.
৮. ধর্মের রুহানিয়াত অব্যয়
দৈহিক শৈশবের নফলিয়াত দিয়া আমার ধর্ম-জীবনের কাহিনী শুরু করিয়াছিলাম। আত্মিক শৈশবের রুহানিয়াত দিয়া তা শেষ করিতেছি। যেখান হইতে শুরু সেখানেই শেষ ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। কুল্লু শাইয়েন ইয়ারজুউ ইলা আসলেহি। আলিমুল-গায়েবের কাছে মানুষ সারা জীবনই শিশু। তরুণ শিশু ও বৃদ্ধ শিশু, এই যা পার্থক্য। সারা জীবন জ্ঞান আহরণ করিয়া এই জ্ঞান লাভ করিলাম যে এক পরমাণু জ্ঞানও লাভ করিতে পারি নাই। আইনস্টাইনের সাথে এই কথা বলিতে পারাই জ্ঞানীর লক্ষণ। এই জ্ঞানটুকুও আমরা লাভ করি সারা জীবনে ক্রমবিকাশের মাধ্যমে। জ্ঞানের যৌবনে আমরা পাঁচ ইন্দ্রিয় ছাড়া আর কারো সাক্ষ্য মানি না। বার্ধক্যে পৌঁছিয়া ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সত্তা উপলব্ধি করি। জ্ঞানের যৌবনে যারা মোরাকেবা, মোশাহেদা, তাসাওওয়াফ ও যোগাসনকে কুসংস্কার বলেন, জ্ঞানের বার্ধক্যে তারাই ‘ট্রানসেনডেন্টাল মেডিটেশন’ ও ‘এক্সটা-সেনসরি পারসেপশন’-কে বিজ্ঞান আখ্যা দেয়। ধ্যান ও নেসবতে বায়নান্নাসকে তারাই হিপনোটিযম ও অটোসাজেশন’ নামে বৈজ্ঞানিক সত্য এবং হাইপারটেনশনের ঔষধ রূপে গ্রহণ করেন। এ সবই তিন মাথাওয়ালা জ্ঞান-বৃদ্ধের সামনে জ্ঞান-যুবকের দাম্ভিক শক্তিমত্তার নতি স্বীকার। জ্ঞান জ্ঞানের সম্মান করিবেই।
বিজ্ঞানের বিস্ময়কর চরম উৎকর্ষে মানুষ আজ মহাশূন্যে অগণিত গ্রহ হইতে গ্রহান্তরে উড়িয়া বেড়াইতেছে মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর জীবের সন্ধানে। এ উদ্যম সফল হইলে এই ক্ষুদ্রতম গ্রহের মানুষ আর আশরাফুল মখলুকাত থাকিবে না। ফলে সব ধর্মের বুনিয়াদ ধসিয়া পড়িবে। ধর্মবিরোধীরা সে আশায় খুশি হইতেছেন। কিন্তু জীব পাইলেই ত হইবে না রুহও পাইতে হইবে। যদি তা না পাওয়া যায়, তবে কী হইবে?
চতুর্থ খণ্ড
সাহিত্যিক জীবন (মামুলি)
অধ্যায় বার – প্রচলিত পথে অগ্রসর
১. কৈফিয়ত
আমার সাহিত্যিক জীবনীকে দুই খণ্ডে ভাগ করিতে বাধ্য হইলাম। কারণ এ দিককার জীবনটাই আমার দুই ভাগে বিভক্ত। দুই ভিন্ন খাতে তা প্রবাহিত। সুলত দুই ভিন্ন দিকে। অদূরবর্তী ভিন্ন গন্তব্যের দিকে। পথ ও গন্তব্যের এ ভিন্নতার কারণ রাজনৈতিক। রাজনৈতিক কারণে দেশ ভাগ হইয়াছে। দেশ ভাগ হইলেও সাহিত্য ভাগ হয় নাই যারা বলেন, সে দলের আমি নই। আমার জন্য এটা নূতন কথা নয়। কারণ আমার বিচারে সাহিত্য মানেই জীবনভিত্তিক সাহিত্য। জীবন মানেই জন-জীবন। সে সাহিত্যের ভাষা মানেই গণ-ভাষা। আমার ক্ষেত্রে এ চিন্তাটা উৎপ্রেরণা, সহজাত। দেশভাগ যখন কল্পনাতীত ছিল, সেই ১৯২২ সালে আমি ‘গোলামী সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে তৎকালীন সাহিত্যিক দিকপালদেরে ধান ক্ষেত ভাঙ্গিয়া গোলাপ বাগান রচনা না করিতে অনুরোধ করিয়াছিলাম। শ্রেণীর জন্য সাহিত্য রচনা না করিয়া জনগণের জন্য সাহিত্য রচনা করিবার দাবি করিয়াছিলাম। পরবর্তীকালে এ কথাটাকেই ‘আইভরি টাওয়ার হইতে মাটির বুকে নামিয়া আসার কাজ বলিয়াছিলাম। এসব লেখার কথা পরে যথাস্থানে বলিব। এখানে শুধু এইটুকু বলিয়া রাখিতেছি যে সাহিত্যের বস্তু জনগণ। জনগণ মানেই একটি জনপদের, একটা ভূখণ্ডের, একটা দেশের, একটা রাষ্ট্রের জনগণ। আমাদের বেলা আগে এটা ছিল গোটা বেঙ্গল। বাটোয়ারার পর এটা প্রথমে পূর্ব বাংলা, পরে পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমানে বাংলাদেশ হইয়াছে। দেশভাগ হওয়ার ফলে কোন কোন ব্যাপারে কী কী পরিবর্তন ঘটিয়াছে, তার ফলে সাহিত্যিকদের কর্তব্যের কী কী মোড় পরিবর্তন হইয়াছে, সেসব কথা পরে যথাস্থানে বলিতেছি। এখানে বলিতেছি শুধু সেইটুকু, দেশভাগ না হইলে একই দেশের সাহিত্যিক হিসাবে আমাদের যা কর্তব্য ও করণীয় ছিল। শুধু সেই পথে সেই উদ্দেশ্যে সাহিত্য-সাধনার দায়িত্বটাই ছিল আমাদের সাহিত্যিকদের প্রচলিত মামুলি কর্তব্য ও করণীয়। দেশ ভাগ হওয়ার আগে পর্যন্ত সব সাহিত্য-সেবকের মতই আমিও সেই গতানুগতিক পথেই চলিতেছিলাম। সেইটুকুই ছিল আমার এলাকা ও কর্তব্য এই কারণে এই মুদ্দতের সাহিত্য-সাধনাকে আমি মামুলি গতানুগতিক বা সাধারণ সাধনা বলিয়াছি। এই মুদ্দতের আমার সাহিত্যিক জীবনকেও কাজেই মামুলি সাহিত্যিক জীবনী’ আখ্যা দিয়াছি। ঠিক এই কারণেই বিভাগোত্তর সাহিত্য-সাধনাকে নূতন, অভিনব, অসাধারণ, সুতরাং গরমামুলি বলিয়াছি। এই কারণেই দুই মুদ্দতের সাহিত্য-সাধনাকে, সুতরাং সাহিত্যিক জীবনীকে, স্বতন্ত্রভাবে দুই ভিন্ন খণ্ডে লিপিবদ্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছি। দুই মুদ্দতের সাহিত্য ও সাহিত্যিকের দায়িত্বের চরিত্রটা অতিশয় সুস্পষ্ট। তবু এখানে সংক্ষেপে তার উল্লেখ করিতেছি। ১৯৪৭ সালে বেঙ্গল বাটোয়ারা হওয়ার আগ পর্যন্তও আমরা বাঙ্গালীরা সবাই এক দেশের নাগরিক ছিলাম। কলিকাতা আমাদের প্রশাসনিক, সুতরাং ব্যবসায়িক, কৃষ্টিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রভূমি ছিল। ইংরাজ আমলের প্রায় দুইশ বছর পূর্ব বাংলা কলিকাতার হিন্টারল্যান্ড ছিল এবং সেই হিসাবে দেশের মেজরিটি বাসেন্দার দেহ, মন ও মস্তিষ্ক কলিকাতার জীবনেও বাংলা সাহিত্যে অবহেলিত ছিল। ইংরাজ শাসনের অবসানে অবশ্য সে অবস্থা আর থাকিত না। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের অবশ্যম্ভাবী চাপে ও প্রভাবে সারা বাংলার, সুতরাং মেজরিটি জনগণের সার্বিক রূপ কলিকাতার সাহিত্যে প্রতিফলিত হইতই। অবিভক্ত বাংলা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হইলে ত কথাই নাই, অখণ্ড রাষ্ট্ররূপে ভারতীয় ইউনিয়নের বা ফেডারেল পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য হইলেও গণতান্ত্রিক অন্তর্নিহিত শক্তিতেই রাষ্ট্রীয় ও সমাজজীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতই শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রেও এটা ঘটিত।
