.
৫. শ্রেষ্ঠ মাবুদ
মহান সৃষ্টিকর্তা, পরকাল, আত্ম ও ধর্ম-বিশ্বাসের সহিত মানবীয় মর্যাদা এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, একটা ছাড়া অন্যটার কল্পনা করা যায় না। অবশ্য সৃষ্টিকর্তার ব্যক্তিত্বের, পরকালের পদার্থকতার ও ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার স্কুল ধারণার বাহিরে ও উর্ধ্বে ঐসব ধারণা থাকিতে হইবে। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির ফলে মানুষ যতই কুসংস্কারমুক্ত হইবে, ঐসব ধারণাও ততই পরিচ্ছন্ন হইবে। মুক্তবুদ্ধি হওয়া মানে, লজিকের বন্দী হওয়া নয়। লজিকের এলাকা ইন্দ্রিয়ে সীমাবদ্ধ। ইন্দ্রিয়ের বাইরে কিছু নাই যারা মনে করেন, মানুষ হায়ওয়ান ছাড়া আর কিছু নয় যারা বলেন, মৃত্যুতেই মানব-জীবনের অবসান যারা বিশ্বাস করেন, তাঁদের জন্য ধর্ম, খোদা ও পরকালের অস্তিত্ব সত্যই অবান্তর। ব্যক্তিগত ব্যতিক্রম বাদে মানুষ সাধারণভাবে পরাশ্রয়ী। প্রকৃতিগতই হউক, আর শৈশবের পরিবেশের ফলে হউক, মানুষ নিরাপদ আশ্রয় চায়। সে আশ্রয়কে আশ্রয়প্রার্থীর চেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতাবান ও বুদ্ধিমান হইতে হয়। মানবসভ্যতার শৈশবে এই আশ্রয় ছিল পেটার ফ্যামিলিয়া, গোষ্ঠী-নেতা, রাজা-বাদশাহ। এখন তা রূপ নিয়াছে ডিক্টেটর বা ফাদার-ইমেজের গণতান্ত্রিক নেতার। ব্যক্তিপূজা বা পার্সনালিটি কাল্ট যাদের অভিমানে বাধে তারাই প্রবর্তন করিয়াছেন রাষ্ট্রপূজা। এক রূপে না এক রূপে পূজাই যখন করিতে হইবে, তখন শরীরী মাবুদের চেয়ে নিরঞ্জন মাবুদই কি মানুষের আত্মমর্যাদার দিক হইতে উন্নততর নয়?
.
৬. বিজ্ঞানী-শ্ৰেষ্ঠ আইনস্টাইন
কিন্তু অন্ধবিশ্বাস কখনই অর্জিত আস্থার স্থলবর্তী হইতে পারে না। আমাদের মুরুব্বিরা যে নাস্তিকের ভয়ে ‘ফালসাফা বা দর্শনশাস্ত্র পড়ার বিরোধী ছিলেন, আসলে সে ভীতি ছিল অমূলক। প্রকৃত জ্ঞানপিপাসুর কাছে দর্শন-বিজ্ঞান নাস্তিক্যের শিক্ষা-দাতা হইতে পারে না। তার প্রমাণ আধুনিক যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি বলিয়াছেন : ‘আবেগের সাথে যার পরিচয় নাই, যে বিস্ময় ও ভক্তির আবেশে স্তব্ধ হয় না, সে মৃত। তার চোখ অন্ধ। সচেতন জীবন নিজেকে কেমন করিয়া অনন্তের মধ্য দিয়া চিরস্থায়ী করিতেছে তা ধ্যান করিতে, দুনিয়া জাহানের দুর্বোধ্য-গঠন-কৌশল সম্বন্ধে ধারণা করিতে এবং প্রকৃতিতে অভিব্যক্ত বুদ্ধিমত্তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রাংশ বিনয়াবনত অবস্থায় অনুভব করিবার চেষ্টা করিতে পারাই আমার জন্য যথেষ্ট।
রহস্যময়ের সামনে, গায়েবি কুদরতের কাছে, এমন বিনয়-নম্র ভক্তির স্তব্ধতা ও তাকওয়ার আত্মসমর্পণই জ্ঞানের পরিপক্ক পূর্ণতা। প্রকৃত জ্ঞান কখনও অহংকারী হইতে পারে না। বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীর এই বিনতিনম্রতা, এই আজিযী-এনকেসারিই প্রকৃত বিজ্ঞানীর আত্মোপলব্ধির প্রমাণ। আইনস্টাইনের এই অমূল্য উক্তিটি যদিও ১৯৩০ সালের ঘটনা, আমি কিন্তু ওটা পড়িয়াছিলাম তার বিশ-পঁচিশ বছর পরে। প্রবাদের ‘অল্পবিদ্যা। ভয়ংকরীর সত্যতা উপলব্ধি করিতে শুরু করি আমি তার বহু আগেই। ছাত্রজীবনে দর্শনশাস্ত্রে যখন ডারউইনের উদ্বর্তনবাদ বা থিওরি-অব ইভলিউশন পড়িলাম, তখন কোরআন-বাইবেলের সৃষ্টি-তত্ত্বের উপর আস্থা হারাইলাম। আদম-হাওয়ার কিস্সাকে সত্যই মাইথলজির কাহিনী মনে করিলাম। ধর্মে ও সৃষ্টিকর্তার সন্দেহ অবিশ্বাসে পরিণত হইল। নাস্তিক্যের ভিত্তি মযবুত হইল।
.
৭. ধর্মবোধের ভিত পাকা
কিন্তু বয়স ও জ্ঞান বৃদ্ধি সাথে সাথেই বুঝিতে শুরু করিলাম, ধর্মীয় সৃষ্টি তত্ত্ব ও থিওরি-অব-ইভলিউশন-এর পরস্পর-বিরোধিতা অত দৃঢ় ভিত্তিক নয়। ক্রমশ এই উপলব্ধি ঘটিল যে ইভলিউশন’ ক্রিয়েশন নয়; উদ্বর্তন সৃষ্টি নয়; পরিবর্তন মাত্র। পদার্থজগতে যেমন আমরা দেখিতে পাই কোনও বিজ্ঞানই সৃষ্টি করে না, রূপান্তর ঘটায়মাত্র, আদমের বেলা ডারউইনিযমও ঠিক তাই করিয়াছে। পদার্থবিজ্ঞান বিজলি, অণু-পরমাণু ও বোমা সৃষ্টি করে না। রসায়নবিজ্ঞানও তেমনি পানি বা অষুধ সৃষ্টি করে না। বিদ্যমান। বস্তুসমূহের পরিবর্তন, বিয়োজন ও সংযোজন করিয়া তাদের রূপান্তর ঘটায়মাত্র। বিজ্ঞান যেমন প্রকৃতির রহস্যের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ মাত্র ব্যাখ্যা করিতে পারিয়াছে, উদ্বর্তনবাদও তেমনি আদম-সৃষ্টি-রহস্যের সামান্য অতি সামান্য অংশই বুঝাইতে সমর্থ হইয়াছে। উদ্বর্তনবাদ মানুষের জীবন, আত্মা, মন, হৃদয়, ঘৃণা-ভালবাসা, বুদ্ধি-চেতনা কোনোটারই সৃষ্টির ব্যাখ্যা আজও দিতে পারে নাই।
বিজ্ঞান সম্পর্কে এই বিজ্ঞানী মনোভাবই পরিণামে ধর্মকে তথাকথিত বিজ্ঞানের হামলা হইতে বাঁচাইয়া রাখিয়াছে। দর্শন সম্বন্ধেও এই কথাই সত্য। সাধারণ দৃষ্টিতে বিজ্ঞান যে ধর্মবিরোধী, তার আসল রূপ এই যে, ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা ও সে সম্বন্ধে ধর্মানুসারীদের ধ্যান-ধারণাকেই বিজ্ঞান ভ্রান্ত, অসত্য ও মিথ্যা প্রমাণ করিয়াছে। আসলে কোনও অনুষ্ঠানই ধর্মের প্রাণ-বস্তু নয়। ও-সব সামাজিকতা। পুরা ঈমান, পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসই ধর্ম, অন্ধ অনুষ্ঠান ধর্ম নয়। ধর্মের এই রূপকেই বলা হয় স্পিরিচুয়াল বা রুহানি দিক ও এথিক্যাল, আখলাকি বা চারিত্র্য-নীতিক দিন। ইসলাম ধর্মে এই দুই ভাগের একটিকে বলা হয় হক্কুল্লাহ বা আল্লাহর হক এবং হক্কুল এবাদ’ বা মানুষের হক। প্রথমটা সৃষ্টিকর্তার প্রতি মানুষের কর্তব্য, দ্বিতীয়টা মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য। আল্লার প্রতি কর্তব্য-বিচ্যুতির অপরাধে কারো বিচার করিবার অধিকার মানুষের নাই। সে বিচারের মালিক খোদ আল্লাহ। এই কথাটাই কোরআনে বলা হইয়াছে : ধর্মের ব্যাপারে কোনও যবরদস্তি নাই। ধর্ম এখানে হক্কুল্লাহ রুহানি বা স্পিরিচুয়াল ধর্ম। ধর্মের হক্কুল এবাদ অংশে ত্রুটি-বিচ্যুতির ব্যাপারের বিচার মানুষ করিতে পারে, করা তার কর্তব্যও। এটা তার সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। এই হল এবাদই ধর্মের সামাজিক রূপ।
