাগরণের ফলে দেশের জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে মুসলমানদের পুনরুজ্জীবনের যে লক্ষণ সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল, সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তা প্রতিফলিত হইতে শুরু করিয়াছিল। রাজনৈতিক কারণে দেশভাগ না হইলে গোটা বাংলার ভাষিক ও সাহিত্যিক জীবনে বাঙ্গালী মুসলমানদের গণতান্ত্রিক দাবি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংঘাত-সংগ্রামের আকারেই দেখা দিত। বস্তুত সে প্রসেস শুরু হইয়াই গিয়াছিল। গোড়ার দিকে কিছু কাল তাতে মতবিরোধ, বিতর্ক, অপ্রিয়তা, ভুল বুঝাবুঝি, এমনকি সাম্প্রদায়িক সংঘাত, দুর্নিবার অবশ্যম্ভাবী হইলেও শেষ পর্যন্ত একটা সমঝোতা অবশ্যই হইত। স্পষ্টতই এবং দৃশ্যতই এটা কঠিন ছিল। রাজনৈতিক বিবর্তনের মত সাহিত্যিক পরিবর্তন অত সহজ হইত না। রাজনীতিতে ফজলুল হকের জন্ম হওয়া যত সহজ, সাহিত্য-ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ পয়দা হওয়া তেমন সহজ নয়। বাঙ্গালী মুসলমানদের মুখের ভাষাকে হিন্দুরা বিশুদ্ধ বাংলাভাষা বলিয়া স্বীকার করিত না। মুসলমানদের ধর্ম-কৃষ্টি-সম্পর্কিত আরবি-ফারসি-জাত শব্দাবলিকে হিন্দু লেখকরা এবং সরকারি শিক্ষা-বিভাগ বাংলা শব্দ হিসাবে গ্রহণ করিতে ত রাজি ছিলেনই না, তাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত অন্য শব্দগুলিও হিন্দুরা সাহিত্যে স্থান। দিতে আপত্তি করিতেন। হিন্দুদেরও সরকারি শিক্ষা বিভাগের এই অস্বীকৃতির ভয়ে স্বয়ং মুসলমান লেখকরাও গোড়াতে সেসব শব্দ বর্জন করিয়া চলিতেন। এসব শব্দের ও বাক্যের সাহিত্যিক স্বীকৃতি পাইবার জন্য যে ধরনের অসাধারণ প্রতিভাধর লেখকের দরকার, নজরুল ইসলামের আগে অমন প্রতিভাবান মনীষী মুসলমানদের মধ্যে আবির্ভূত হন নাই। স্বয়ং নজরুল ইসলামের প্রতিভাও হিন্দুরা সোজাসুজি স্বীকার করেন নাই। মুসলিম ভারত, সওগাত, নওরোজ ইত্যাদি মুসলমান-পরিচালিত কাগজে লিখিয়া ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের রেকর্ডে গান গাহিয়া নজরুল ইসলাম জনপ্রিয়তা অর্জন করিবার পরেই হিন্দু লেখক-সম্পাদকরা নজরুল ইসলামকে মর্যাদা দিয়াছিলেন। এ মর্যাদা দানের মধ্যেও জাতীয় উদারতা ছিল না, ছিল সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা। কারণ সে স্বীকৃতিও ছিল মুসলমান কবি হিসাবেই, জাতীয় কবি হিসাবে নয়।
তবু দেশভাগ না হইলে এই প্রসেস চলিতে থাকিত এবং কালক্রমে গণতন্ত্রের নিজস্ব জোরেই তার গতিবেগ ও জোর বাড়িত। সব রকমের ভেস্টেড ইন্টারেস্টের স্বাভাবিক বিরোধের মতই সাহিত্য হিন্দু ভেস্টেড ইন্টারেস্টের প্রতিরোধও স্বভাবতই বাড়িত। কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভেস্টেড ইন্টারেস্টের চেয়ে কালচারের ভেস্টেড ইন্টারেস্ট কম শক্তিশালী নয়, বরঞ্চ বেশি। বাংলার মুসলিম সাহিত্যিক জাগরণের মোকাবিলা হিন্দু প্রতিরোধের এই অনমনীয়তা লক্ষ্য করিয়াই আমি ১৯৪৩ সালে এক সাহিত্য সভায় হিন্দু লেখকদের সম্বোধন করিয়া বলিয়াছিলাম : রাজনৈতিক পাকিস্তান হইবে কিনা জানি না, কিন্তু আপনারা বাংলার মেজরিটি মুসলমানের মুখের ভাষাকে বাংলা সাহিত্যে যেমন উপেক্ষা করিয়া চলিয়াছেন, তাতে বাংলায় সাহিত্যিক পাকিস্তান হইতে বাধ্য।
কিন্তু সে সংঘাতের পথে আমাদের যাইতে হয় নাই। তার আগেই দেশভাগ হইয়া গিয়াছে। দৃশ্যত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে দেশভাগ হইয়াছে। মনে হইবে। কিন্তু একটু গভীরে তলাইয়া দেখিলেই বুঝা যাইবে যে এ বিভাগের আসল কারণ ছিল কৃষ্টিক। বিশ শতকে এটা প্রমাণিত ও স্বীকৃত হইয়াছে যে, রাজনৈতিক পরাধীনতা মানব-মনের যে ক্ষতি করে, কৃষ্টিক পরাধীনতা ক্ষতি করে তার চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই সাহিত্যে দুইশ বছরের হিন্দু প্রাধান্যের অবসান ঘটাইয়া বাংলার গণতন্ত্রের জোরে মুসলিম-প্রাধান্য প্রবর্তন করিলে সেটা হইত হিন্দুর উপর অবিচার। তার বদলে দেশভাগ হইয়া বাংলার হাজার বছরের দুইটা সমান্তরাল কালচারের স্বকীয়তা রক্ষা বৃদ্ধি ও উন্নয়নের নিশ্চিত ব্যবস্থা হইয়াছে। ভালই হইয়াছে। পূর্ব বাংলায়, পূর্ব পাকিস্তানে এবং বর্তমানের বাংলাদেশে মুসলিম-প্রধান বাঙ্গালী কৃষ্টি ও সাহিত্যের নয়া বাগিচা, নূতন প্রাসাদ, নবীনদুর্গ গড়ার সুযোগ হইয়াছে। অথচ এটা করিতে গিয়া হিন্দু-কৃষ্টি সাহিত্যের কলিকাতা-কেন্দ্রিক বাগিচা বা দুর্গ ভাঙ্গার কোনও দরকার থাকে নাই। মুসলমানের হাতে সেটা ভাঙ্গা অশোভন ও হিন্দুর মনে পীড়াদায়ক হইত। আধুনিকতা ও গণতান্ত্রিক দাবিতে ও প্রয়োজনে তার যদি সংস্কার অথবা কোনও অংশ ভাঙ্গার দরকার হয়, তবে সেটা হিন্দুরা নিজেরাই নিজ হাতে করিবে, এটাই ভাল। বিশ শতকের চতুর্থ-পঞ্চম দশকে হক মন্ত্রিসভা কলিকাতা ভার্সিটি জমিদারি-মহাজানি প্রথাসমূহের মত হিন্দু কৃষ্টি ভাঙ্গিবার যেসব চেষ্টা করিয়াছিলেন, হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাতে বাধা দিয়াছিলেন। কিন্তু দেশ বিভাগের পর তারা নিজেরাই সেসব দুর্গ ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছেন। অখণ্ড বাংলার অস্থায়ী ও সাময়িক মুসলিম-প্রাধান্যের মুহূর্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উপলক্ষে মুসলিম দাঙ্গাকারীরা হিন্দুদের মূর্তি-মন্দির ভাঙ্গিয়া ফেলিত। ঐ উপলক্ষে আমার এক শ্রদ্ধেয় কংগ্রেসি হিন্দু বন্ধু আমাকে বলিয়াছিলেন : “তোমরা মুসলমানরা আমাদের সমাজ-সংস্কারে বাধা দিতেছ। আমরা হিন্দুরা নিজেরাই সেসব মূর্তি ভাঙ্গিয়া ফেলিব স্থির করিয়াছিলাম, তোমরা মুসলমানরা সেগুলি ভাঙ্গিতেছ বলিয়া আমরা একটার জায়গায় আরো দশটা বানাইতেছি।’ কথাটার অনেকখানি সত্য। এর অন্তর্নিহিত সত্যটা লক্ষণীয়।
