আমি তর্কে না নামিয়া বলিলাম : মানবপ্রেম অতি বড় কথা। মানবসেবা অতি বড় কাজ। সে কাজ শুরু করিবার আগে মুসলমানদের সেবার হাত মশ করিতেছি মাত্র। আর মানবধর্ম কথাটা অর্থহীন হিউম্যানিযম একটি মেটাফিজিকস মাত্র।
এইবার বন্ধু স্বরূপে প্রকাশ পাইলেন। বলিলেন : ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা হইতেই তুমি এ কথা বলিতেছ। ইসলামের ভ্রাতৃত্ব মুসলিম-ভ্রাতৃত্ব নয়, ওটা মোমিন-ভ্রাতৃত্ব। মুসলমান সমাজের বাহিরেও মোমিন আছে এবং আমার অভিজ্ঞতা হইতেই বলিতেছি, অমুসলমান মোমিনের সংখ্যাই বেশি।
আমি হাসিয়া বলিলাম : আমিও তোমার পথেরই পথিক। তুমিও বিপ্লবী নও রিফর্মিস্ট, আমিও তাই। তোমার চিন্তার ক্ষেত্রও সীমাবদ্ধ, আমারও তাই। তুমি ইসলামকে সংশোধন করিতে চাও, আমি মুসলমানকে সংশোধন করিতে চাই। ইসলামকে সংশোধন করিতে পারিলে তার পরে তুমি অন্য ধর্ম সংশোধনে হাত দিবা। মুসলমানকে সংশোধন করিতে পারিলে পরে আমিও অন্যান্য ধর্মের লোকদেরে সংশোধন করিতে চেষ্টা করিব। কেতাব সংশোধনের চেয়ে মানুষ সংশোধন, মনের চিকিৎসার চেয়ে দেহের চিকিৎসাই অনেক ছোট ও সহজ কাজ বলিয়াই আমি এ কাজ করিতে চাই। বড় কাজকে সত্যই বড় কাজ মনে করি বলিয়াই প্রথম চোটেই তাতে হাত দিতে সাহস পাই না।
বন্ধুরা সমস্বরে বলিলেন : কিন্তু যত ছোট এলাকা লইয়াই তুমি সেবার কাজ শুরু কর না কেন, তোমার সেটা শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখিবে কেন?
আমি জবাব দিলাম : মুসলমানরাই সবার থনে বেশি নির্যাতিত, নিপীড়িত, দরিদ্র ও নিরক্ষর বলিয়া সেবার প্রয়োজন তারারই বেশি।
সকলে মাথা নাড়িয়া বলিলেন : অমুসলমানদের মধ্যে দরিদ্র, নির্যাতিত, নিরক্ষর লোক নাই বলিতে চাও?
আমি : নিশ্চয়ই আছে। নাই বলিব কেন? তবে তাদের মধ্যে সেবক ও সংস্কারকও আছেন অনেক। তাঁদের মধ্যে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধী ও প্রফুল্ল চন্দ্র আছেন অনেক। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের জন্য দান করিবার মত দাতাও আছেন বেশ কিছু।
তাঁরা : আমাদের মধ্যেও ত ধনী আছেন, তাঁরাও ত দান-খয়রাত করেন?
আমি : আছেন। কিন্তু তারা তোমাদের মতই ইসলাম সংস্কার লইয়া ব্যস্ত। মুসলমানদের কল্যাণের কথা তারা ভাবেন না। তাঁরা মসজিদ নির্মাণে তাদের টাকা ব্যয় করেন যাতে মুসলমানরা বেহেশতে যাইতে পারেন। মুসলমানদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের জন্য তারা স্কুল-কলেজ ও হাসপাতাল দাওয়াখানার টাকা খরচ করেন না।
তাঁরা : কেন হাজী মোহাম্মদ মহসিন?
আমি: এবার তোমরা ঠিক কথা বলিয়াছ। যে কারণে হাজী সাহেব মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা প্রসারের জন্য সম্পত্তি ওয়াফ করিয়া গিয়াছেন, ঠিক সেই কারণে আমিও আমার নিজের কর্ম-শক্তিতে মুসলমানদের সেবায় লাগাইবার দায়িত্ববোধ করিতেছি। আমার এই মুসলিম-প্রীতির মধ্যে হিন্দু বিদ্বেষ নাই, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতাও নাই। প্রধানত মুসলমানদের সেবা করিতে গিয়া যদি দেখি তাতে হিন্দুরও সেবা হইয়া যাইতেছে, তবে তাতে সুখীই হইব। হাজী মহসিনের টাকায় হিন্দুদের ‘ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র’ও শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন। আমরা যখন কৃষক-প্রজা আন্দোলন শুরু করি, তখন আমাদের সামনে ছিল মুসলমান রায়তরাই। কিন্তু পরিণামে হিন্দুরাই তার ফল ভোগ করিয়াছে।
অধ্যায় এগার — হক্কুল এবাদ
১. বুদ্ধির মুক্তির সামাজিক দিক
মানব-মনের আযাদি, বুদ্ধির মুক্তি, স্বাধীন চিন্তা ইত্যাদি আজিকার তরুণ মনের স্বাভাবিক ক্ষুধা এবং সজীব সক্রিয় মনের লক্ষণ। কিন্তু এ সবেরই একটা ব্যক্তিগত ও একটা সামাজিক দিক আছে। পুরাকালের মুনি-ঋষি ও সুফি-দরবেশের আধ্যাত্মিক সাধনার মতই মানবমনের আযাদির একটা নিজস্ব মূল্য আজও আছে। কিন্তু সে মূল্য নিতান্তই ব্যক্তিগত যদি তা মানবসেবায় না লাগে। ব্যক্তিগত সীমার মধ্যে আধ্যাত্মিক উচ্চতা, বুদ্ধির পার্থক্য ও সাধারণ ধন-দৌলতের দাম একই। সমাজের কোনও কাজে লাগে না। আপনি যত মুক্তবুদ্ধির লোকই হউন, আপনার বুদ্ধি যদি সমাজের কাজে না লাগে, তবে সমাজের দিক হইতে আপনার বুদ্ধির দাম কানাকড়িও না। স্বার্থপর ধনী যেমন করিয়া নিজের বিলাসিতায় গড়াগড়ি করে, আপনিও তেমনি মুক্তবুদ্ধির বিলাসিতায় গড়াগড়ি পাড়েন। দুইটা একই জিনিস।
এই জন্যই মুক্ত-বুদ্ধিমান ও স্বাধীন চিন্তকরা পূর্ণ স্বাধীনতার সঙ্গে চিন্তা করিবেন ঠিকই, কিন্তু কথা বলিবেন খুব সাবধানে। কথা ও কাজের দ্বারা সুধী সমাজ যদি সমাজের ‘গোলাকার ঘেঁদার জন্য চার কোনা পেরেক’ হইয়া যান, তবে সমাজের কোনও কাজে তারা লাগিবেন না। কাজেই তাদের মুক্তবুদ্ধিকে জনগণের বুদ্ধির মুক্তির কাজে প্রয়োগ করিবার জন্যই তাঁদেরে সমাজের দেহে ‘ফিট-ইন করিতে হইবে, খাপ খাওয়াইতে হইবে। এটা করিতে হইলে মুক্তবুদ্ধির লোককে দরদি হইতে হইবে। যতই পতিত, বুদ্ধিহীন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হউক না কেন, জনগণকে ভালবাসিতে হইবে। নিজের মুক্তবুদ্ধির অহংকারে ফাটিয়া পড়িলে চলিবে না। আস্তে আস্তে জ্বলিয়াই বাতি আলো দিতে পারে। ফাৎ করিয়া জ্বলিয়া উঠিলে আলো দেয়ার পরিবর্তে ঘর পুড়িয়া ফেলিবে।
.
২. মুক্তবুদ্ধি বনাম চিন্তার অস্থিরতা
আমার ধর্মজীবন সম্বন্ধে এতক্ষণ যেসব কথা ও কাজের উল্লেখ করা হইল, তাতে পাঠকরা নিশ্চয় বুঝিয়াছেন যে, বিপুল ওঠা-নামা, উত্থান-পতন ও ওলট-পালটের মধ্যে দিয়াই আমার চিন্তা-ধারা প্রবাহিত হইয়াছে। কোনও এক স্তরে বেশি দিন স্থির থাকে নাই। অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা এটাকে আমার মানসিক অস্থিরতা, মেন্টাল ইনস্ট্যাবিলিটি বলিয়াছেন। কেউ বলিয়াছেন, এটা চিন্তার গভীরতার ও মতের স্থৈর্যের অভাব। কেউ সোজাসুজি এটাকে মতহীনতাও বলিয়াছেন।
