আমি কিন্তু তাতে বিচলিত হই নাই। কারণ আমি জানিতাম, আমার চিন্তার গভীরতা আছে বলিয়াই তলার সন্ধান পাইতেছি না। যাদের চিন্তা অগভীর ও ভাসা-ভাসা তারাই প্রচলিত সত্যকে সত্য মানিয়া বসিয়া থাকেন। মনের দিক হইতে তাঁরা হয় অলস, নয় ত ভীরু। অলস এই জন্য যে তাঁরা মন ও মগজ খাটানোর শ্রমটুকু করিতে চান না। আর ভীরু এই জন্য যে চিন্তার জঙ্গলে প্রবেশ করাকে তারা নিরাপদ মনে করেন না। সকলেই জানেন বিপদ-আপদের ভয়ে যারা জঙ্গলে ঢুকিতে বা সামনে আগ বাড়িতে ভয় পান, তাঁরা জ্ঞানের অনেক সম্পদ ও মণি-মুক্তা হইতেই বঞ্চিত থাকে।
মুনশী-মৌলবী-মুরুব্বিরার কাছে বিশেষত চাচাজী মুনশী ছমিরুদ্দিন সাহেবের কাছে দর্শন-বিজ্ঞানের কঠোর নিন্দা শুনিতাম। চাচাজী ওগুলিকে ‘ফালসাফা’ বলিতেন। ‘ফালসাফা’ (ফিলোসফি) শয়তানের এলেম, ও এলেমে ঈমান নষ্ট হয়, এসব কথা প্রায়ই তিনি বলিতেন। ফালসাফাঁকে তিনি নজুমির (জ্যোতিষীর) মতই কুফরি বুদ্ধি বলিতেন। কলেজে দর্শন পড়িয়া এবং বিজ্ঞানের ছাত্র সহপাঠীদের সাথে আলোচনা করিয়া চাচাজীর কথার সত্যতার প্রমাণ পাইয়াছিলাম। সত্যই দর্শন-বিজ্ঞান আমাদের ঈমান নষ্ট, অন্তত শিথিল করিয়াছে। তখন হিন্দু মুরুব্বিদের অনেকের কথাও মনে পড়িয়াছে। তাদের মুখে প্রায়ই শুনিতাম : ‘বিশ্বাসে লভয়ে হরি, তর্কে বহুদূর’। তর্কশাস্ত্রে সত্য-সত্যই তত দিনে আমাদেরে ‘হরি’ হইতে অনেক দূরে নিয়া আসিয়াছে।
কিন্তু সে দূরত্ব বেশি দিন থাকে নাই। আস্তে-আস্তে ঢুকিবার, পানিতে নামিবার, অথবা তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ নদী পার হইবার সুফল আস্তে-আস্তে পাইতে লাগিলাম। স্তরে-স্তরে সেসব পরিবর্তনের কথা আগেই বলিয়াছি। শেষ বয়সে, এই আত্মকথা লিখিবার সময়ে, সেসব মানসিক চাঞ্চল্য আর নাই। চরম সত্য বা শেষ জ্ঞান লাভ করিয়া ফেলিয়াছি, নিশ্চয়ই এ কথা বলিতেছি না। জ্ঞানের শেষ নাই। চরম সত্য লাভও সম্ভব নয় মানবজীবনটাই জ্ঞানসাধনার একটা প্রসেসমাত্র। এটা অবশ্যই দার্শনিক দৃষ্টিকোণের কথা।
.
৩. বিজ্ঞান ধর্মবিরোধী নয়
দর্শন, বিজ্ঞান ও রাজনীতি সবাই মিলিয়া ধর্মের বিরুদ্ধে লাগিয়াছে বলিয়া মনে হইবে। এই কারণে আধুনিককালে একদিকে যেমন দর্শন বিজ্ঞানের মাপকাঠি দিয়া ধর্মকে সংস্কার বা আধুনিকীকরণের চেষ্টা চলিতেছে। অপরদিকে ধর্মকে দিয়া দর্শন, বিজ্ঞান ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলিতেছে। এসব চেষ্টার ঐতিহাসিক কারণ আছে। ঐ কারণেই ন্যায়, নীতি, ইনসাফ সুবিচার, এথিকস, মরালিটি, জাসটিস ও ফেয়ারপ্লেকে একাৰ্থবোধক একাঙ্গিকরণ করা হইয়া গিয়াছে। সত্য কথা বলিও, মিথ্যা বলিও না, ‘পরের দ্রব্য হরণ করিও না’, ‘এতিমে হেফাযত কর’, ‘কারো উপর যুলুম করিও না,’ এসব সকল ধর্মেরই উপদেশ। এই কারণেই ঐ সব উপদেশকে আমরা ধর্মের শিক্ষা বলিয়া মনে করি। ব্যাপক অর্থে এ সবই ধর্মের অন্তর্ভুক্ত। ব্যাপক অর্থে যেমন সব জ্ঞানই বিজ্ঞান। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমিত অর্থে যেমন রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ইত্যাদির স্বতন্ত্র ও নির্ধারিত এলাকা রহিয়াছে, তেমনি ন্যায়-নীতি, আচার-নীতি, বিচার-নীতি, এথিকস, মরালিটি, ধর্ম ও রিলিজিয়নের স্বতন্ত্র এলাকা আছে। এটা বুঝিতে জাতি-মানুষের যেমন সময় লাগিয়াছে, ব্যক্তি-মানুষেরও তেমনি সময় লাগে। মানবজাতি অনেক বয়সে, বহু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া এই জ্ঞান লাভ করিয়াছে। ব্যক্তি-মানুষেরও এ জ্ঞান লাভ হয় বেশি বয়সে। আমার নিজের জীবনের বিভিন্ন বয়সে, বিভিন্ন পরিবেশে, ধর্ম সম্বন্ধে এমনকি খোদ আল্লার অস্তিত্ব সম্বন্ধে, বিভিন্ন ও পরস্পর-বিরোধী চিন্তা-ধারার মধ্য দিয়া এই বৃদ্ধ বয়সে এই অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছি যে, সজীব ও সক্রিয় মনের এটাই স্বাভাবিক ধর্ম। অমন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের আঁকাবাকা সংকীর্ণ পথেই মানুষের। মন বিকশিত হয়। আমার মত নগণ্য ব্যক্তি ত বটেই, দুনিয়ার সব বড়-বড় চিন্তাবিদ, পণ্ডিতদের জীবনেও এমনটাই ঘটিয়াছে। এমন যে মুসলিম দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, হুজ্জতুল ইসলাম (আরগুমেন্ট-অব-ইসলাম) উপাধিতে ভূষিত ইমাম গাযযালীকেও এই আঁকাবাকা সংকীর্ণ অন্ধকার গলিপথেই অগ্রসর হইতে হইয়াছে। সুফি আলেম পিতার ঔরসে জন্মলাভ করিয়াও, ধর্মীয় পরিবেশে প্রতিপালিত হইয়াও, এবং শৈশব হইতে ধর্মশাস্ত্রে শিক্ষা লাভ করিয়াও যৌবনে তিনি নাস্তিক হইয়া গিয়াছিলেন। দীর্ঘদিনের সাধনা, চিন্তা, মেডিটেশন, অধ্যয়ন দ্বারাই তিনি এই নাস্তিক্যের কবল হইতে মুক্ত হইয়াছিলেন। এটাই স্বাভাবিক। সজীব ও সক্রিয় মনের বিকাশের ধারাই এই। কৌতূহল হইতে জিজ্ঞাসা, জিজ্ঞাসা হইতে সন্দেহ, সন্দেহ হইতে অবিশ্বাস, অবিশ্বাস হইতে অনুসন্ধান এবং সর্বশেষ অনুসন্ধান হইতে সত্য লাভ। বিশেষ সাধনা করিলে এটা মধ্যবয়সেও ঘটিতে পারে বটে, কিন্তু সাধারণত এটা অধিক বয়সেই ঘটিয়া থাকে।
.
৪. অন্ধভক্তি নয়, অর্জিত উপলব্ধি
ধর্ম সম্বন্ধে সারা জীবন চিন্তা-ভাবনা করিয়া মুক্তবুদ্ধির জোরে এদিক-ওদিক, ডাইনে-বামে, উপরে-নিচে, দশ দিক ঘুরিয়া-ফিরিয়া, বলিতে গেলে একেবারে আকাশ-পাতাল বেড়াইয়া, বৃদ্ধ বয়সে একরূপ ক্লান্ত হইয়াই এই স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছি যে, ধর্মে বিশ্বাস না করিয়া উপায় নাই। ধর্ম, আত্মা ও সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের ধারণা তিনটি এতই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যে একটিতে বিশ্বাস করিলে অপরটিতে বিশ্বাস না করিয়া উপায় নাই। আবার এই তিনটি বিশ্বাসই মানবতা-বিশ্বাস হইতেই উদ্ভূত। অথচ খোদা-ধর্ম ও আত্ম-অবিশ্বাসীরা দার্শনিক নাস্তিকই হউন, আর কমিউনিস্ট নাস্তিকই হউন, সবাই কিন্তু মানবতা-বিশ্বাসী। বস্তুত মানবতার খাতিরেই তারা বর্ণ, শ্ৰেণী ও শোষণহীন সমাজব্যবস্থা চান। আনুষ্ঠানিক ও সংঘবদ্ধ ধর্ম তাঁদের অভীষ্ট লাভের প্রতিবন্ধক, এই অজুহাতেই তারা ধর্ম, খোদা ও আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করিয়া থাকেন। কিন্তু মানবতা একটা বিমূর্ত ধারণামাত্র নয়। ব্যক্তি মর্যাদার উপরই প্রকৃত মানবতা প্রতিষ্ঠিত। আত্মার ধারণা ব্যক্তি-মর্যাদারই প্রসারিত রূপ। ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তার অনিবার্যতাও এইখানেই। ধর্মের দাবির এটা রক বটম। একদম হাড়ডি বা স্কেলিটন বলা যাইতে পারে। রাষ্ট্র, সমাজ, আইন-কানুন, শিল্প-বাণিজ্য আর্ট-সাহিত্য ধর্মের সনাতন এলাকার অনেকখানি দখল করিয়াছে। অভিজ্ঞ আত্মবিশ্বাসী মুরুব্বির মতই ধর্ম সে বেদখল মানিয়াও লইয়াছে। এখন ধর্মের এই সংকীর্ণ এলাকা এমন এক জায়গায় আসিয়া ঠেকিয়াছে, যেখানে বিজ্ঞানকেও ধর্মের আধিপত্য ও একক এলাকা মানিয়া লইতে হইবেই। মৃত্যুতেই মানবজীবনের অবসান, এটা যারা বলেন বা বিশ্বাস করেন, তাঁরা মানবজাতিকে অন্য সব স্পেশিসের সমপর্যায়ে ফেলেন। তাঁরা সঙ্গে-সঙ্গে ‘পাশবতার কথা না বলিয়া শুধু মানবতার কথা বলিতে পারেন না।
