.
৫. শৈশবে সম্পাদকতা
পাঠশালার ছাত্র হইয়াও আমি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র পড়িতাম, এমনকি, ডিটেকটিভ গল্পের বইও পড়িতাম, এ কথা আজকালকার তরুণ পাঠকদের বিশ্বাস হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের ছেলেবেলা এটা কোনও অসাধারণ ব্যাপার ছিল না। আমার সহপাঠীদের অনেকেই তা করিত। তরুণ পাঠকরা শুনিয়া হয়ত আরো বিস্মিত হইবেন যে, আমার অন্যতম সহপাঠী শামসুদ্দীন (বর্তমান প্রবীণ সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন) ও আমি নিম্ন প্রাইমারি পাঠশালার শেষ বছর দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়িবার সময় মঞ্জুষা নামে একটি সংবাদ-সাহিত্য-পত্র বাহির করিয়াছিলাম। এটি স্বভাবতই হইল হাতের লেখা। সম্পাদক-লেখকও হইলাম আমরা দুইজনই। সম্পাদক মানে সত্যই সম্পাদক। কিন্তু লেখক মানে রাইটার’ নয় কপিস্ট। ছাপার বদলে যা করিতে আমরা বাধ্য ছিলাম। প্রথমে ইচ্ছা ছিল সাপ্তাহিক মঞ্জুষাকরা। সম্পাদনা মানে নিজেদের মৌলিক রচনা নয়, সাপ্তাহিক বিভিন্ন সংবাদপত্র হইতে পছন্দমত নকল করা। এ কাজও কঠিন ও শ্রমসাধ্য বিবেচিত হওয়ায় সাপ্তাহিকের বদলে মাসিক মঞ্জুষা বাহির হইল। শেষ পর্যন্ত সারা বছরে দুই-তিন সংখ্যার বেশি বাহির হইতে পারিল না। তবু চেষ্টা ত করিয়াছিলাম।
আসলে তৎকালে বাংলা ও অঙ্ক শিক্ষার মানই অনেক উন্নত ছিল। ইংরাজি শিক্ষার বোঝা ছিল না। দ্বিতীয় শ্রেণীর শেষ কয়মাস স্পেলিং বুক নামে একটি ছোট্ট বই ছিল মাত্র। আরবি-ফারসি ও বাড়িতেই পড়ার নিয়ম ছিল। সে জন্য বাংলা বই-পুস্তক যা কিছু সামনে পড়িত, তা পড়িতে চেষ্টা করিতাম, পারিতামও। যেসব শব্দ বুঝিতাম না, চাচাজীকে জিজ্ঞাস করিতাম। তিনি না পারিলে মাস্টার সাবকে জিগাইয়া বুঝিয়া নিতাম। তা-ও না হইলে কাল্পনিক অর্থ করিয়া সন্তুষ্ট হইতাম। কাল্পনিক অর্থগুলিই অনেক সময় বেশি রোমাঞ্চকর হইত।
এরপর দাদাজীর নামে মিহির ও সুধাকর নামে একটি সাপ্তাহিক কাগজ আসিতে শুরু করে। আমাদের প্রতিবেশী এবং সম্পর্কে চাচা ওসমান আলী সরকার (পরে খান সাহেব ওসমান আলী) এই সময় বঙ্গবাসীর গ্রাহক ও আমার মামু হুসেন আলী ফরাযী হিতবাদীর গ্রাহক হন। আমি এই তিনখানা সাপ্তাহিকই নিয়মিতভাবে পড়িতাম। পাঠশালার পড়া শেষ করিয়া দরিরামপুর মাইনর স্কুলে যাওয়ার পর গদ্য সাহিত্য পড়িবার সুযোগ আরো বেশি বাড়ে। পূর্বোক্ত ওসমান আলী সাহেব সাপ্তাহিক বঙ্গবাসীছাড়া দারোগার দপ্তর নামক একটি মাসিক পত্রিকার গ্রাহক ছিলেন। ওসমান আলী সাহেবের ছোট ভাই সাদত আলী আমার সাথে দরিরামপুর স্কুলে পড়িতেন। তিনি বড় ভাই-এর দারোগার দপ্তর গোপনে আনিয়া আমাকে পড়িতে দিতেন। দরিরামপুর স্কুলে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার কৈলাস বাবু আমাকে প্রবাসীর গ্রাহক করিয়া দেন। এইভাবে আমি পুঁথিপাঠ হইতে গদ্য বই-পুস্তক পড়িতে শিখি। চাচাজী এই সময় একটি বিষাদ-সিন্ধু কিনেন। তিনি বৈঠকখানায় বসিয়া লোকজনকে এই ‘গদ্যে শহীদে কারবালা পড়িয়া শুনাইতেন।
এই সব বইয়ের মধ্যে দারোগার দপ্তর পড়িয়া আমি খুবই মুগ্ধ হই। কয়েক সংখ্যা দারোগার দপ্তর পড়িয়াই আমি নিজে পরপর কয়েকটি ডিটেকটিভ গল্প লিখিয়া ফেলি। সাদত ও শামসুদ্দীন উভয়েই আমার গল্পের তারিফ করে। কাজেই ছাপাইবার জন্য ঐসব গল্প দারোগার দপ্তর অফিসে পাঠাই। স্বভাবতই একটাও ছাপা হয় নাই। কাজেই বাংলা সাহিত্যের পাঠকরা আমার ঐ ডিটেকটিভ গল্প পাঠ হইতে একদম বঞ্চিত না হন, সেজন্য এসব গল্পের একটির সারমর্ম এখানে উল্লেখ করিতেছি : খুনি নিহত লোকটাকে অন্ধকারে ছুরি মারিয়া খুন করে। তদন্তকারী দারোগা কিছুতেই খুনের আশকারা করিতে পারেন না। অবশেষে খুনি আরো লোক খুন করিবে বলিয়া দারোগা বাবুকে চ্যালেঞ্জ করিয়া পত্র দেয়। সেই পত্রে প্রথমে সে নিজের নামই লিখিয়াছিল। পরে চিন্তাভাবনা করিয়া সাবধানতা হিসাবে নিজের নাম কাটিয়া সে স্থলে লেখে ‘তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী। নামটি সে কাটিয়াছিল বটে, কিন্তু একটু নজর দিয়া পড়িলেই তার পাঠোদ্ধার করা সম্ভব ছিল। দারোগা বাবু কাটা নামটি পড়িতে সমর্থ হন এবং খুনিকে গ্রেফতার করেন। এইভাবে খুনের ঐ ‘গভীর রহস্য উদঘাটিত হয়।
.
৬. কৈলাস বাবুর প্রভাব
কৈলাস বাবু ছিলেন কবি, সাহিত্যিক ও গায়ক। তার কয়েকখানা কবিতার বই ছাপা হইয়াছে। দরিরামপুরে আমাদের শিক্ষকতা করিবার সময় তিনি ছাত্রদের অভিনয়োপযোগী নারী চরিত্রহীন নাটক লিখিতেন। তাতে যে সব গান থাকিত তার সবই তাঁর নিজের রচিত। এই সব নাটক তিনি আমাদের দিয়া অভিনয় করাইতেন। নাটকের বিষয়বস্তু ছাত্রদের প্রতি উপদেশ। যথা : সত্যের পুরস্কার’, ‘মিথ্যাবাদীর শাস্তি’, ‘কুসংসর্গের পরিণাম’। এসব নাটকের মূল চরিত্র ভাল ছাত্রের পার্ট তিনি আমাকে দিয়াই করাইতেন। তিনি আমাকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁরই চেষ্টায় আমি রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী প্রাইম পাই। মোট কথা, তারই প্রেরণায় আমার। মনে কবি-সাহিত্যিক হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগে।
.
৭. আতিকুল্লাহ
বন্ধুবর আতিকুল্লাহর গুণের কথা ইতিপূর্বেই বলিয়াছি। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের ফলে কী মজার ব্যাপার ঘটিয়াছিল, তাই এখানে বলিতেছি। আতিকুল্লাহর সঙ্গে আমার পরিচয় একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ার পরই তিনি একদিন আমাকে তাঁর বাসায় নিয়া যান। এরপরও অনেক দিন আমি তার বাসায় গিয়াছি। কিন্তু আমি প্রথম দিনের কথাই এখানে বলিতেছি। আতিকুল্লাহ নিকটবর্তী এক বাড়িতে যায়গীর থাকিতেন। আমাকে সেখানে নিয়া যখন তাঁর থাকার ঘরটা দেখাইলেন, আমি অবাক হইয়া গেলাম। ঘরের সামনে দাঁড়াইতেই প্রথমে নজর পড়িল ঘরের দরজার কাঠে কপাট জুড়িয়া একটা কাগজ সাঁটা আছে। তাতে সবুজ ও লাল কালিতে সুন্দর বড়-বড় হরফে লেখা আছে : ‘আতিকিয়া। লাইব্রেরি। আরো কাছে গিয়া দেখিলাম, অপেক্ষাকৃত ছোট হরফে লেখা আছে : ‘এইখানে পাওয়া যায়। তারও নিচে আরো ছোট-ছোট হরফে দুই সারিতে শতাধিক পুস্তকের নাম ও দাম লেখা আছে। পুস্তকের নামের সারিদ্বয়ের নিচে একটু বড় হরফে লেখা আছে : ‘এতদ্ভিন্ন অর্ডার পাইলে যে কোনও পুস্তক কলিকাতার দরে সরবরাহ করা হয়।’
